খবর

‘এক পয়সাও দাম নেই’, সিন্ধু রায় খারিজ ভারতের

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • নয়াদিল্লি: সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি এখনও কার্যকর এবং ভারত একতরফা ভাবে সেটি স্থগিত রাখতে পারে না—হেগের লবাদ আদালতের এই রায় সরাসরি খারিজ করল নয়াদিল্লি।
  • বিদেশ মন্ত্রকের সাফ কথা, যে আদালতের গঠনকেই ভারত আইনসম্মত বলে মানে না, সেই আদালত ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না।
  • ফলে ওই আদালতের বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনও রায়ই ভারতের নীতি, কাজকর্ম কিংবা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপর কোনও প্রভাব ফেলবে না।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

নয়াদিল্লি: সিন্ধু জলবণ্টন চুক্তি এখনও কার্যকর এবং ভারত একতরফা ভাবে সেটি স্থগিত রাখতে পারে না—হেগের লবাদ আদালতের এই রায় সরাসরি খারিজ করল নয়াদিল্লি। বিদেশ মন্ত্রকের সাফ কথা, যে আদালতের গঠনকেই ভারত আইনসম্মত বলে মানে না, সেই আদালত ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনও নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার রাখে না। ফলে ওই আদালতের বর্তমান বা ভবিষ্যতের কোনও রায়ই ভারতের নীতি, কাজকর্ম কিংবা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উপর কোনও প্রভাব ফেলবে না।

৩১ আগস্ট হেগের লবাদ আদালত সর্বসম্মত ভাবে দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত জানায়। প্রথমত, ভারত সিন্ধু জলচুক্তিকে ‘স্থগিতাবস্থায়’ রাখলেও আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ১৯৬০ সালের চুক্তিটি এখনও বহাল। দ্বিতীয়ত, জম্মু ও কাশ্মীরের চেনাব নদীতে নির্মীয়মাণ রাটলে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্দিষ্ট অংশের নির্মাণকাজ সাময়িক ভাবে সীমিত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।

ভারত অবশ্য গোটা প্রক্রিয়াটিকেই ‘অবৈধ ভাবে গঠিত তথাকথিত লবাদ আদালতের কার্যক্রম’ বলে অভিহিত করেছে।

আদালতের বক্তব্য, সিন্ধু জলচুক্তির কোথাও কোনও একটি পক্ষকে একতরফা ভাবে চুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার অধিকার দেওয়া হয়নি। চুক্তি বদলানো বা শেষ করতে হলে ভারত ও পাকিস্তানকে যৌথ ভাবে নতুন কোনও চুক্তিতে পৌঁছতে হবে। ভারতের তরফে তোলা সন্ত্রাসবাদ, জাতীয় নিরাপত্তা, পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন কিংবা সার্বভৌম অধিকারের যুক্তিগুলিও চুক্তি স্থগিত করার যথেষ্ট আইনি ভিত্তি নয় বলে মত আদালতের।

২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল পহেলগামে জঙ্গি হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পরদিনই ভারত সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। নয়াদিল্লি জানিয়েছিল, পাকিস্তান বিশ্বাসযোগ্য এবং অপরিবর্তনীয় ভাবে সীমান্তপার সন্ত্রাসবাদে সমর্থন প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে। ইসলামাবাদ অবশ্য হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ভারতের অবস্থান এখনও বদলায়নি। বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে, চুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ ভাবে ভারতের সার্বভৌম নীতিগত সিদ্ধান্ত এবং তা কার্যকর রয়েছে।

লবাদ আদালত অবশ্য ভিন্ন মত দিয়েছে। তাদের মতে, চুক্তি বহাল থাকায় পশ্চিমের তিন নদী—সিন্ধু, ঝিলম এবং চেনাব—নিয়ে ভারতের উপর চুক্তির নির্ধারিত দায়বদ্ধতা বজায় থাকবে। এই নদীগুলির জল মূলত পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হলেও চুক্তির শর্ত মেনে ভারত সেখানে প্রবাহনির্ভর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করতে পারে। অন্য দিকে রবি, বিয়াস এবং শতদ্রুর জল ব্যবহারের প্রধান অধিকার ভারতের।

