‘সব শেষ, কেউ নেই’: হিমবাহ ভেঙে নেপাল-তিব্বতে ধ্বংসের মানচিত্র

যা জানা জরুরি
- সব শেষ, সবাই চলে গিয়েছে।” নেপালের রাসুয়া থেকে উদ্ধার হওয়ার পরে দিবগা তামাংয়ের এই কয়েকটি কথাতেই ধরা পড়েছে হিমালয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা।
- তিব্বত-নেপাল সীমান্তের বহু উঁচুতে হিমবাহ ও তার নীচের শিলাস্তর ভেঙে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা এবং জলের প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে…
- বিপর্যয়ের দু’দিন পরেও ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট নয়।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
“আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ নেই। সব শেষ, সবাই চলে গিয়েছে।” নেপালের রাসুয়া থেকে উদ্ধার হওয়ার পরে দিবগা তামাংয়ের এই কয়েকটি কথাতেই ধরা পড়েছে হিমালয়ের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতা। তিব্বত-নেপাল সীমান্তের বহু উঁচুতে হিমবাহ ও তার নীচের শিলাস্তর ভেঙে নেমে আসা বরফ, পাথর, কাদা এবং জলের প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে একের পর এক জনপদ। বিপর্যয়ের দু’দিন পরেও ক্ষয়ক্ষতির সম্পূর্ণ চিত্র স্পষ্ট নয়।
২৬ আগস্ট ভোরে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের প্রায় ৫,২০০ মিটার উচ্চতায় বিপর্যয়ের সূত্রপাত। প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রথমে হিমবাহের একটি বিশাল অংশ এবং তার নীচের শিলাস্তর ভেঙে পড়ে। সেই ধস এতটাই শক্তিশালী ছিল যে ভূকম্পন মাপার যন্ত্রে ৫.২ মাত্রার কম্পন ধরা পড়ে। লক্ষ লক্ষ টন বরফ ও পাথর পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নীচে নেমে নদীখাতে আছড়ে পড়ে। তার ধাক্কায় তৈরি হয় কয়েক তলা বাড়ির সমান উঁচু কাদা-জলের ঢেউ।
তিব্বতের গিরং অঞ্চল থেকে সেই ধ্বংসস্রোত সীমান্ত অতিক্রম করে নেপালের লেন্দে নদীতে পৌঁছয়। সেখান থেকে ভোটেকোশী এবং ত্রিশূলী নদী ধরে তা দক্ষিণে ছুটে যায়। পথে রাসুয়া ও নুয়াকোট জেলার বহু গ্রাম, সেতু, রাস্তা, জলবিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সীমান্ত-বাণিজ্য পরিকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, স্রোত আসার আগে সতর্ক হওয়ার মতো সময়ই পাওয়া যায়নি। কেউ ঘুম থেকে উঠছিলেন, কেউ কাজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন—তার মধ্যেই গোটা বসতি কাদার নীচে চাপা পড়ে।
তিব্বতের গিরং স্থলবন্দরের বহুতল ভবন, গাড়ি রাখার জায়গা এবং সংযোগকারী রাস্তার বড় অংশ নিশ্চিহ্ন হয়েছে। কোথাও কাদার স্তর দেড় মিটারেরও বেশি। নেপালের দিকে প্রায় ১৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকায় বিপর্যয়ের চিহ্ন ছড়িয়েছে। মৃতদেহ এবং ধ্বংসস্তূপ ত্রিশূলী ও গণ্ডক নদী বেয়ে এত দূরে চলে গিয়েছে যে উত্তরপ্রদেশের নদী থেকেও অন্তত দশটি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
শুক্রবার রাত পর্যন্ত নেপালে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭৯। তিব্বতে মৃত্যু হয়েছে অন্তত পাঁচজনের। নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষের তালিকায় নিখোঁজ ১,৯২৪ জন—আগের দিনের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। তিব্বতের গিরং অঞ্চলে আরও ৫৫৮ জনের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সংস্থার হিসাবে, প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ এই বিপর্যয়ে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি। তাঁদের বড় অংশ ভারতীয় এবং কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন। ভারতের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এখনও প্রায় ৩২০ জন ভারতীয়ের খোঁজ নেই। সীমান্তের অভিবাসন দপ্তর, হোটেল এবং যাত্রীশিবির আচমকা ধ্বংসস্রোতের কবলে পড়ায় বহু তীর্থযাত্রী কোথায় ছিলেন, তা নির্দিষ্ট করে জানা যাচ্ছে না।
রাষ্ট্রপুঞ্জের হিসাবে, নেপালে ৪০টির বেশি সেতু ধ্বংস হয়েছে বা গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিশ্চিহ্ন হয়েছে প্রায় ৪০ কিলোমিটার রাস্তা। অন্তত আটটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ক্ষতিগ্রস্ত। রাস্তা ও সেতু ভেঙে পড়ায় বহু এলাকায় স্থলপথে পৌঁছনো যাচ্ছে না। সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারই উদ্ধার এবং ত্রাণ পৌঁছনোর প্রধান ভরসা। সুড়ঙ্গ ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ভিতরে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারের কাজও চলছে।
বিপদ এখনও কাটেনি। ধসে নেমে আসা পাথর ও বরফ নদীর পথ আটকে অন্তত দু’টি অস্থায়ী হ্রদ তৈরি করেছে। তার একটির জল লেন্দে ও ত্রিশূলী নদীতে উপচে পড়তে শুরু করায় শুক্রবার উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। বাঁধের মতো জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ আচমকা ভেঙে গেলে নতুন করে প্রবল বন্যা হতে পারে।
চিনের এক ভূবিপর্যয় বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেছেন, এই অঞ্চলে আরও একশোর বেশি হিমবাহ-হ্রদ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। উষ্ণায়নের ফলে হিমবাহ দ্রুত গলছে, বরফের বন্ধন দুর্বল হচ্ছে এবং পাহাড়ের জমাট মাটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে। ফলে হিমবাহের সঙ্গে শিলাস্তর ভেঙে পড়া এবং আকস্মিক হ্রদ-বিস্ফোরণের আশঙ্কা বাড়ছে।
ইউনিসেফের মুখপাত্র রিকার্ডো পিরেসের সতর্কবার্তা তাই আরও উদ্বেগজনক—“দুঃখজনক ভাবে, আমরা হয়তো এই বিপর্যয়ের কেবল শুরুটাই দেখছি।” উদ্ধারকারীদের সামনে এখন দুটি সমান কঠিন কাজ: নিখোঁজদের সন্ধান করা এবং পাহাড়ের উপরে তৈরি নতুন অস্থায়ী হ্রদগুলির দিকে অবিরাম নজর রাখা। কারণ প্রথম ধ্বংসস্রোত থামলেও হিমালয়ের বুকের ভিতরে পরবর্তী বিপর্যয়ের বিপদ এখনও জীবন্ত।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



