দেউচা-পাঁচামিতে অবৈধ নিয়োগ বাতিল! সেপ্টেম্বরেই প্রকল্পের নয়া রূপরেখা ঘোষণা শুভেন্দুর

যা জানা জরুরি
- বীরভূমের দেউচা-পাঁচামি কয়লাখনি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেই একটি বিস্তারিত ও স্বচ্ছ রূপরেখা প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার।
- শনিবার বীরভূমে প্রশাসনিক বৈঠকের পর এ কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
- একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে প্রকল্প এলাকার আদিবাসীদের জমি বেআইনিভাবে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নামে পাট্টা দেওয়া হয়েছিল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বীরভূমের দেউচা-পাঁচামি কয়লাখনি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহেই একটি বিস্তারিত ও স্বচ্ছ রূপরেখা প্রকাশ করবে রাজ্য সরকার। শনিবার বীরভূমে প্রশাসনিক বৈঠকের পর এ কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। একই সঙ্গে তাঁর অভিযোগ, পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে প্রকল্প এলাকার আদিবাসীদের জমি বেআইনিভাবে তৃণমূল-ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের নামে পাট্টা দেওয়া হয়েছিল। নতুন সরকার সেই পাট্টাগুলি বাতিল করেছে। ওই জমি দেখিয়ে যাঁরা সরকারি চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁদের নিয়োগও বাতিল করা হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রীর দাবি।
শুভেন্দু বলেন, “সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে আবার আসব। দেউচা-পাঁচামি নিয়ে একটি সুনির্দিষ্ট রূপরেখা তৈরি করে আপনাদের জানাব।” তাঁর বক্তব্য, প্রকল্পের নামে স্থানীয় বাসিন্দা, বিশেষত আদিবাসীদের অধিকার খর্ব করা হবে না। জমির প্রকৃত মালিক কারা, কারা জমি দিয়েছেন এবং কারা ক্ষতিপূরণ বা চাকরি পেয়েছেন—সমস্ত তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। জাল দলিল কিংবা প্রভাব খাটিয়ে সরকারি সুবিধা নেওয়ার প্রমাণ মিললে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দেউচা-পাঁচামিতে এখনই কয়লা উত্তোলন শুরু হচ্ছে না। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়লার উপরে থাকা ব্যাসল্ট বা কালো পাথর সরানোর কাজ হবে। সেই কাজের জন্য নতুন করে দরপত্র ডাকার প্রস্তুতি চলছে। কয়লার স্তরে পৌঁছনোর আগে বিপুল পরিমাণ পাথর অপসারণ করতে হবে। ফলে প্রকল্পটি কীভাবে এগোবে, পরিবেশ ও জনবসতির উপরে তার প্রভাব কতটা হবে এবং স্থানীয় মানুষ কী সুবিধা পাবেন—সেপ্টেম্বরের রূপরেখায় সেই সব বিষয় থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেউচা-পাঁচামি ভারতের বৃহত্তম কয়লা ভাণ্ডারগুলির একটি। পূর্বতন তৃণমূল সরকার এই প্রকল্পকে রাজ্যের শিল্পায়ন ও দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ-নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছিল। প্রকল্প এলাকায় বহু আদিবাসী পরিবার, কৃষিজীবী, পাথরখাদান শ্রমিক এবং পাথর ভাঙার কারখানার কর্মী বসবাস করেন। ফলে শুরু থেকেই জমি, পুনর্বাসন, পরিবেশ এবং জীবিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার প্রকল্পের জন্য প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল। জমিদাতা পরিবারগুলিকে জমির দাম, পুনর্বাসনের বাড়ি, স্থানান্তর ভাতা এবং পরিবারের একজনকে সরকারি চাকরি দেওয়ার কথা বলা হয়। ২০২২ সালে প্রথম পর্যায়ে ২০৩ জন জমিদাতার হাতে চাকরির নিয়োগপত্র, জমির পাট্টা ও ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন সরকার দাবি করেছিল, কোনও জমি জোর করে নেওয়া হবে না।
কিন্তু জমিদাতা হিসেবে কারা সুবিধা পেয়েছেন, তা নিয়ে আগেই দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছিলেন শুভেন্দু। বিরোধী দলনেতা থাকাকালীন তাঁর অভিযোগ ছিল, প্রকল্প এলাকার জমি কেনাবেচায় প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও কিছু বহিরাগত জমি কিনেছিলেন এবং পরে তাঁদের জমিহারা দেখিয়ে চাকরি দেওয়া হয়েছিল। তৃণমূলের একাংশের আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠদেরও অন্যায়ভাবে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছিলেন তিনি।
তৃণমূল অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। দলের রাজ্যসভার সদস্য সামিরুল ইসলাম দাবি করেছিলেন, জমি না দিয়ে তাঁর কোনও আত্মীয় কিংবা পরিচিত ব্যক্তি চাকরি পাননি। তৎকালীন প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল, বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা কয়েকজনকে এলাকার সমীক্ষার কাজে সাময়িকভাবে নিয়োগ করা হয়েছিল; জমিহারাদের জন্য নির্ধারিত পুলিশ বা হোমগার্ডের চাকরি তাঁদের দেওয়া হয়নি। ফলে মুখ্যমন্ত্রীর এ দিনের বক্তব্যের পরে বাতিল পাট্টা ও চাকরির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশের দাবি উঠতে পারে।
বীরভূমের প্রশাসনিক বৈঠকে জেলার পরিকাঠামো নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন শুভেন্দু। আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। রামপুরহাট পুরসভার উন্নয়নে চার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানিয়েছেন। জেলা হাসপাতালগুলিতে শয্যাসংখ্যা বাড়ানো এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পরিষেবার ঘাটতি দ্রুত পূরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আসন্ন কৌশিকী অমাবস্যায় তারাপীঠে বিপুল পুণ্যার্থী সমাগমের কথা মাথায় রেখে নিরাপত্তা, যান চলাচল ও পরিষেবা ব্যবস্থাপনা জোরদার করতে বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। অনগ্রসর শ্রেণির শংসাপত্র পাওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি।
তবে বৈঠকের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেউচা-পাঁচামিই। সেপ্টেম্বরের ঘোষিত রূপরেখায় জমি ও চাকরির পুনর্যাচাই, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসন, পাথর অপসারণের দরপত্র, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং কয়লা উত্তোলনের সম্ভাব্য সময়সীমা সম্পর্কে কতটা স্পষ্ট তথ্য দেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর থাকবে প্রকল্প এলাকার বাসিন্দাদের।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