রাটলে প্রকল্প নিয়ে পাকিস্তানের অন্তর্বর্তী আবেদনও আংশিক ভাবে মঞ্জুর করেছে আদালত। বিশ্বব্যাঙ্ক-নিযুক্ত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ প্রকল্পের নকশা সিন্ধু চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না দেওয়া পর্যন্ত বাঁধের দেওয়াল এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে জল নেওয়ার কাঠামো নির্দিষ্ট উচ্চতার বেশি নির্মাণ করা যাবে না। বিশেষজ্ঞের সিদ্ধান্ত ২০২৭ সালের জুলাই নাগাদ আসতে পারে। সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর আরও ৯০ দিন পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে।

রাটলে চেনাব নদীর উপর নির্মীয়মাণ ৮৫০ মেগাওয়াটের একটি প্রবাহনির্ভর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। কিষণগঙ্গা প্রকল্পের পাশাপাশি রাটলের নকশা নিয়েও বহু দিন ধরে ভারত-পাকিস্তানের বিরোধ চলছে।

বিরোধের সূত্রপাত আরও আগে। ২০১৬ সালে পাকিস্তান লবাদ আদালত গঠনের দাবি জানায়। একই সময়ে ভারত বিষয়গুলি নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর পক্ষে সওয়াল করে। বিশ্বব্যাঙ্ক প্রথমে দুটি প্রক্রিয়াই স্থগিত রাখলেও ২০২২ সালে এক দিকে নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ এবং অন্য দিকে লবাদ আদালতের সদস্য নিয়োগ করে।

আর সেখানেই ভারতের মূল আপত্তি। নয়াদিল্লির যুক্তি, একই বিরোধ নিয়ে একই সময়ে দুটি পৃথক নিষ্পত্তি-প্রক্রিয়া চালানো সিন্ধু জলচুক্তির বিধানের পরিপন্থী। তাই ভারত নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞের প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও লবাদ আদালতকে কখনও স্বীকৃতি দেয়নি, এমনকি তার শুনানিতেও যোগ দেয়নি।

আদালত ২০২৩ সালে ভারতের আপত্তি খারিজ করে নিজেকে এই বিরোধের বিচার করার উপযুক্ত বলে ঘোষণা করে। ২০২৫ এবং ২০২৬ সালেও আদালতের একাধিক সিদ্ধান্তকে নয়াদিল্লি ‘আইনগত ভাবে মূল্যহীন’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।

অন্য দিকে, নতুন রায়কে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদের দাবি, কোনও বাধ্যতামূলক আন্তর্জাতিক চুক্তি একতরফা ভাবে স্থগিত করা যায় না—তাদের এই অবস্থানই রায়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। রায়ের বিস্তারিত অংশ খতিয়ে দেখে চুক্তির অধীনে দুই দেশের যোগাযোগ ফের শুরু করার পথ খোঁজা হবে বলেও জানিয়েছে পাকিস্তান।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি—এটি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের রায় নয়। স্থায়ী লবাদ আদালত এই মামলায় প্রশাসনিক সচিবালয় হিসেবে কাজ করছে; সিন্ধু জলচুক্তির নবম অনুচ্ছেদ এবং ‘পরিশিষ্ট জি’-র অধীনে গঠিত পাঁচ সদস্যের পৃথক লবাদসভা মামলাটি শুনছে।

ফলে বিরোধ এখন আর শুধু জলবণ্টন কিংবা বাঁধের নকশা নিয়ে নেই। এক দিকে আন্তর্জাতিক চুক্তির বাধ্যবাধকতা, অন্য দিকে জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌম সিদ্ধান্ত—এই দুইয়ের সংঘাতেই নতুন মাত্রা যোগ করেছে রায়টি। ১৯৬০ সাল থেকে তিনটি যুদ্ধ এবং একাধিক সামরিক সংঘাত পেরিয়েও টিকে থাকা সিন্ধু জলচুক্তির ভবিষ্যৎ তাই এখন আরও গভীর আইনি ও কূটনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles