স্নাতকোত্তর স্তরের পদার্থবিদ্যার ছাত্র হৃষিকেশ কুমারের মৃত্যুকে ঘিরে আইআইটি দিল্লিতে ছাত্রবিক্ষোভ পঞ্চম দিনে পড়লেও আন্দোলনকারী এবং প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষের মধ্যে অচলাবস্থা কাটল না।   হৃষিকেশেরমৃত্যুর জন্য দায়ী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার নিরপেক্ষ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের পদত্যাগ এবং মৃতের পরিবারকে এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণের দাবিতে কয়েকশো ছাত্র শুক্রবারও অবস্থান-বিক্ষোভ চালিয়ে যান।

৩১ বছর বয়সি হৃষিকেশ গত ২২ আগস্ট আইআইটি দিল্লির বক্তৃতা ভবনের ছ’তলা থেকে পড়ে মারা যান। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। ২৪ আগস্ট থেকে ছাত্রদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে দিল্লি পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করে। কিন্তু ছাত্রদের বক্তব্য, শুধু পুলিশি তদন্ত যথেষ্ট নয়; হৃষিকেশকে  মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার পিছনে প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ব্যবস্থার কোনও ব্যর্থতা ছিল কি না, তা স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বার করতে হবে।

আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবিগুলির মধ্যে রয়েছে ছাত্রকল্যাণ বিভাগের ডিন, সহযোগী ডিন, ছাত্রাবাস পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত সহযোগী ডিন এবং পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রধানের পদত্যাগ। পাশাপাশি, হৃষিকেশের পরিবারকে অন্তত এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ এবং আন্দোলনে যোগ দেওয়া কোনও ছাত্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না এমন লিখিত আশ্বাসও চাইছেন তাঁরা।

ছাত্রদের অভিযোগ, হৃষিকেশ কয়েক মাস ধরেই মানসিক সমস্যার মধ্যে ছিলেন। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আইআইটি দিল্লিতে ভর্তি হওয়ার পরে পরপর দুই শিক্ষাবর্ষে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শ্রেণি-প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু চলতি বছরের মার্চ থেকে তাঁর মানসিক সমস্যা বাড়তে থাকে। ছাত্রাবাসে ঘর পাওয়া নিয়েও তিনি সমস্যায় পড়েছিলেন। প্রথমে তাঁকে ঘর বরাদ্দ করা হলেও সংশোধিত তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ যায় বলে সহপাঠীদের অভিযোগ। আগস্টে ফের আবেদন করেও তিনি ছাত্রাবাসে জায়গা পাননি।

তৃতীয় শিক্ষাবর্ষের প্রকল্পে সঙ্গী খুঁজে না পাওয়াও তাঁর উদ্বেগ বাড়িয়েছিল বলে সহপাঠীরা জানিয়েছেন। হৃষিকেশ একা প্রজেক্টটি  করতে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন না এবং শিক্ষককে অনুরোধ করেছিলেন অন্য কারও সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করে দিতে। কিন্তু তত দিনে অধিকাংশ ছাত্র নিজেদের দল তৈরি করে ফেলেছিলেন। ক্যাম্পাসের বাইরে কাটওয়ারিয়া সরাই এলাকায় মায়ের সঙ্গে ভাড়া থাকতেন ঋষিকেশ। সেখানে তাঁর দমবন্ধ লাগত বলেও তিনি বন্ধুদের জানিয়েছিলেন।

আন্দোলনকারীরা দাবি করেছেন, ২০২৩ সাল থেকে আইআইটি দিল্লিতে হৃষিকেশ-সহ আটজন ছাত্রের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। প্রতিবারই কর্তৃপক্ষ শোকবার্তা পাঠিয়েছেন, কিন্তু ছাত্রদের মানসিক চাপ, একাকিত্ব এবং প্রশাসনিক হয়রানির মূল সমস্যাগুলির স্থায়ী সমাধান হয়নি। তাঁদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানে পরামর্শদাতা থাকলেও মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার বড় অংশই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ। ফলে ছাত্র এবং প্রশাসনের মধ্যে বিশ্বাসের সম্পর্ক ভেঙে পড়েছে।

বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভকারীরা প্রধান ফটকের দিকে মিছিল করতে গেলে নিরাপত্তারক্ষীরা ব্যারিকেড দিয়ে তাঁদের আটকান। পরে ছাত্ররা শিক্ষক-আবাসন এলাকার দিকে যান এবং শিক্ষকদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানিয়ে স্লোগান দেন। আইআইটি দিল্লির অধিকর্তা রঙ্গন বন্দ্যোপাধ্যায় অভিযোগ করেছেন, রাত সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১২টার মধ্যে কয়েকজন বিক্ষোভকারী শিক্ষক-আবাসনের সামনে ‘অরুচিকর, অপমানজনক ও হুমকিমূলক’ স্লোগান দিয়েছেন। এতে শিক্ষক এবং তাঁদের পরিবারের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। ক্যাম্পাসের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।

ছাত্ররা অবশ্য হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, স্লোগানে শিক্ষক ও অন্য ছাত্রদের বাইরে এসে আন্দোলনের পাশে দাঁড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছিল। সেই স্লোগানকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে হুমকি হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে। আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, তাঁদের দাবির উৎস ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা; এর সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্পর্ক নেই।

অধিকর্তা ঋষিকেশের মৃত্যুকে প্রতিষ্ঠানের কাছে ‘সতর্কবার্তা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর দাবি, বহিরাগত সদস্যদের নিয়ে তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। প্রতিষ্ঠানের কল্যাণ তহবিল থেকে ঋষিকেশের পরিবারকে সাহায্য দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং শিক্ষক, ছাত্র ও কর্মীদের স্বেচ্ছা অনুদানের জন্য আলাদা তহবিল খোলা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে এক জন বহিরাগত অভিযোগ নিষ্পত্তিকারীও নিয়োগ করা হবে। কর্তৃপক্ষ এখনও পদত্যাগ ও নির্দিষ্ট অঙ্কের ক্ষতিপূরণের দাবি মানেনি। ফলে ক্লান্তি এবং শাস্তির আশঙ্কা সত্ত্বেও দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় ছাত্ররা।