আধুনিক বিমান ঝড়-বৃষ্টি সামলাতে পারে, তবু কেন বাতিল বা ঘুরিয়ে দেওয়া হয় উড়ান?

যা জানা জরুরি
- দিল্লিতে সোমবার প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুতের জেরে বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
- বাতিল করতে হয়েছে ২৬টি উড়ান, অন্য বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে আরও ১৫টি বিমান।
- স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আধুনিক যাত্রীবাহী বিমান যদি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও উড়তে সক্ষম হয়, তা হলে ভারী বৃষ্টি হলেই এত উড়ান বাতিল বা বিলম্বিত হয়…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
দিল্লিতে সোমবার প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রবিদ্যুতের জেরে বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। বাতিল করতে হয়েছে ২৬টি উড়ান, অন্য বিমানবন্দরে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে আরও ১৫টি বিমান। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—আধুনিক যাত্রীবাহী বিমান যদি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার মধ্যেও উড়তে সক্ষম হয়, তা হলে ভারী বৃষ্টি হলেই এত উড়ান বাতিল বা বিলম্বিত হয় কেন?
আসলে আকাশে ওড়ার তুলনায় বিমান ওঠা এবং নামার সময় ঝুঁকি অনেক বেশি। বিমান একবার যথেষ্ট উচ্চতায় উঠে গেলে বৃষ্টি সাধারণত তার পক্ষে বড় সমস্যা নয়। বাণিজ্যিক বিমানের চালকেরা যন্ত্রনির্ভর উড্ডয়নে প্রশিক্ষিত। অর্থাৎ, বাইরের দৃশ্য স্পষ্ট না হলেও বিমানের দিক, উচ্চতা, গতি এবং অবস্থান নির্ধারণের জন্য তাঁরা পরিচালনকক্ষের যন্ত্রের উপর নির্ভর করতে পারেন।
সমস্যা তৈরি হয় বিমানবন্দরের রানওয়েতে। প্রবল বৃষ্টিতে দৃষ্টিসীমা কমে যায়। রানওয়ের আলো, চিহ্ন কিংবা সেখানে থাকা কোনও বাধা দূর থেকে দেখা কঠিন হয়ে পড়ে। বিমানের চাকার ধাক্কায় জমা জল ছিটকে উঠে দৃশ্য আরও ঝাপসা করে দিতে পারে। নীচু মেঘও বিমানচালকের সামনে রানওয়ে দৃশ্যমান হওয়ার সময় কমিয়ে দেয়।
তবে বিমানচালকের ব্যক্তিগত অনুমানের ভিত্তিতে উড়ান ওঠানো বা নামানো হয় না। প্রতিটি বিমানবন্দরে ‘রানওয়ে ভিজ়ুয়াল রেঞ্জ’ বা রানওয়ের দৃশ্যমান দূরত্ব নির্ধারণের ব্যবস্থা থাকে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, রানওয়ের উপর থাকা একজন বিমানচালক কত দূর পর্যন্ত আলো ও চিহ্ন দেখতে পাচ্ছেন। এই দূরত্ব নির্ধারিত নিরাপত্তার সীমার নীচে নেমে গেলে বিমান নামানোর অনুমতি দেওয়া হয় না।
ভেজা রানওয়েতে আরও একটি বড় বিপদ হল চাকার সঙ্গে মাটির ঘর্ষণ কমে যাওয়া। বিমান অবতরণের পরে তাকে থামানোর জন্য চাকা ও রানওয়ের মধ্যে পর্যাপ্ত ঘর্ষণ প্রয়োজন। কিন্তু জলের স্তর সেই ঘর্ষণ কমিয়ে দেয়। রানওয়েতে জল জমে গেলে বিমানের চাকা সরাসরি মাটি স্পর্শ না করে জলের পাতলা স্তরের উপর পিছলে যেতে পারে। এই অবস্থাকে জলপৃষ্ঠে পিছলে যাওয়া বা ‘হাইড্রোপ্ল্যানিং’ বলা হয়।
এর ফলে বিমানের গতি কমানো এবং তাকে সঠিক দিকে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। বিমান রানওয়ের বাইরে চলে যাওয়া, অন্য বিমান কিংবা বিমানবন্দরের কোনও গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষের আশঙ্কাও তৈরি হয়। তাই বৃষ্টির সময় প্রতিটি অবতরণের আগে রানওয়ের অবস্থা, জল জমার পরিমাণ এবং চাকার সম্ভাব্য ব্রেকিং ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন হলে বিমানগুলির মধ্যে ব্যবধান বাড়ানো হয়। স্বাভাবিক ভাবেই রানওয়ে খালি হতে বেশি সময় লাগে এবং পরপর উড়ানের সূচি বিঘ্নিত হয়।
