Table of Contents
হাইলাইটস
- ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলের নির্বাহী আদেশ অসাংবিধানিক ঘোষণা সুপ্রিম কোর্টের।
- প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, চতুর্দশ সংশোধনী সকল মার্কিনভূমিজাত মানুষের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করেছে।
- বিচারপতি কেতনজি ব্রাউন জ্যাকসন ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে তীব্র সতর্কবার্তা দেন।
- বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস, স্যামুয়েল অ্যালিটো ও নীল গরসাচ ভিন্নমত পোষণ করেন।
- প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার রায়ে উঠে আসে মার্কিন সংবিধান, গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী ইতিহাস ও নাগরিকত্ব নিয়ে গভীর সাংবিধানিক বিতর্ক।
প্রথম কিস্তি
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়গুলি শুধু নির্দিষ্ট কোনও মামলার নিষ্পত্তি করে না, আদালতের আদর্শগত অবস্থান এবং বিচারদর্শনেরও পরিচয় বহন করে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ছয়জন রক্ষণশীল এবং তিনজন উদারপন্থী বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত এই আদালত এমন একাধিক ঐতিহাসিক রায় দিয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের ক্ষমতার কাঠামো এবং দেশটির সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনকে আমূল বদলে দিয়েছে।
মঙ্গলবার আদালত বহুল আলোচিত এক রায়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) বাতিলের প্রচেষ্টা খারিজ করে দেয়। ট্রাম্প দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন, যার মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসী এবং অস্থায়ী বিদেশি বাসিন্দাদের সন্তানদের স্বয়ংক্রিয় মার্কিন নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করার চেষ্টা করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে রায় লিখতে গিয়ে প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস বলেন, ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশ মার্কিন সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী লঙ্ঘন করেছে।
রবার্টস লেখেন, “নাগরিকত্ব তখনও, এখনও—অধিকার ভোগের মৌলিক অধিকার। এটি মানুষের রাজনৈতিক সমাজে স্বাধীনভাবে অংশগ্রহণের অধিকার নিশ্চিত করে। চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতারা এই প্রতিশ্রুতি এই দেশের প্রতিটি স্বাধীনভাবে জন্ম নেওয়া মানুষের জন্য প্রসারিত করেছিলেন। আজও আমরা সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছি।” এই সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ে রবার্টসের সঙ্গে একমত হন উদারপন্থী বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র, এলেনা কাগান ও কেতনজি ব্রাউন জ্যাকসন। তাঁদের পাশাপাশি রক্ষণশীল বিচারপতি অ্যামি কোনি ব্যারেটও এই রায়ে যোগ দেন।
বিচারপতি জ্যাকসন পৃথক একটি সহমতসূচক মতামত লেখেন, যার একটি অংশে সোটোমেয়রও একমত হন। অন্যদিকে বিচারপতি ব্রেট কাভানফ রায়ের ফলাফলের সঙ্গে একমত হলেও যুক্তিতে আংশিক ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ ফেডারেল আইনের পরিপন্থী হলেও সংবিধানবিরোধী নয়। অন্য তিন রক্ষণশীল বিচারপতি—ক্ল্যারেন্স থমাস, স্যামুয়েল অ্যালিটো এবং নীল গরসাচ—সম্পূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশ করেন।
প্রায় ২০০ পৃষ্ঠাজুড়ে বিস্তৃত এই রায়, সহমত ও ভিন্নমতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন। নিচে তার উল্লেখযোগ্য অংশগুলি তুলে ধরা হল।
১. রবার্টস: সরকারের ব্যাখ্যার পক্ষে “প্রায় কোনও প্রমাণই নেই”
