দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জার্মানির মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলি দীর্ঘদিন ধরে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতা থেকে দূরে রাখার নীতি অনুসরণ করেছে। জার্মান ভাষায় এই অলিখিত ব্যবস্থার নাম ‘ব্রান্ডমাউয়ার’ অর্থাৎ আগুন ঠেকানোর প্রাচীর। কিন্তু সেই প্রাচীরই কি এখন উল্টো ফল দিচ্ছে? উগ্র দক্ষিণপন্থী অলটারনেটিভ ফর জার্মানি বা এএফডি-র ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে।

আগামী ৬ সেপ্টেম্বর পূর্ব জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচন জার্মানির যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। জনমত সমীক্ষায় এএফডি সেখানে ৪২ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাঁচ শতাংশের কম ভোট পাওয়া দলগুলি আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব করতে পারে না বলে জার্মানির আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থায় ৪০ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়েও কোনও দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে। ফলে এএফডি এককভাবে সরকার গঠনের সুযোগ পেতে পারে।

এমন ঘটনা ঘটলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে প্রথম কোনও ঘোষিত উগ্র দক্ষিণপন্থী দল জার্মানির একটি রাজ্যে এককভাবে ক্ষমতায় আসবে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, স্যাক্সনি-আনহাল্টে এএফডি-র শাখাকে জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রমাণিত দক্ষিণপন্থী চরমপন্থী’ সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

স্যাক্সনি-আনহাল্টের দু’সপ্তাহ পরে মেকলেনবুর্গ-ভোরপমার্ন এবং বার্লিনেও নির্বাচন। পূর্বাঞ্চলীয় মেকলেনবুর্গ-ভোরপমার্নে এএফডি স্বচ্ছন্দে এগিয়ে, এমনকি উদারনৈতিক রাজনীতির দুর্গ বলে পরিচিত বার্লিনেও দলটি দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। জাতীয় স্তরেও গত বছরের এপ্রিল থেকে অধিকাংশ সমীক্ষায় এএফডি প্রথম স্থানে। অতএব স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফল কোনও বিচ্ছিন্ন আঞ্চলিক ঘটনা হবে না; তা গোটা জার্মানির রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দিতে পারে।

এএফডি-র বিরুদ্ধে নাৎসি প্রতীক ও ভাষা ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। দলটির একাংশ ‘জৈবিক জার্মান’ এবং শুধু নাগরিকত্বের ভিত্তিতে ‘পাসপোর্টধারী জার্মান’-এর মধ্যে পার্থক্য করে। অভিবাসন, নাগরিকত্ব, বহুত্ববাদ এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে তাদের অবস্থান ইউরোপের অনেক দক্ষিণপন্থী দলের তুলনায়ও বেশি চরম।

রাজ্যে ক্ষমতায় এলে এএফডি শিক্ষাব্যবস্থা ও ইতিহাসচর্চায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। তাদের প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে স্কুলের ইতিহাস পাঠ্যক্রমে নাৎসি আমলের অপরাধের তুলনায় জার্মানির ‘কৃতিত্ব’-কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া, বর্ণবৈষম্যবিরোধী উদ্যোগের সরকারি অর্থ বন্ধ করা, সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে রামধনু পতাকা সরানো এবং সরকারি বেতার ও দূরদর্শনের দায়িত্ব ও কাঠামো পুনর্লিখন।

জার্মানির রাজ্যগুলির হাতে শিক্ষা, পুলিশ, সরকারি সম্প্রচার এবং আঞ্চলিক প্রশাসন পরিচালনার বিস্তৃত সাংবিধানিক ক্ষমতা রয়েছে। ফলে এএফডি সরকার সরকারি নিয়োগের মানদণ্ড বদলে নিজেদের মতাদর্শের অনুগত ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাতে পারে। প্রশাসনের মধ্যে এমন ভয়ের পরিবেশও তৈরি হতে পারে, যেখানে সরকারি কর্মীরা সংঘাত এড়াতে নীরব থাকাই নিরাপদ বলে মনে করবেন।

স্যাক্সনি-আনহাল্টে সরকার গঠন করলে এএফডি জার্মানির রাজ্যগুলির প্রতিনিধিত্বকারী উচ্চকক্ষ বুন্ডেসরাটেও আসন পাবে। একা কোনও আইন আটকানোর ক্ষমতা তার থাকবে না। তবে নতুন নীতি প্রস্তাব করা, বিভিন্ন বিষয়ে ঐকমত্যে বাধা দেওয়া এবং কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ জটিল করে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।

এর অভিঘাত ইউরোপীয় ইউনিয়নেও পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা এএফডি অস্বীকার করে। ইউক্রেনকে আরও সামরিক সাহায্য দেওয়ার বিরোধিতা এবং মস্কোর সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পক্ষেও দলটি। জার্মান রাজনীতিতে তাদের প্রভাব বাড়লে ইউক্রেন প্রশ্নে পাশ্চাত্যের ঐক্য দুর্বল হবে এবং রাশিয়া প্রত্যক্ষভাবে সুবিধা পাবে।

ইউরোপীয় ঐক্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি জার্মানি। তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা যত খণ্ডিত হবে, পরিবেশ, নিরাপত্তা, অভিবাসন ও অর্থনীতি নিয়ে ইউরোপীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ তত কঠিন হয়ে উঠবে। ফ্রান্স, ইতালি, স্পেন ও পোল্যান্ডের মতো দেশে আগামী দেড় বছরের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন রয়েছে। জার্মানিতে এএফডি-র জয় সেখানকার জাতীয়তাবাদী ও অভিবাসনবিরোধী শক্তিকেও উজ্জীবিত করবে।

‘ব্রান্ডমাউয়ার’ নীতিতে মূলধারার দলগুলি এএফডি-র সঙ্গে জোট, সমঝোতা বা সংসদীয় সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করেছে। উদ্দেশ্য ছিল চরমপন্থাকে স্বাভাবিক রাজনীতির স্বীকৃতি না দেওয়া। কিন্তু এএফডি এই বিচ্ছিন্নতাকেই নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করেছে। দলটি সমর্থকদের বোঝাতে পেরেছে যে পুরনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি তাদের ভোট এবং উদ্বেগকে অবজ্ঞা করছে। বিরোধীরা একজোট হয়ে এএফডি-কে ক্ষমতার বাইরে রাখলে দলটি নিজেকে নিপীড়িত বহিরাগত শক্তি হিসেবে তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

ফলে জার্মানির সামনে কঠিন দ্বন্দ্ব। প্রাচীর তুলে দিলে উগ্র দক্ষিণপন্থার স্বাভাবিকীকরণ ঘটতে পারে, আর প্রাচীর অটুট রাখলে বঞ্চনা ও প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার আবেগ আরও তীব্র হতে পারে। স্যাক্সনি-আনহাল্টের নির্বাচন তাই শুধু কে সরকার গড়বে তার পরীক্ষা নয়; গণতন্ত্র কীভাবে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিকে মোকাবিলা করবে, সেই গভীর সংকটেরও পরীক্ষা।