অভিষেকের সহযোগীকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রেফতার নয়, নথি চাইল সুপ্রিম কোর্ট

যা জানা জরুরি
- তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সহকারী সুমিত রায়কে গ্রেফতার করা যাবে না আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত।
- শালবনির সরকারি জমি বেআইনিভাবে ব্যক্তিমালিকানায় রূপান্তরের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তাঁর অন্তর্বর্তী সুরক্ষার মেয়াদ বাড়িয়ে এই নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
- একই সঙ্গে সুমিতকে যত দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তার লিখিত প্রতিলিপি এবং শ্রাব্য-দৃশ্য নথি আদালতে পেশ করতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে বলা হয়েছে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সহকারী সুমিত রায়কে গ্রেফতার করা যাবে না আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। শালবনির সরকারি জমি বেআইনিভাবে ব্যক্তিমালিকানায় রূপান্তরের অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলায় তাঁর অন্তর্বর্তী সুরক্ষার মেয়াদ বাড়িয়ে এই নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। একই সঙ্গে সুমিতকে যত দফায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে, তার লিখিত প্রতিলিপি এবং শ্রাব্য-দৃশ্য নথি আদালতে পেশ করতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশকে বলা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ সোমবার সুমিতের আগাম জামিনের আবেদন শুনছিল। কলকাতা হাই কোর্ট তাঁর আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করে দেওয়ার পরে তিনি সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। গত ৬ আগস্ট শীর্ষ আদালত তাঁর গ্রেফতারিতে সাময়িক স্থগিতাদেশ দিয়ে তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছিল। সেই সুরক্ষাই আপাতত ৭ সেপ্টেম্বর, অর্থাৎ পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত বহাল থাকবে।
সুমিতের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণ আদালতে জানান, তাঁর মক্কেল তদন্তকারীদের প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। পূর্ববর্তী শুনানিতে সুমিতের ‘নীরব থাকার সাংবিধানিক অধিকার’ প্রয়োগের কথা বলা হলেও সোমবার আইনজীবী সেই বক্তব্য সংশোধন করেন। একটি অতিরিক্ত হলফনামার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সুমিত আত্মদোষ স্বীকারে বাধ্য না হওয়ার অধিকার প্রয়োগ করে প্রশ্ন এড়িয়ে যাননি; বরং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন।
তাঁর অভিযোগ, টানা ১১ দিন, প্রতিদিন আট থেকে ন’ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও জমি দখলের নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে কার্যত কোনও প্রশ্নই করা হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদের মূল বিষয় হয়ে উঠেছিল সুমিতের পরিবার, তৃণমূলের সাংগঠনিক কাঠামো, দলে লোক নিয়োগের পদ্ধতি এবং দলের অর্থের উৎস। বিভিন্ন মামলায় পালা করে তাঁকে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ডেকে রাখা হয়েছিল বলেও আদালতে দাবি করা হয়।
সুমিতের আইনজীবীর বক্তব্য, তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে মূল অভিযোগ দশ লক্ষ টাকার একটি লেনদেনকে ঘিরে। অথচ তদন্তকারীরা সেটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন না করে রাজনৈতিক দল সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। জিজ্ঞাসাবাদের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া ভিডিয়োয় ধারণ করা হয়েছে। সেই কারণেই শ্রাব্য-দৃশ্য নথি দেখলেই সুমিত তদন্তে সহযোগিতা করেছেন কি না, আদালত স্বাধীনভাবে তা যাচাই করতে পারবে।
রাজ্যের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা অবশ্য এই দাবি মানেননি। তাঁর বক্তব্য, সুমিতের ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক হিসাবে নগদ জমা পড়েছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তকারীরা প্রশ্ন করেছেন। তদন্তে আরও কয়েকটি অর্থ জমা পড়ার তথ্য সামনে এসেছে। ব্যাঙ্ক হিসাবে পাওয়া অঙ্ক বৃহত্তর অপরাধলব্ধ অর্থের সামান্য অংশমাত্র হতে পারে—ঘটনাটি সম্ভবত ‘হিমশৈলের চূড়া’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধান বিচারপতি জানান, তদন্তটি শুধু দশ লক্ষ টাকার একটি বিচ্ছিন্ন লেনদেনে সীমাবদ্ধ নয়। সরকারি বা সরকারের হাতে ন্যস্ত জমি জাল নথির সাহায্যে ব্যক্তিমালিকানায় পরিণত করার বৃহত্তর অভিযোগ এর সঙ্গে জড়িত। ষাট লক্ষ, কুড়ি লক্ষ এবং চল্লিশ লক্ষ টাকার একাধিক লেনদেন ও নগদ জমার উৎস সম্পর্কে সুমিতকে নির্দিষ্টভাবে প্রশ্ন করা হয়েছিল কি না, তা জানতে চায় বেঞ্চ।
“জিজ্ঞাসাবাদ এবং সুমিতের উত্তরের প্রতিলিপি, শ্রাব্য ও দৃশ্য নথি কি আমাদের দেওয়া যাবে?”—রাজ্যের কাছে জানতে চান প্রধান বিচারপতি। তুষার মেহতা জানান, পুলিশের হাতে থাকা সমস্ত প্রাসঙ্গিক নথিই আদালতে পেশ করা হবে; কিছুই গোপন রাখা হবে না।
শুনানিতে একটি রাজনৈতিক দলের হিসাব থেকে কোনও সংস্থার কাছে প্রায় ৩০ কোটি টাকা পাঠানোর অভিযোগও ওঠে। রাজ্যের বক্তব্য, অন্য কয়েকটি মামলায় ওই লেনদেনের তদন্ত চলছে। বিচারপতি বাগচী পাল্টা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে ঘিরে তদন্তে বিলম্ব নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের একাধিক বিচারপতিও আগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। রাজ্যের বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সংস্থার তদন্তে বিলম্ব হলেও রাজ্য পুলিশ তার নিজের মামলার প্রাসঙ্গিক লেনদেন যাচাই করতে পারে।
শালবনির মামলাটি প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, জাল নথি তৈরি, জাল নথি ব্যবহার এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে দায়ের হয়েছে। সুমিতের দাবি, মূল এফআইআরে তাঁর নাম ছিল না এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত সহকারী হওয়ার কারণেই পরে তাঁকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। রাজ্য পুলিশের পাল্টা দাবি, জাল দলিলের সাহায্যে সরকারি জমি হস্তান্তরের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের যোগের প্রাথমিক উপাদান মিলেছে; সেই কারণেই সুমিতকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
আগামী ৭ সেপ্টেম্বর জিজ্ঞাসাবাদের নথি পরীক্ষা করে সুপ্রিম কোর্ট স্থির করবে, সুমিতের আগাম জামিনের আবেদন মঞ্জুর হবে, না কি রাজ্য পুলিশের হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি গ্রহণ করা হবে। আপাতত তাঁকে তদন্তে হাজিরা ও সহযোগিতা চালিয়ে যেতে হবে, কিন্তু পুলিশ গ্রেফতার করতে পারবে না।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