নিজের রায়ে প্রধান বিচারপতি রবার্টস বলেন, সরকার এবং প্রধান ভিন্নমত উভয়েই “আনুগত্য” (Allegiance) শব্দটির অর্থ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভুল করেছেন। তাঁর ভাষায়, “তাঁদের দাবি, কেবল জন্মগত আনুগত্য নাগরিকত্বের জন্য যথেষ্ট নয়; আরও উচ্চমাত্রার আনুগত্য প্রয়োজন।” এরপর রবার্টস প্রশ্ন তোলেন—“কতটা বেশি?” তিনি লেখেন,
“সরকার নানা ধরনের ব্যাখ্যা দিচ্ছে—‘প্রাথমিক আনুগত্য’, ‘যথেষ্ট আনুগত্য’, ‘পূর্ণ আনুগত্য’, ‘প্রয়োজনীয় আনুগত্য’। কিন্তু সব ব্যাখ্যার মূল ভিত্তি একটাই—স্থায়ী বসবাসের স্থান বা ডোমিসাইল। সরকারের বক্তব্য, চতুর্দশ সংশোধনী অনুমোদনের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে এই ধারণা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল যে স্থায়ী বাসস্থানই আনুগত্য নির্ধারণ করে।” কিন্তু রবার্টস এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে লেখেন, “সমস্যা হল, এই সম্পূর্ণ নতুন ব্যাখ্যার পক্ষে কার্যত কোনও ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। কোথাও এমন বলা হয়নি যে এ ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল।” তিনি স্পষ্ট ভাষায় সরকারের এই অবস্থানকে “ইতিহাসের সম্পূর্ণ পুনর্লিখন” বলেও আখ্যা দেন।
২. জ্যাকসনের জবাব: চতুর্দশ সংশোধনীকে বর্ণভিত্তিক প্রতিকার হিসেবে দেখানো ইতিহাসের সঙ্গে অসংগত
নিজের সহমতসূচক মতামতে বিচারপতি কেতনজি ব্রাউন জ্যাকসন সরাসরি বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাসের ব্যাখ্যার বিরোধিতা করেন। তাঁর মতে, থমাস চতুর্দশ সংশোধনীর নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারাকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, যা ইতিহাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।জ্যাকসন লেখেন,
“দীর্ঘদিন ধরে ‘বর্ণনিরপেক্ষ সংবিধান’-এর সমর্থক হিসেবে পরিচিত বিচারপতি থমাস এখন বিস্ময়করভাবে দাবি করছেন, নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারাটি নাকি মূলত বর্ণভিত্তিক একটি সংশোধনমূলক ব্যবস্থা ছিল।” তিনি আরও লেখেন,
“তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হলেও যাঁদের বাবা-মায়ের স্থায়ী বাসস্থান এখানে নয়, তাঁদের সন্তানরা জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব দাবি করতে পারে না। কিন্তু চতুর্দশ সংশোধনী অনুমোদনের ইতিহাসের সঙ্গে এই সংকীর্ণ ব্যাখ্যার কোনও বাস্তব সম্পর্ক নেই।” জ্যাকসনের মতে, এর চেয়েও বড় সমস্যা হল, এই ব্যাখ্যা গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী নতুন আমেরিকার মৌলিক উদ্দেশ্যকেই অস্বীকার করে। তিনি লেখেন, “পুনর্গঠন-পর্বের সাংবিধানিক সংশোধনীগুলি কোনও বিশেষ গোষ্ঠীর জন্য সীমিত প্রতিকার ছিল না। সেগুলির উদ্দেশ্য ছিল জাতপাত, বর্ণভেদ ও সামাজিক অধীনতার বিরুদ্ধে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুন ভিত্তির উপর দাঁড় করানো।”
৩. “ইতিহাস ভুলে যাওয়ার চেয়েও বিপজ্জনক ইতিহাস বিকৃত করা”
জ্যাকসনের সহমতসূচক মতামতের সবচেয়ে আলোচিত অংশগুলির একটি ছিল ইতিহাস নিয়ে তাঁর সতর্কবার্তা। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, গৃহযুদ্ধের পরে বিশিষ্ট কৃষ্ণাঙ্গ নেতা ফ্রেডরিক ডগলাস প্রায়ই বাইবেলের কাহিনির আলোকে সমসাময়িক আমেরিকার ঘটনাবলি ব্যাখ্যা করতেন। জ্যাকসন লেখেন,
“একটি ভাষণে ডগলাস বলেছিলেন, তাঁর উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে বোঝানো—একটি জাতির স্মৃতিশক্তি থাকা উচিত।”এরপর তিনি বলেন, “ডগলাসের সেই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মন্তব্যের পর বহু বছর কেটে গেছে। এখন আমরা বুঝতে শিখেছি, শুধু ইতিহাস ভুলে যাওয়াই বিপদ নয়। ইতিহাসকে বিকৃত করা, অতীতকে নতুনভাবে সাজিয়ে ভুল উদ্দেশ্যকে বৈধতা দেওয়া—সম্ভবত তার চেয়েও বড় বিপদ।” তিনি আক্ষেপ করে লেখেন,
