রাজপরিবারের ছত্রছায়ায় রূপান্তরকামীদের কর্মসংস্থান দিচ্ছে ‘গজরা’

যা জানা জরুরি
- বড়োদরার পুরনো শহরের প্রাণকেন্দ্রে সুরসাগর হ্রদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেড়শো বছরের একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন।
- একসময়ে সেখানে মেয়েদের সেলাই ও অন্যান্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হত।
- পুরনো সেলাইয়ের টেবিল, লেখার ডেস্ক, রাজপরিবার থেকে আনা পর্দা আর দেশীয় সাজসজ্জায় সজ্জিত সেই ভবনের একাংশই এখন ‘গজরা’।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বড়োদরার পুরনো শহরের প্রাণকেন্দ্রে সুরসাগর হ্রদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেড়শো বছরের একটি ঐতিহ্যবাহী ভবন। একসময়ে সেখানে মেয়েদের সেলাই ও অন্যান্য বৃত্তিমূলক শিক্ষা দেওয়া হত। পুরনো সেলাইয়ের টেবিল, লেখার ডেস্ক, রাজপরিবার থেকে আনা পর্দা আর দেশীয় সাজসজ্জায় সজ্জিত সেই ভবনের একাংশই এখন ‘গজরা’। ভারতের প্রথম সারির যৌন ও লিঙ্গ-পরিচয় নির্বিশেষে অন্তর্ভুক্তিমূলক কাফেটি গত সপ্তাহে তিন বছর পূর্ণ করেছে। তবে গজরার সাফল্য শুধু তার খাবার কিংবা পুরনো দিনের আবহে নয়—এখানে খাবারের সঙ্গে পরিবেশিত হয় আত্মমর্যাদা, নিরাপত্তা এবং নিজের পরিচয়ে বাঁচার সাহস।
আহমেদাবাদে পরিবারের বাড়ি ছেড়ে দ্বাদশ শ্রেণি পাশ করার পরে বড়োদরায় এসেছিলেন তনভি পারমার। তখন তাঁর বয়স ১৯। জন্মসূত্রে পুরুষ হিসেবে চিহ্নিত হলেও নিজেকে তিনি বরাবরই নারী হিসেবে অনুভব করেছেন। পরিবারের কাছে সেই পরিচয়ের স্বীকৃতি না পেয়ে বাড়ি ছাড়তে হয় তাঁকে। বড়োদরায় এসে তিনি রাজপিপলার যুবরাজ মানবেন্দ্রসিংহ গোহিলের প্রতিষ্ঠিত ‘লক্ষ্য ট্রাস্ট’-এ কাজ পান। ভারতীয় রাজপরিবারের প্রথম প্রকাশ্য সমকামী সদস্য হিসেবে পরিচিত মানবেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে যৌন সংখ্যালঘুদের অধিকার নিয়ে কাজ করছেন।
এরপর গজরায় যোগ দেন তনভি। পরিবেশিকা থেকে অভ্যর্থনা বিভাগের দায়িত্ব—গত তিন বছরে নানা কাজ করেছেন তিনি। এখানে তাঁর রূপান্তরকামী পরিচয় লুকোনোর প্রয়োজন হয়নি; আবার শুধু সেই পরিচয়ের কারণেও তাঁকে চাকরি দেওয়া হয়নি। একজন কর্মী হিসেবে তাঁর দক্ষতা ও শ্রমই ছিল প্রধান। গজরার আর্থিক সহায়তায় এখন লিঙ্গ-নিশ্চিতকরণ অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।
তনভির জীবনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন অবশ্য পরিবারের সঙ্গে সম্পর্কে। বাড়ির লোকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, বাড়ি ছাড়ার পরে তিনি হয়তো রূপান্তরকামীদের কোনও প্রান্তিক গোষ্ঠীতে হারিয়ে যাবেন। কিন্তু তাঁরা যখন জানলেন, বড়োদরার পরিচিত রাজপরিবার-সমর্থিত প্রতিষ্ঠানে তনভি সম্মানজনক কাজ করছেন, তখন তাঁদের মনোভাব বদলাতে শুরু করে। একসময় কষ্টদায়ক কথোপকথনের জন্য পরিবারের সকলের ফোন নম্বর বন্ধ করে রেখেছিলেন তনভি। গজরায় কাজ করে আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার পরে তিনি আবার বাবা-মা, কাকা-কাকিমাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। এখনও শুধু তাঁর ভাই পরিচয়টি মেনে নিতে পারেননি।
গজরার প্রতিষ্ঠাতা বড়োদরার প্রাক্তন রাজপরিবারের রাধিকারাজে গায়কোয়াড়। কাফেটির নাম রাখা হয়েছে মহারানি চিমনাবাই দ্বিতীয়ের জন্মনাম গজরাবাই থেকে। ১৮৮৫ সালে বড়োদরার রাজপরিবারে বিয়ে হয়ে আসা চিমনাবাই ছিলেন নারীশিক্ষা ও সমাজসংস্কারের অগ্রদূত। পর্দাপ্রথা ও বাল্যবিবাহের বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। ১৯১১ সালে লিখেছিলেন ‘দ্য পজিশন অব উইমেন ইন ইন্ডিয়ান লাইফ’। পরে সর্বভারতীয় মহিলা সম্মেলনের প্রথম সভানেত্রী হন।
