কাশগঙ্গা ছায়াপথের দ্রুততম নক্ষত্রের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। ‘এস৩০১’ নামের নক্ষত্রটি ছায়াপথের কেন্দ্রে থাকা অতিভারী কৃষ্ণগহ্বর স্যাজিটেরিয়াস এ*-কে ঘিরে সেকেন্ডে প্রায় ২৫ হাজার কিলোমিটার গতিতে ছুটছে। অর্থাৎ ঘণ্টায় তার গতি প্রায় ৯ কোটি কিলোমিটার। একটি সাধারণ যাত্রিবাহী বিমানের তুলনায় এটি প্রায় এক লক্ষ গুণ দ্রুত।

এস৩০১ শুধু দ্রুততম নক্ষত্রই নয়, স্যাজিটেরিয়াস এ*-র সবচেয়ে কাছে পৌঁছনো পরিচিত নক্ষত্রও। কক্ষপথের নিকটতম বিন্দুতে নক্ষত্রটি কৃষ্ণগহ্বরের এত কাছে চলে আসে, যা সূর্য থেকে শনির দূরত্বের প্রায় সমান। এই চরম নৈকট্যের কারণে কৃষ্ণগহ্বরের মৌলিক ধর্ম এবং তার চারপাশের অতিশয় প্রতিকূল পরিবেশ সম্পর্কে নতুন তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

জার্মানির গার্শিংয়ে অবস্থিত ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ফিজিক্সের গবেষক ফেলিক্স মাং জানিয়েছেন, এস৩০১ মাত্র ৮.৭ বছরে স্যাজিটেরিয়াস এ*-কে এক বার প্রদক্ষিণ করে। কক্ষপথের এক পর্যায়ে কৃষ্ণগহ্বরটির সঙ্গে তার দূরত্ব পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্বের মাত্র ১২ গুণে নেমে আসে। এত আঁটসাঁট কক্ষপথে কোনও নক্ষত্রকে ঘুরতে আগে দেখা যায়নি।

এস৩০১-এর কক্ষপথ অত্যন্ত দীর্ঘায়িত ও অসম। এই বৈশিষ্ট্যই আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বাভাস যাচাই করার সুযোগ এনে দিতে পারে। তত্ত্বটি বলছে, ঘূর্ণায়মান কৃষ্ণগহ্বর তার আশপাশের স্থান-কালকেও নিজের সঙ্গে টেনে নিয়ে যায়। এর ফলে কাছাকাছি প্রদক্ষিণকারী নক্ষত্রের কক্ষপথ ধীরে ধীরে বদলে যায়। এই ঘটনাকে ‘স্থান-কাল টেনে নেওয়া’ বলা যেতে পারে।

গবেষকদের মতে, এস৩০১-এর গতি এবং কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গে তার নৈকট্য এমন প্রভাব সরাসরি পরিমাপের বিরল সুযোগ দেবে। এর মাধ্যমে প্রথম বার আকাশগঙ্গার কেন্দ্রীয় কৃষ্ণগহ্বরটি কত দ্রুত ঘুরছে, তা নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ণয় করা যেতে পারে। গবেষণার সহলেখক স্টেফান গিলেসেন বলেছেন, এই পরিমাপ সম্ভব হলে তা আইনস্টাইনের তত্ত্বেরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠবে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা ২০১৭ সাল পর্যন্ত এস৩০১-এর কক্ষপথের গতিবিধি পুনর্গঠন করতে পেরেছেন। ২০৩১ সালে নক্ষত্রটি আবার কৃষ্ণগহ্বরের সবচেয়ে কাছের বিন্দু অতিক্রম করবে। সেই সময়ের পর্যবেক্ষণসহ আগামী দশ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে স্যাজিটেরিয়াস এ*-র ঘূর্ণন মাপার আশা করছেন তাঁরা।

চিলির পারানাল মানমন্দিরে ইউরোপীয় দক্ষিণাঞ্চলীয় মানমন্দিরের অতিবৃহৎ দূরবীক্ষণ যন্ত্রসমষ্টি ব্যবহার করে পর্যবেক্ষণগুলি করা হয়েছে। চারটি আট মিটার দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সংগৃহীত আলো একত্র করে অতি সূক্ষ্মভাবে নক্ষত্রটির অবস্থান ও গতি নির্ণয় করা হয়।

তবে এস৩০১ কৃষ্ণগহ্বরের খুব কাছে পৌঁছলেও তার ঘটনাদিগন্ত পেরিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। ফলে সেটি কৃষ্ণগহ্বরে তলিয়ে না গিয়ে নির্দিষ্ট কক্ষপথেই ঘুরতে থাকবে। বিজ্ঞানীদের মতে, এই নক্ষত্রের গতিবিধি স্যাজিটেরিয়াস এ*-র ঘূর্ণন এবং আকাশগঙ্গার বিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী হয়ে উঠতে পারে।