“আজ আমরা ঠিক সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি। সরকার, প্রধান ভিন্নমত এবং কয়েকজন ইতিহাস-সংশোধনবাদী ভাষ্যকার এমন এক ব্যাখ্যা সামনে আনছেন, যা শুধু সংবিধানের ভাষার সঙ্গেই নয়, প্রশিক্ষিত ইতিহাসবিদদের প্রতিষ্ঠিত গবেষণার সঙ্গেও স্পষ্টভাবে সাংঘর্ষিক।” জ্যাকসনের মতে, এই বিকল্প ব্যাখ্যার আর-একটি গুরুতর সমস্যা রয়েছে।
“এই যুক্তি কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। অথচ চতুর্দশ সংশোধনীর প্রবক্তারা কখনও এমন বিভাজনের কথা বলেননি। মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের সংগ্রাম ছিল সমস্ত মানুষের সমান মানবিক মর্যাদার জন্য। মহান মুক্তিদাতা আব্রাহাম লিঙ্কনও শেষ পর্যন্ত উপলব্ধি করেছিলেন, দাসত্ব কিংবা বর্ণভিত্তিক অধীনতার পুনরাবৃত্তি রোধের একমাত্র উপায় হল সকল মানুষের ভাগ্যকে একই নৈতিক ভিত্তিতে যুক্ত করা।” জ্যাকসনের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তাঁর দৃষ্টিতে চতুর্দশ সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল কোনও নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে সুবিধা দেওয়া নয়; বরং সমগ্র মানবসমাজের সমতার নীতি প্রতিষ্ঠা করা।
৪. জ্যাকসন: “সরকার এবং বিচারপতি থমাসই চতুর্দশ সংশোধনীকে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করছেন”
সহমতসূচক মতামতের সবচেয়ে তীক্ষ্ণ অংশে বিচারপতি কেতনজি ব্রাউন জ্যাকসন বলেন, চতুর্দশ সংশোধনীকে তার প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করেছেন সরকার এবং বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাসই। তিনি লেখেন, “চতুর্দশ সংশোধনীকে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন সরকার এবং বিচারপতি থমাসই। সংবিধান যে সব ধরনের জাতপাত, বংশগত বৈষম্য এবং মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে, তাঁরা সেই মৌলিক সত্যকেই উপেক্ষা করছেন। এর ফলে তাঁরা চতুর্দশ সংশোধনীর প্রণেতাদের সেই সর্বজনীন আদর্শকে অস্বীকার করছেন, যার লক্ষ্য ছিল ভেঙে পড়া রাষ্ট্রকে পুনর্গঠন করা, চিরস্থায়ী ন্যায়বিচারের ভিত্তি স্থাপন করা এবং আইনের দৃষ্টিতে প্রতিটি মানুষের নিখুঁত সমতা প্রতিষ্ঠা করা।”
এরপর তিনি রায়ের অন্যতম স্মরণীয় মন্তব্যটি করেন। “সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হল, ড্রেড স্কট রায়ের সমালোচনা যতই করা হোক না কেন, সরকার এবং প্রধান ভিন্নমত শেষ পর্যন্ত সেই রায়েরই মূল নীতিতে ফিরে যেতে চাইছেন।” তিনি ব্যাখ্যা করেন, “তাঁদের মূল বক্তব্য হল, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে আমেরিকার মাটিতে জন্ম নেওয়াই নাগরিকত্ব পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। অথচ নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারাটি স্পষ্টভাবেই এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠের রায় সেটিই ব্যাখ্যা করেছে।”এরপর তিনি আরও যোগ করেন,
“আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই, চতুর্দশ সংশোধনীর সর্বজনীন আদর্শ চিরকালের জন্য এমন সব দাবির অবসান ঘটানোর কথা, যেখানে রক্তের সম্পর্ক বা বংশপরিচয়কে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের মাপকাঠি বানানোর চেষ্টা করা হয়।”শেষে জ্যাকসন লেখেন, “গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে যে নতুন আমেরিকার জন্ম হয়েছিল, সেখানে এমন বৈষম্যমূলক পরিণতির কোনও স্থান নেই। সৌভাগ্যবশত, আজ আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা সেই মৌলিক সত্যটি স্মরণ রেখেছেন এবং আবারও প্রতিষ্ঠা করেছেন আমাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতি—সব মানুষ সমান।”
৫. থমাস: কৃষ্ণাঙ্গদের নাগরিকত্বের অধিকার ছিল, কারণ তাঁদের অন্য কোনও মাতৃভূমি ছিল না