‘গজরা’ বলতে নানা রং ও আকারের ফুল এক সুতোয় গাঁথা মালাকেও বোঝায়। রাধিকারাজের মতে, রামধনু সমাজের বিভিন্ন পরিচয়কে এক ছাদের নীচে নিয়ে আসার ভাবনাটিই এই নামের মধ্যে নিহিত। কাফে চালু করার আগে প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরিকল্পনা হয়েছিল। প্রথমে অস্থায়ী বিপণি খুলে মানুষের প্রতিক্রিয়া যাচাই করা হয়। তার পরে কর্মীদের দু’বছর ধরে অতিথি আপ্যায়ন, ব্যক্তিত্ব বিকাশ ও পেশাগত আচরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
রাধিকারাজে জানতেন, এই সামাজিক পরীক্ষার ব্যর্থতা শুধু তাঁর বা প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হবে না; তার দায় চাপবে গোটা যৌন সংখ্যালঘু সমাজের উপর। তাই কোনও তাড়াহুড়ো করেননি। দেড়শো বছর ধরে কেবল নারীদের জন্য কাজ করা মহারানি চিমনাবাই স্ত্রী উদ্যোগালয়ের সনদও সংশোধন করেন তিনি। সেখানে নারী-পুরুষ, প্রাপ্তবয়স্ক, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন—সকলের প্রবেশাধিকার তৈরি হয়।
গজরার খাবারেও রয়েছে প্রান্তিককে মর্যাদার আসনে বসানোর চেষ্টা। বড়াপাও, ভাখরি নাচোস কিংবা সৌরাষ্ট্রের ভুংরা বটেটার মতো সাধারণ মানুষের খাবার পরিবেশিত হয় যত্ন ও নান্দনিকতার সঙ্গে। মুম্বইয়ের ‘দ্য বম্বে ক্যান্টিন’-এ প্রশিক্ষিত রন্ধনশিল্পীরা কলাপাতা ও কাঠের পাত্রে এগুলি পরিবেশনের পরিকল্পনা করেছেন। খাবারের স্বাদ বা চরিত্র বদলে কৃত্রিম মিশ্রণ নয়—পরিচিত পদকেই তার প্রাপ্য সম্মান দেওয়া হয়েছে।
কাফের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও প্রথমে অতিথিদের কথা ভেবে করা হয়নি। লিঙ্গ-নিশ্চিতকরণ অস্ত্রোপচারের পরে কাজে ফেরা কর্মীদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্যই তা বসানো হয়েছিল। গজরার লাভ এবং লক্ষ্মীবিলাস প্রাসাদে উদ্যোগালয়ের বার্ষিক গরবা উৎসব থেকে পাওয়া অর্থে এখন অস্ত্রোপচার, এইচআইভি-আক্রান্ত পরিবারকে সহায়তা, আইনি পরামর্শ এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার খরচ বহন করা হয়।
কাফের ৪৬ বছর বয়সি এক রন্ধনকর্মী বাড়িতে বিবাহিত এবং দুই মেয়ের বাবা। তাঁর কথায়, “বাড়িতে আমি ধর্মেন্দ্র, গজরায় শ্রীদেবী।” পনেরো বছর বয়সেই নিজের পরিচয় বুঝলেও রক্ষণশীল পরিবারে তা প্রকাশের ভাষা বা সাহস কোনওটাই ছিল না। গজরা তাঁকে বিচার বা নির্যাতনের ভয় ছাড়াই নিজের মতো থাকার পরিসর দিয়েছে।
বর্তমানে কাফেতে প্রায় ২০ জন কাজ করেন; তাঁদের অর্ধেক যৌন সংখ্যালঘু সমাজের সদস্য। একই ভবনে ‘তারাবাই’ নামে অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপচর্চাকেন্দ্রও খোলা হয়েছে। তবে রাধিকারাজে চান না, তাঁরা চিরকাল একটি প্রতিষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল থাকুন। শিক্ষা ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে পরিচয়-নির্ধারিত বিচ্ছিন্ন কর্মক্ষেত্রের বাইরে স্বাবলম্বী হওয়াই তাঁর লক্ষ্য।
গজরার আদর্শটি ইতিমধ্যে ভারতীয় ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান, আহমেদাবাদের গবেষণার বিষয় হয়েছে; রাষ্ট্রপুঞ্জের নারী সংস্থাও একে অনুসরণযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছে। কাফের ফলকে লেখা—“আমাদের বৈচিত্র্য ভারতকে রং দেয়, আমাদের ঐক্য তাকে শক্তি দেয়।” তিন বছর পরে গজরার সবচেয়ে বড় অর্জন সম্ভবত এটিই: রামধনু পরিচয়কে কোনও প্রদর্শনীর বিষয় না করে বড়োদরার দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ করে তোলা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



