কিশোরদের আসক্তি রুখতে মেটার ১৭০০ কোটি ডলারের সমঝোতা, বদল ইনস্টাগ্রাম-ফেসবুকে

যা জানা জরুরি
- কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক মাধ্যমের প্রতি আসক্ত করে তোলার অভিযোগে চলা ঐতিহাসিক মামলা মেটাতে ১৭০০ কোটি ডলারের সমঝোতায় পৌঁছেছে মেটা।
- আদালত প্রস্তাবিত চুক্তিতে অনুমোদন দিলে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য দৈনিক সময়সীমা, রাতে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, বিদ্যালয়ের সময়ে বার্তা পাঠানো বন্ধ রাখা এবং আরও…
- সমঝোতার পক্ষগুলির দাবি, এই চুক্তি শিশুদের ক্ষতি করে এমন বিপজ্জনক বাণিজ্যিক পদ্ধতির অবসান ঘটাবে এবং অনলাইনের বিপদ থেকে তাদের রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক মাধ্যমের প্রতি আসক্ত করে তোলার অভিযোগে চলা ঐতিহাসিক মামলা মেটাতে ১৭০০ কোটি ডলারের সমঝোতায় পৌঁছেছে মেটা। আদালত প্রস্তাবিত চুক্তিতে অনুমোদন দিলে ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকে অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের জন্য দৈনিক সময়সীমা, রাতে ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, বিদ্যালয়ের সময়ে বার্তা পাঠানো বন্ধ রাখা এবং আরও শক্তিশালী অভিভাবকীয় নিয়ন্ত্রণ চালু হবে।
সমঝোতার পক্ষগুলির দাবি, এই চুক্তি শিশুদের ক্ষতি করে এমন বিপজ্জনক বাণিজ্যিক পদ্ধতির অবসান ঘটাবে এবং অনলাইনের বিপদ থেকে তাদের রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।
ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বোন্টা জানিয়েছেন, আদালতের অনুমোদন মিললে দশ বছরে ধাপে ধাপে অর্থ দেবে মেটা। ক্যালিফোর্নিয়া পাবে অন্তত ১৫০ কোটি ডলার। নিউ জার্সির প্রাপ্য অন্তত ৫২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার, ম্যাসাচুসেটসের ৩৬ কোটি ৬০ লক্ষ ডলার এবং ভার্জিনিয়ার ৩৫ কোটি ৩০ লক্ষ ডলার।
কী কী বদলাবে
প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, ১৮ বছরের কম বয়সি ব্যবহারকারীদের জন্য ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুক ব্যবহারের দৈনিক স্বাভাবিক সীমা হবে দু’ঘণ্টা। নির্দিষ্ট সময়ের পরে ব্যবহার বন্ধ করার ‘কঠোর ঊর্ধ্বসীমা’ এবং বিরতির ব্যবস্থাও থাকবে।
রাত ১২টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দুই মাধ্যমের ব্যবহার বন্ধ রাখা হবে। কর্মদিবসে বিদ্যালয়ের সময়, অর্থাৎ সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টে পর্যন্ত কোনও তাৎক্ষণিক বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হবে না।
ব্যবহারকারীর প্রকৃত বয়স যাচাইয়ের জন্য আরও নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা চালু করবে মেটা। খাওয়াদাওয়াজনিত মানসিক সমস্যা, আত্মক্ষতি, হেনস্থা এবং শিশুদের পক্ষে ক্ষতিকর অন্যান্য বিষয় যাতে তাদের সামনে না আসে, সে জন্য বয়স অনুযায়ী বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
অভিভাবকদের জন্য নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী এবং সহজে ব্যবহারযোগ্য করার কথাও চুক্তিতে রয়েছে। ‘লাইক’-এর সংখ্যা দেখে নিজের সঙ্গে অন্যের তুলনা করার মতো বৈশিষ্ট্যগুলির ব্যবহার সীমিত করা হবে। নতুন নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর ভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখবেন স্বাধীন নিরীক্ষক।
টিকটক ও ইউটিউবের উপরেও শর্ত
মেটার হিসাবে সমঝোতার মোট মূল্য ১৮০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে টেক্সাসকে দেওয়ার সম্ভাব্য বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণও রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই অর্থ দশ বছর ধরে দেওয়া হবে এবং তা কিশোর-কিশোরীদের অনলাইন নিরাপত্তা সংক্রান্ত কর্মসূচিতে ব্যয় করা হবে।
তবে মোট অর্থের ৩০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৫৩০ কোটি ডলার, শর্তসাপেক্ষ। ইউটিউব ও টিকটক একই ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা চালু করলেই সংশ্লিষ্ট অঙ্গরাজ্যগুলি এই অর্থ পাবে। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাকে এক ঘণ্টার দৈনিক সময়সীমা, রাতে ব্যবহারে বাধা এবং বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি তাদের সম্মিলিত ভাবে সমপরিমাণ অর্থও দিতে হবে।
