সাত দশক পরে খুলল ২২টি বাক্স, রাজঘাটের মাটি থেকে উঠে এল প্রাচীন বারাণসীর অজানা ইতিহাস

যা জানা জরুরি
- প্রায় ৭০ বছর ধরে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংগ্রহশালায় বন্ধ অবস্থায় পড়ে ছিল ২২টি বাক্স।
- বাক্সগুলির ভিতরে কী রয়েছে, তার প্রাথমিক নথি থাকলেও সেগুলি খোলা হয়নি।
- অবশেষে ২০ আগস্ট বাক্সগুলি খুলতেই সামনে এল ইতিহাসের এক বিপুল ভান্ডার।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
প্রায় ৭০ বছর ধরে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সংগ্রহশালায় বন্ধ অবস্থায় পড়ে ছিল ২২টি বাক্স। বাক্সগুলির ভিতরে কী রয়েছে, তার প্রাথমিক নথি থাকলেও সেগুলি খোলা হয়নি। অবশেষে ২০ আগস্ট বাক্সগুলি খুলতেই সামনে এল ইতিহাসের এক বিপুল ভান্ডার। পাওয়া গেল দশ হাজারেরও বেশি প্রত্নবস্তু—প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো বলে মনে করা হচ্ছে এমন চিত্রিত কালো মৃৎপাত্র থেকে শুরু করে প্রাচীন মুদ্রা, ভাস্কর্য, হাতিয়ার, সিলমোহর এবং তামা, হাতির দাঁত ও হাড়ের তৈরি নানা সামগ্রী।

রাজঘাট প্রত্নস্থল থেকে খনন করে প্রাপ্ত গুপ্ত আমলের একটি সংরক্ষণ-পাত্র (বামদিকে)।
বাক্সগুলির ভিতরে ছিল ভারতের বিভিন্ন প্রত্নস্থল ও ভাস্কর্যের কয়েক হাজার পুরনো আলোকচিত্রও। ১৯৫৭ সালে বারাণসীর রাজঘাটে খনন চালিয়ে এই সব সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছিল। নথিবদ্ধ করার পরে সেগুলি তুলে দেওয়া হয় বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ভারতীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংগ্রহশালায়। তার পর থেকেই বাক্সবন্দি হয়ে পড়ে ছিল এই বিপুল প্রত্নসম্পদ।
বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মহেশ প্রসাদ অহিরওয়ার জানিয়েছেন, উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর সংরক্ষণ, শ্রেণিবিন্যাস এবং বিস্তারিত নথিবদ্ধকরণের জন্য তিনটি বিশেষজ্ঞ গবেষকদল তৈরি করা হয়েছে। প্রথমে প্রতিটি বস্তুর বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করা হবে। তার পরে সেগুলির সময়কাল, নির্মাণপদ্ধতি, ব্যবহার এবং ঐতিহাসিক তাৎপর্য নির্ধারণের চেষ্টা চলবে।
বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে কয়েকটি সিল ও সিলমোহর। সেগুলির কয়েকটিতে ব্রাহ্মী লিপিতে লেখা রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের লিপিবিশারদের দিয়ে ওই লেখাগুলি পাঠোদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রয়োজনে অন্য বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাকেন্দ্রের বিশেষজ্ঞদেরও সাহায্য নেওয়া হবে। এই সিলমোহরগুলি থেকে প্রাচীন বারাণসীর প্রশাসনিক ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য চলাচল, রাজস্ব সংগ্রহ এবং অর্থনৈতিক জীবনের বিষয়ে নতুন তথ্য পাওয়া যেতে পারে।
বাক্সগুলিতে পাওয়া একটি হাতির দাঁতের পাশাও গবেষকদের আগ্রহ বাড়িয়েছে। পাশাপাশি রয়েছে হাড় ও হাতির দাঁতের তৈরি ব্যবহার্য বস্তু, তামার সামগ্রী, নানা ধরনের হাতিয়ার, পশুর মূর্তি, পোড়ামাটির প্রতিমা এবং অলংকৃত মৃৎপাত্রের টুকরো। একটি আচারমূলক পাত্রের ভাঙা অংশে ধর্মচক্র ও ত্রিরত্নের মতো পবিত্র বৌদ্ধ প্রতীক দেখা গিয়েছে। ফলে বিভিন্ন ধর্মীয় পরম্পরার মিলনস্থল হিসেবে প্রাচীন বারাণসীর চরিত্র বোঝার ক্ষেত্রেও এই সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