ভিন্নমতসূচক রায়ে বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাখ্যা তুলে ধরেন। তিনি লেখেন,“কৃষ্ণাঙ্গরা নাগরিকত্ব পাওয়ার অধিকারী ছিলেন, কারণ তাঁরা আমেরিকান ছিলেন। তাঁদের অন্য কোনও মাতৃভূমি ছিল না। তাঁরা কোনও বিদেশি শক্তির প্রতি আনুগত্যশীল ছিলেন না এবং অন্য কোনও রাষ্ট্রের কর্তৃত্বের অধীনও ছিলেন না।” থমাস আরও লেখেন,“তাঁরা একই যুদ্ধে লড়েছেন, একই বিজয়ে অংশীদার হয়েছেন এবং যুদ্ধের সময় দেশের প্রতিরক্ষার জন্য অন্য সব নাগরিকের মতোই তাঁদের ডাকা হতে পারত।”
তাঁর মতে, চতুর্দশ সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল এই কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে তাঁদের আর কখনও দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা না হয়। কিন্তু তিনি বলেন,“বিদেশি অস্থায়ী বাসিন্দাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে একই যুক্তি প্রযোজ্য নয়। তাঁদের পরিবার নিজ দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে, সেই দেশের প্রতিই আনুগত্য থাকে এবং যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে তাঁদের ডাকা হবে—এমন কোনও বাধ্যবাধকতাও থাকে না।” অর্থাৎ, থমাসের মতে জন্মস্থান একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না; নাগরিকত্বের সঙ্গে রাষ্ট্রের প্রতি স্থায়ী আনুগত্যের প্রশ্নও জড়িত।
এই অংশে স্পষ্ট হয়ে যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং ভিন্নমতের বিচারপতিরা একই সাংবিধানিক ধারাকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ঐতিহাসিক ও আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করেছেন। একজন যেখানে সমতার সর্বজনীন নীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন, অন্যজন সেখানে সংশোধনীর মূল ঐতিহাসিক উদ্দেশ্যকে সীমিত পরিসরে ব্যাখ্যা করছেন।
৬. থমাস: রাষ্ট্রপতির আদেশের বহু অংশ সংবিধানের মূল অর্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ
ভিন্নমত পোষণ করে বিচারপতি ক্ল্যারেন্স থমাস লেখেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা অযথা রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশকে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন,“আজ আদালত এক অসাধারণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা রাষ্ট্রপতির সেই নির্বাহী আদেশকে সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে বিদেশি অস্থায়ী বাসিন্দা এবং অবৈধভাবে অবস্থানকারী অভিবাসীদের সন্তানদের নাগরিকত্বের আওতার বাইরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল।”
থমাসের মতে,“এর মাধ্যমে আদালত চতুর্দশ সংশোধনীর সেই দুঃখজনক ইতিহাসে আরেকটি অধ্যায় যোগ করল, যেখানে মুক্তিপ্রাপ্ত কৃষ্ণাঙ্গদের সমঅধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রণীত সংশোধনীকে পরবর্তীকালে এমন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়েছে, যা পুনর্গঠন-পর্বের কংগ্রেস কখনও সমর্থন করেনি।”তিনি আরও লেখেন,“রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশের বহু সম্ভাব্য প্রয়োগ নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারার মূল ও প্রচলিত অর্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেই কারণেই আমি বিনীতভাবে ভিন্নমত পোষণ করছি।”
৭. থমাস: “আজকের এই রায় সময়ের পরীক্ষায় টিকবে কি না, সে বিষয়ে আমার সন্দেহ আছে”
থমাস তাঁর ভিন্নমতের শেষ অংশে আরও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি লেখেন,“আদালত আবারও চতুর্দশ সংশোধনীকে এমন কিছু অধিকারের সুরক্ষায় ব্যবহার করছে, যেগুলির কথা পুনর্গঠন-পর্বের কংগ্রেস কখনও ভাবেনি এবং যার সমর্থন সংশোধনীর ভাষাতেও নেই।” তিনি আরও বলেন,“আজ আদালত এমন এক সাংবিধানিক অধিকার স্বীকার করল, যার ফলে বিদেশ থেকে শুধুমাত্র সন্তান প্রসবের উদ্দেশ্যে আসা ব্যক্তিদের সন্তান এবং অবৈধভাবে দেশে থাকা বিদেশিদের সন্তানরাও জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব পাবে।”