বৃষ্টি সাধারণত একা আসে না। তার সঙ্গে বজ্রবিদ্যুৎ, প্রবল ঝোড়ো হাওয়া, শিলাবৃষ্টি, বায়ুর আকস্মিক গতিপরিবর্তন এবং তীব্র আলোড়ন থাকতে পারে। বজ্রগর্ভ মেঘের নীচে হাওয়া হঠাৎ প্রবল বেগে নেমে এসে মাটির কাছাকাছি ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বাতাসের দিক ও গতির বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। বিমান ওঠা বা নামার সময় এমন পরিবর্তন অত্যন্ত বিপজ্জনক, কারণ তখন বিমানের উচ্চতা কম থাকে এবং পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সময়ও পাওয়া যায় কম।
আড়াআড়ি হাওয়া আর একটি সমস্যা। সাধারণত স্থানীয় বাতাসের ঐতিহাসিক গতিপথ বিবেচনা করেই রানওয়ের অভিমুখ নির্ধারণ করা হয়, যাতে বিমান বাতাসের বিপরীতে ওঠা-নামা করতে পারে। কিন্তু প্রবল হাওয়া যদি রানওয়ের উপর আড়াআড়ি ভাবে বইতে থাকে, তা হলে বিমানকে সোজা পথে রাখা কঠিন হয়। বিমানচালককে বাতাসের বিপরীতে বিমান কিছুটা কাত করে চালাতে হয়। হাওয়ার গতি নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গেলে অবতরণের চেষ্টা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তার অর্থ অবশ্য এই নয় যে দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় বিমান অত্যন্ত অনিরাপদ। আধুনিক বাণিজ্যিক বিমান প্রবল বৃষ্টি, বজ্রপাত এবং বাতাসের ধাক্কা সহ্য করার মতো করেই তৈরি। সামনের কাচ থেকে জল সরানোর ব্যবস্থা থাকে। ইঞ্জিন বৃষ্টির মধ্যেও কাজ করার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। বিমানের কাঠামো এমন ভাবে নির্মিত যে বজ্রপাতের বিদ্যুৎ ধাতব বহির্ভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে অন্য দিক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে। ফলে সাধারণত যাত্রীকক্ষ নিরাপদ থাকে।
দৃশ্যমানতা খুব কমে গেলে বিমান নামানোর কাজে ব্যবহৃত হয় যন্ত্রনির্ভর অবতরণ ব্যবস্থা বা আইএলএস। মাটিতে বসানো বেতারযন্ত্র থেকে পাঠানো সঙ্কেত বিমানকে রানওয়ের কেন্দ্ররেখা ও সঠিক অবতরণপথ অনুসরণ করতে সাহায্য করে। দৃশ্যমানতার মাত্রা অনুযায়ী এই ব্যবস্থাকে ক্যাট-১, ক্যাট-২ এবং ক্যাট-৩ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। ক্যাট-৩ ব্যবস্থায় অত্যন্ত কম দৃশ্যমানতার মধ্যেও বিমান নামানো সম্ভব। তবে তার জন্য বিমান, বিমানবন্দর, বিমানচালক এবং মাটির কর্মীদের নির্দিষ্ট অনুমোদন ও প্রশিক্ষণ থাকা প্রয়োজন।
অতএব, ভারী বৃষ্টিতে উড়ান বাতিল বা অন্যত্র ঘুরিয়ে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে বিমানটি আবহাওয়ার সঙ্গে লড়তে অক্ষম। বরং নিরাপত্তার নির্ধারিত সীমার মধ্যে রানওয়ে ব্যবহার করা যাচ্ছে না বলেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বিমান চলাচলে সময়সূচির চেয়ে যাত্রীদের নিরাপত্তাই শেষ কথা। সেই কারণেই সামান্য ঝুঁকির সম্ভাবনা দেখা দিলেও বিমানকে অপেক্ষা করানো, অন্যত্র নামানো কিংবা উড়ান বাতিল করাই সবচেয়ে বিচক্ষণ পদক্ষেপ।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