প্রত্নবস্তুর পাশাপাশি বাক্সগুলি থেকে প্রায় তিন হাজার কাচের আলোকচিত্র-ফলক এবং পাঁচ হাজারেরও বেশি পুরনো আলোকচিত্রের নেতিচিত্র পাওয়া গিয়েছে। এগুলিতে রাজঘাট ছাড়াও মাঝি, রত্নগিরি, অজন্তা এবং ইলোরার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলের ছবি রয়েছে। রয়েছে বিষ্ণু, শিব ও বুদ্ধের মূর্তির কিছু বিরল আলোকচিত্র।
এই ছবিগুলির মূল্য কেবল প্রাচীনত্বে নয়। গত সাত দশকে আবহাওয়া, ক্ষয়, পুনরুদ্ধারের কাজ এবং আধুনিক নির্মাণের ফলে বহু প্রত্নস্থলের চেহারা বদলে গিয়েছে। ফলে পুরনো আলোকচিত্রগুলি সেই সব স্থানের আগের অবস্থা জানার প্রামাণ্য উপাদান হতে পারে। সংরক্ষণবিদেরা ফলক ও নেতিচিত্রগুলি পরিষ্কার করে আধুনিক পদ্ধতিতে সংরক্ষণ এবং সংখ্যায়িত করার কাজ করবেন।
বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক অজিতকুমার চতুর্বেদী বলেছেন, বাক্সগুলির প্রতিটি বস্তুই গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত মূল্য বহন করে। এগুলি যখন খনন করে তোলা হয়েছিল, তখন ভারতে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার উন্নত বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি সহজলভ্য ছিল না। তা সত্ত্বেও তৎকালীন গবেষকেরা ভবিষ্যৎ গবেষণার সম্ভাবনা বুঝে সামগ্রীগুলি যত্ন করে রেখে দিয়েছিলেন। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে এখন সেগুলি নতুন করে পরীক্ষা করা গেলে প্রাচীন ভারতের কালানুক্রম এবং সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে নতুন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো সম্ভব হতে পারে।
গঙ্গা ও বরুণা নদীর সঙ্গমের কাছে বারাণসীর উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত রাজঘাট মধ্য গাঙ্গেয় উপত্যকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল। প্রাচীন কাশী রাজ্য বা কাশী মহাজনপদের রাজধানীর একটি অংশ ছিল এই এলাকা। খননে ‘বারাণসী’ নামাঙ্কিত সিল ও সিলমোহর পাওয়ার পর প্রাচীন নগরটির সঙ্গে রাজঘাটের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৩৯ সালে কাশী রেলস্টেশন সম্প্রসারণের সময় প্রথম ওই অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়। পরে সেগুলি পরীক্ষার জন্য ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণের কাছে পাঠানো হয়েছিল। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ও পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণ যৌথভাবে রাজঘাটে খনন চালায়। অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন অধ্যাপক এ কে নারায়ণ এবং প্রত্নতত্ত্ববিদ টি এন রায়।
খননে বাড়িঘরের ধ্বংসাবশেষ, পোড়ামাটির সামগ্রী, সিলমোহর এবং বহু ব্যবহার্য বস্তু পাওয়া যায়। গবেষকেরা রাজঘাটের ইতিহাসকে ছয়টি সাংস্কৃতিক পর্যায়ে ভাগ করেছেন। তার সূচনা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৮০০ অব্দে; ধারাবাহিকতা বিস্তৃত মধ্যযুগ পর্যন্ত। অধ্যাপক নারায়ণ চারটি খণ্ডে খননের বিবরণ লিপিবদ্ধ করলেও উদ্ধার হওয়া সামগ্রীর একটি বড় অংশের বিস্তারিত গবেষণা হয়নি।
গত মাসেই রাজঘাট থেকে উদ্ধার হওয়া প্রায় এক হাজার বছরের পুরনো একটি মানবকঙ্কালের বাক্স খোলা হয়েছিল। প্রাচীন বংশাণু ও জীব-প্রত্নতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের জন্য তা থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। এবার ২২টি বাক্সের প্রত্নসম্পদ সামনে আসায় প্রাচীন বারাণসীর জনজীবন, ধর্ম, বাণিজ্য ও নগরসভ্যতার বহু অজানা অধ্যায় উন্মোচিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হল।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



