দৃষ্টিভঙ্গি

গ্রামোফোনের খাঁজে ‘বন্দে মাতরম্’

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • একটি গান কী ভাবে সময়ের সঙ্গে তার মর্যাদা, পরিচয় এবং রাজনৈতিক অর্থ বদলাতে পারে?
  • ‘বন্দে মাতরম্’-এর ইতিহাসে তার এক আশ্চর্য দলিল লুকিয়ে আছে দু’টি গ্রামোফোন রেকর্ডে।
  • ১৯৩৮ সালের একটি ঐতিহাসিক পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড এবং ১৯৫০ সালের ঘোষণার মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া আর একটি রেকর্ড যেন সেই পরিবর্তনেরই নীরব সাক্ষী।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

একটি গান কী ভাবে সময়ের সঙ্গে তার মর্যাদা, পরিচয় এবং রাজনৈতিক অর্থ বদলাতে পারে? ‘বন্দে মাতরম্’-এর ইতিহাসে তার এক আশ্চর্য দলিল লুকিয়ে আছে দু’টি গ্রামোফোন রেকর্ডে। ১৯৩৮ সালের একটি ঐতিহাসিক পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড এবং ১৯৫০ সালের ঘোষণার মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া আর একটি রেকর্ড যেন সেই পরিবর্তনেরই নীরব সাক্ষী।

গল্পের শুরু ১৯৩৮ সালের হরিপুরা কংগ্রেস অধিবেশন দিয়ে। সদ্য নির্বাচিত কংগ্রেস সভাপতি সুভাষচন্দ্র বসুকে নিয়ে অধিবেশনমণ্ডপের দিকে যে শোভাযাত্রা এগিয়েছিল, তা ছিল রাজনৈতিক কল্পনাশক্তির এক অসাধারণ প্রদর্শন।

হরিপুরা থেকে প্রায় চার মাইল পথ পেরিয়ে সুভাষচন্দ্রকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নন্দলাল বসুর পরিকল্পনা ও সজ্জায় তৈরি এক সুদৃশ্য রথে। রথটি টানছিল ৫১টি বলদ। রঙিন সাজে সজ্জিত, শিং রাঙানো বলদগুলি জোড়ায় জোড়ায় এগিয়ে চলেছিল। প্রত্যেক জোড়ার মাথায় ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকা, গলায় সুরে বাঁধা ঘণ্টা। আর সেই ঘণ্টাগুলিতে খোদাই করা ছিল—‘বন্দে মাতরম্’।

সেগুলিই হয়ে উঠেছিল ‘বন্দে মাতরম্ ঘণ্টা’।

সুভাষচন্দ্র অধিবেশনে পৌঁছেছিলেন কলকাতা থেকে সঙ্গে আনা একদল গায়ক ও বাদ্যযন্ত্রীকে নিয়ে। তাঁরা নাগপুর মেলের দ্বিতীয় শ্রেণির কামরায় তাঁর সঙ্গে যাত্রা করেছিলেন। দলের প্রধান সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন আর আর মুখোপাধ্যায়।

বাংলার সেই দল যখন ‘বন্দে মাতরম্’ গাইতে শুরু করল, মহাত্মা গান্ধী-সহ কংগ্রেসের প্রবীণ নেতারা সম্মান জানাতে উঠে দাঁড়ালেন। সরোজিনী নাইডুর বর্ণনায়, হরিপুরায় গানটি গাওয়া হয়েছিল ‘অপূর্ব সুন্দরভাবে’, গভীর আবেগে। কমলাদেবী চট্টোপাধ্যায়ও তরুণ বাঙালি গায়কদলের প্রশংসা করে বলেছিলেন, তাঁদের পরিবেশনা গোটা অধিবেশনের জন্য তৈরি করেছিল এক ‘চমৎকার আবেগময় পটভূমি’।

এই আবেগের পিছনে অবশ্য ছিল একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

‘বন্দে মাতরম্’-এর মর্যাদা নিয়ে বিতর্ক তার কয়েক মাস আগেই তীব্র হয়েছিল। ১৯৩৭ সালের অক্টোবরে কলকাতায় কংগ্রেস কার্যনির্বাহী সমিতির বৈঠকে গানটির অবস্থান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। হরিপুরার আয়োজনকে সেই প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করে দেখা কঠিন। যেন আগের সিদ্ধান্তে ক্ষুণ্ণ মর্যাদা আবার ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছিল কংগ্রেসের একটি অংশ।

মনে রাখা দরকার, কংগ্রেস বহু বছর ধরেই তার বার্ষিক অধিবেশনের কার্যবিবরণী ও প্রতিবেদনে ‘বন্দে মাতরম্’-কে ‘জাতীয় সঙ্গীত’ বলে উল্লেখ করত। ১৯২০-এর দশকে এমন বহু প্রতিবেদন সম্পাদনা ও প্রস্তুতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু, যিনি তখন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক।

অর্থাৎ হরিপুরায় ‘বন্দে মাতরম্’-এর জন্য কোনও নতুন মর্যাদা তৈরি করা হয়নি। বরং আগে থেকেই স্বীকৃত মর্যাদাকেই পুনরায় সামনে আনা হয়েছিল।

সুভাষচন্দ্র অবশ্য সেই পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে অধিবেশনমণ্ডপে সীমাবদ্ধ রাখেননি।