এরপর তিনি মন্তব্য করেন,“আজকের এই রায় সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকবে কি না, সে বিষয়ে আমি নিশ্চিত নই।”থমাসের মতে,“নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত ধারাটি একসময় মার্কিন নাগরিকত্বের মর্যাদা ও গৌরবকে অনেক উঁচুতে তুলে ধরেছিল।”কিন্তু তাঁর অভিযোগ,“আজকের এই রায় সেই নাগরিকত্বের মূল্যই কমিয়ে দিল।”
৮. অ্যালিটো: “আদালতের ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রায়, কিন্তু আদালত গুরুতর ভুল করেছে”
বিচারপতি স্যামুয়েল অ্যালিটো তাঁর ভিন্নমতসূচক রায়ে আরও সরাসরি আক্রমণ করেন সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্তকে। তিনি লেখেন,“আদালতের ইতিহাসে এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রায়। কিন্তু আমার দৃঢ় বিশ্বাস, আদালত এখানে একটি গুরুতর ভুল করেছে।”অ্যালিটোর মতে,“আজকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী চতুর্দশ সংশোধনী এমন প্রায় প্রত্যেককেই নাগরিকত্ব দিচ্ছে, যিনি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মেছেন। এমনকি যাঁরা শুধুমাত্র সন্তান প্রসবের উদ্দেশ্যে বিদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন, তাঁদের সন্তানরাও এর আওতায় পড়ছেন।”
তিনি দাবি করেন,“চতুর্দশ সংশোধনীর ভাষা এবং এটি প্রণয়নের ইতিহাস গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এর উদ্দেশ্য কখনও মার্কিন নাগরিকত্বের ধারণাকে এতটা বিস্তৃত করা ছিল না।”অ্যালিটোর বক্তব্য,“এই সংশোধনী কেবল তাঁদের সন্তানদের নাগরিকত্ব দেয়, যাঁরা জন্মের মুহূর্ত থেকেই একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিই আনুগত্যশীল।”
৯. কাভানফ: চাইলে কংগ্রেস আইন বদলাতে পারে
বিচারপতি ব্রেট কাভানফ সংখ্যাগরিষ্ঠ রায়ের ফলাফলের সঙ্গে একমত হলেও যুক্তির ক্ষেত্রে ভিন্ন অবস্থান নেন।তাঁর মতে, ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ সংবিধান লঙ্ঘন না করলেও বিদ্যমান ফেডারেল আইনের বিরোধী।তিনি লেখেন,“কংগ্রেস চাইলে চতুর্দশ সংশোধনীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই বর্তমান আইনের সংশোধন করতে পারে অথবা নতুন আইন প্রণয়ন করে অবৈধভাবে অবস্থানকারী কিংবা অস্থায়ী বিদেশি নাগরিকদের সন্তানদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নির্ধারণ করতে পারে।” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, “এখনও পর্যন্ত কংগ্রেস এমন কোনও আইন করেনি।”
রায়ের তাৎপর্য
প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার এই রায় কেবল জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নে একটি সাংবিধানিক বিতর্কের নিষ্পত্তি নয়; এটি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে ইতিহাস, সংবিধানের ভাষা, নাগরিকত্বের ধারণা এবং রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে গভীর আদর্শগত বিভাজনও প্রকাশ করেছে।সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা চতুর্দশ সংশোধনীকে সর্বজনীন সমতা ও জন্মভিত্তিক নাগরিকত্বের সাংবিধানিক নিশ্চয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বিপরীতে, ভিন্নমতাবলম্বী বিচারপতিরা যুক্তি দিয়েছেন যে সংশোধনীর উদ্দেশ্য ছিল অনেক বেশি সীমিত এবং এটি বিদেশি নাগরিকদের সন্তানদের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য নয়।
এই কারণেই রায়টি শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উদ্যোগকে ব্যর্থ করেনি; ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব, অভিবাসননীতি এবং সংবিধান ব্যাখ্যা নিয়ে বিতর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবেও বিবেচিত হবে।