ইউটিউবের মালিক গুগল কিংবা টিকটক এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনও মন্তব্য করেনি। মেটা অবশ্য প্রকাশ্যে দুই প্রতিদ্বন্দ্বীকেই একই ধরনের শিশু-সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।
সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল জুকারবার্গের
২০২৩ সালে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল ২৯টি অঙ্গরাজ্য। ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, কেন্টাকি ও নিউ জার্সিকে নিয়ে চলা বর্তমান মামলার বিচার শুরু হয়েছিল গত সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ার ওকল্যান্ডে। মামলাটি শুনছিলেন আমেরিকার জেলা বিচারক ইভন গঞ্জালেজ রজার্স। মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জুকারবার্গেরও জুরিদের সামনে সাক্ষ্য দেওয়ার কথা ছিল।
মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল, শিশুদের নিজেদের মাধ্যমে আটকে রাখতে এবং ক্রমশ আসক্ত করে তুলতে মেটা ইচ্ছাকৃত ভাবে একাধিক বৈশিষ্ট্য তৈরি করেছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্যসঙ্কট তীব্র হলেও সেই ক্ষতির কথা সংস্থাটি সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন রেখেছিল। অভিভাবকদের সম্মতি ছাড়াই ১৩ বছরের কম বয়সি শিশুদের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করে মেটা আমেরিকার কেন্দ্রীয় আইনও লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ।
ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরি মঙ্গলবার সাক্ষ্য দেওয়া শুরু করেছিলেন। শিশুদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা রক্ষায় মেটা যে অগ্রগতি করেছে, তিনি তার পক্ষে সওয়াল করেন। অন্য অঙ্গরাজ্যগুলিতেও পরবর্তী সময়ে মামলা শুরু হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া আরও ন’জন অ্যাটর্নি জেনারেল পৃথক ভাবে মামলা করেছিলেন।
‘মুনাফাকেই নিরাপত্তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব’
মামলাটির সূত্রপাত আটটি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেলদের দ্বিদলীয় তদন্ত থেকে। ক্যালিফোর্নিয়া, ফ্লরিডা, কেন্টাকি, ম্যাসাচুসেটস, নেব্রাস্কা, নিউ জার্সি, টেনেসি এবং ভারমন্ট সেই তদন্তে নেতৃত্ব দিয়েছিল।
২০২১ সালে প্রকাশিত কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইনস্টাগ্রাম কিশোর-কিশোরীদের, বিশেষত কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য ও নিজের শরীর সম্পর্কে ধারণার কতটা ক্ষতি করতে পারে, তা মেটা জানত। তার পর থেকে কিশোরদের জন্য পৃথক হিসাব, বার্তা আদানপ্রদান ও গোপনীয়তায় বাড়তি সুরক্ষা এবং বিষয়বস্তুর উপরে বিধিনিষেধ-সহ বেশ কিছু ব্যবস্থা চালু করেছে সংস্থাটি।
তবে শিশু-সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং মেটার কয়েকজন প্রাক্তন কর্মীর অভিযোগ, এই ব্যবস্থাগুলির অনেকটাই লোকদেখানো। মেটার প্রাক্তন প্রকৌশল অধিকর্তা আর্তুরো বেহার গত সপ্তাহে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, পণ্য নির্মাণের সময় সংস্থাটি ধারাবাহিক ভাবে নিরাপত্তার চেয়ে মুনাফাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যবহারকারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি হলেও তাঁরা কত ঘন ঘন এবং কতক্ষণ মাধ্যমটি ব্যবহার করছেন, সেদিকেই নজর রাখা হয়েছে।
তাঁর বক্তব্য, ব্যবহারকারীরা মাধ্যমটি থেকে সরে গেলে সংস্থার আয়ও বন্ধ হয়ে যাবে। তাই তাঁদের যত বেশি সময় সম্ভব ধরে রাখাই ছিল মেটার ব্যবসায়িক লক্ষ্য।
মেটা আদালতে জানিয়েছিল, মামলায় সম্ভাব্য আর্থিক জরিমানার পরিমাণ ১ লক্ষ ৪০ হাজার কোটি ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। যদিও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবে এত বিপুল জরিমানার সম্ভাবনা প্রায় ছিল না। শেষ পর্যন্ত সমঝোতা অনুমোদিত হলে মামলা মাঝপথেই শেষ হবে।
মেটার ২০২৫ সালের আয় ছিল ২০ হাজার ১০০ কোটি ডলার। সেই তুলনায় ১৭০০ কোটি ডলারের প্রস্তাবিত সমঝোতার অঙ্ক সংস্থাটির মোট আয়ের একটি ছোট অংশ হলেও, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এটি নতুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড তৈরি করতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