১৯৩৮ সালে ‘বন্দে মাতরম্’-এর মর্যাদা পুনরুদ্ধারের উদ্দেশ্যে তৈরি হল একটি বিশেষ গ্রামোফোন রেকর্ড। দায়িত্ব দেওয়া হল তৎকালীন ভারতীয় ঐকতান-সঙ্গীতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম তিমিরবরণকে।

প্রথম বার সম্পূর্ণ ‘বন্দে মাতরম্’ দুটি পৃথক রূপে সুরারোপ করা হল। একটিতে জাতীয় সঙ্গীতের গাম্ভীর্যে সমবেত কণ্ঠ, অন্যটিতে সামরিক কুচকাওয়াজের আবহে যন্ত্রসঙ্গীত। সেই সময়ের প্রচলিত ১০ ইঞ্চির বদলে ব্যবহার করা হল ১২ ইঞ্চির গ্রামোফোন চাকতি। বড় রেকর্ডে যেমন গানটির প্রতি বিশেষ সম্মানের ইঙ্গিত ছিল, তেমনই এক পিঠে ছয়টি স্তবক ধরে রাখার বাস্তব প্রয়োজনও ছিল।

রেকর্ডের নামপত্রও ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। চরকা-অঙ্কিত ত্রিবর্ণরঞ্জিত পতাকার নীচে পাশাপাশি দুটি ঘোষণা।

প্রথমটি—‘বন্দে মাতরম্—সম্পূর্ণ’।

অর্থাৎ দু’টি স্তবকে থেমে যাওয়া নয়, গাওয়া হবে গানটির সমস্ত স্তবক। ‘সম্পূর্ণ’-র এই ঘোষণা লেখা হয়েছিল দেবনাগরী, বাংলা ও নাস্তালিক—তিনটি লিপিতে।

তার নীচে মোটা ইংরেজি অক্ষরে দ্বিতীয় ঘোষণা—‘ভারতের জাতীয় সঙ্গীত’।

দ্ব্যর্থতার কোনও জায়গা রাখা হয়নি।

কিন্তু মাত্র এক বছরের মধ্যেই সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কংগ্রেসের সম্পর্ক নাটকীয় ভাবে বদলে গেল। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, ক্ষমতা হস্তান্তর এবং গণপরিষদ—ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলাতে শুরু করল জাতীয় সঙ্গীত নিয়েও বিতর্কের রূপরেখা।

১৯৪৮ সালে নেহরুর মন্ত্রিসভা সাময়িক ভাবে ‘জন গণ মন’-কে জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে বেছে নেয়। ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি গণপরিষদের ঘোষণায় সেই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিক রূপ পায়।

কিন্তু সেই ঘোষণার ভাষা একটু খুঁটিয়ে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চোখে পড়ে।

‘জন গণ মন’-কে জাতীয় সঙ্গীত ঘোষণা করা হলেও ‘বন্দে মাতরম্’-কে ‘জাতীয় গান’ বলা হয়নি। বরং বলা হয়েছিল, গানটি ‘জন গণ মন’-এর সমান মর্যাদায় সম্মানিত হবে এবং তার সমমর্যাদা থাকবে।

‘জাতীয় গান’—এই শব্দবন্ধটি সেখানে ছিল না।

পাঁচ বছর পর, ১৯৫৫ সালের ২৫ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ের একটি টীকায় নেহরু ‘বন্দে মাতরম্’-কে ‘বিশেষ জাতীয় গান’ বলে উল্লেখ করেন। ১৯৫০ সালের ‘সমমর্যাদা’-র ভাষা থেকে এটি ছিল লক্ষণীয় পরিবর্তন।

নেহরুর নির্দেশ ছিল, কোনও অনুষ্ঠানে যদি দুটি গানই পরিবেশিত হয়, তবে ‘বন্দে মাতরম্’ দিয়ে শুরু করে ‘জন গণ মন’ দিয়ে শেষ করতে হবে। যদিও সাধারণ নিয়ম হিসেবে একই অনুষ্ঠানে দু’টি গান পরিবেশন না করাই তাঁর পছন্দ ছিল।

ওই টীকা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকে পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকও ‘জাতীয় সঙ্গীত’ ও ‘জাতীয় গান’-এর মধ্যে পার্থক্য বজায় রাখে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই বিভাজনের সাংবিধানিক বা আইনগত ভিত্তি কোথায়?

এখানেই ফিরে আসে সেই প্রায় বিস্মৃত দ্বিতীয় গ্রামোফোন রেকর্ডটি।

১৯৩৮ সালের পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড এবং ১৯৫০ সালের ঘোষণার মাঝখানে প্রকাশিত সেই ১০ ইঞ্চির এইচএমভি রেকর্ডে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ছয়টি স্তবক কমে দাঁড়িয়েছিল চারটিতে।

শুধু গানটি নয়, বদলে গিয়েছিল তার পরিচয়ও।

রেকর্ডের নামপত্রে আর লেখা নেই ‘সম্পূর্ণ’। নেই ‘ভারতের জাতীয় সঙ্গীত’ কথাটিও।

তার বদলে লেখা—

‘ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গীত’।

কখন বদলাল পরিচয়? কেন বদলাল? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—‘কংগ্রেস’ শব্দটি সেখানে এল কার নির্দেশে?

রেকর্ডটি তার উত্তর দেয় না।

শুধু গ্রামোফোনের খাঁজে খাঁজে থেকে যায় এক অমীমাংসিত প্রশ্ন—একটি গান কি শুধু সুর ও শব্দে বদলায়, নাকি তার পরিচয়ও সময়ের সঙ্গে নতুন করে লেখা হয়?

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles