প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে আইনি পদক্ষেপ করতে বাধা নেই বলে কেরল সরকারকে মতামত দিয়েছেন রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অব প্রসিকিউশন টি. আসফ আলি। ঘটনাটি মালয়েশীয় প্রকৌশলী লি সি বিনের মৃত্যুকে ঘিরে। তিনি এমসি রোড পুনর্নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত কেরল স্টেট ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্টের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। প্রায় দুই দশক আগের এই ঘটনায় নতুন করে তদন্তের উদ্যোগের মধ্যেই ওই আইনি পরামর্শ পেয়েছে রাজ্য।

২০০৬ সালে ঘটনাটি যখন ঘটে, জ্ঞানেশ ছিলেন কেরলের পূর্তসচিব। কেরল কৌমুদীর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনি মতামতে বলা হয়েছে, অভিযোগের ঘটনাকাল তাঁর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাংবিধানিক পদে নিযুক্ত হওয়ার অনেক আগের। ফলে বর্তমান পদে থাকা এই পুরনো অভিযোগের তদন্তে আইনি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে না। তবে এই মতামতকে আদালতের রায় বা অপরাধ প্রমাণের সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না।

বিশ্বব্যাঙ্কের অর্থসাহায্যে সড়ক উন্নয়নের ওই প্রকল্পের কাজে যুক্ত ছিল ভারতীয় ও মালয়েশীয় সংস্থার যৌথ উদ্যোগ পাটি-বেল। জমি অধিগ্রহণে দেরি হওয়ায় কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছিল। নির্মাণের সময়সীমা, বকেয়া অর্থ এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ঠিকাদার সংস্থা ও সরকারি দপ্তরের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সেই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন লি।

২০০৬ সালের নভেম্বরে কুয়ালালামপুরে তাঁর আত্মহত্যার খবর সামনে আসে। প্রাক্তন অর্থমন্ত্রী ও সিপিএম নেতা টমাস আইজ্যাকের সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, লির নামে প্রচারিত সুইসাইড নোটে পূর্তদপ্তরের আধিকারিকদের বিরুদ্ধে হয়রানি, দুর্নীতি ও ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ছিল; জ্ঞানেশের নামও উঠে আসে। তবে আইজ্যাক নিজেই জানিয়েছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে সেই নোট পড়েননি। অভিযোগগুলি তখন আলোচিত হয়েছিল বলেই তাঁর বক্তব্য।

রাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ চেন্নিথালা নতুন ভিজিল্যান্স তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। কংগ্রেস নেতা মালয়িনকিঝু বেণুগোপালের অভিযোগের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত। অভিযোগ, ২০০৬ সালের প্রাথমিক তদন্ত বাইরের চাপে বাধাপ্রাপ্ত হয়েছিল। চেন্নিথালা জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী ভি ডি সতীশনের সঙ্গে আলোচনা করে বিস্তারিত অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পুরনো তদন্তের সমস্ত নথিও চেয়েছে স্বরাষ্ট্রদপ্তর।

ফলে নতুন অনুসন্ধানে দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে: সড়ক প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ এবং আগের তদন্ত থমকে যাওয়ার কারণ। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, পূর্তদপ্তরের পুরনো ফাইল ও ভিজিল্যান্সের প্রাথমিক অনুসন্ধানের নথি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা এবং তৎকালীন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের যোগসূত্র যাচাইয়ে এই নথিগুলিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

তবে পুরনো ঘটনার তথ্যপ্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী এম বিজয়কুমার জানিয়েছেন, ভিজিল্যান্স অনুসন্ধান শুরু করলেও কথিত সুইসাইড নোট কেরলে পাওয়া যায়নি বলে এফআইআর দায়ের হয়নি। প্রাক্তন পূর্তমন্ত্রী এম কে মুনিরও বলেছেন, নোটের কথা শোনা গেলেও সেটি কে দেখেছিলেন কিংবা তাতে ঠিক কী লেখা ছিল, তা তাঁদের জানা নেই। তিনিও পূর্ণাঙ্গ তদন্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। ফলে মূল নোট সংগ্রহও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।

এই বিষয়ে জ্ঞানেশ কুমার এবং নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্রের কাছে ইমেলে বক্তব্য চাওয়া হলেও উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তাঁর ব্যাখ্যা এখনও ওই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তদন্ত পুনরারম্ভের খবরের সঙ্গে এই সীমাবদ্ধতাটিও প্রাসঙ্গিক।

ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন নিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদের আন্দোলনের সময়েই পুরনো অভিযোগটি সামনে এসেছে। তবে চেন্নিথালা তদন্তের সঙ্গে কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মসূচির সম্পর্ক অস্বীকার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে অভিযোগ খতিয়ে দেখার ব্যবস্থা করা তাঁর কর্তব্য; ভিজিল্যান্সের কাজে সরকার হস্তক্ষেপ করবে না।

এই মুহূর্তে নিশ্চিত বিষয় হল, রাজ্য আইনি মতামত পেয়েছে এবং নতুন অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছে। আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা দুর্নীতির অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি এগুলি নয়। পুরনো নথি, কথিত নোটের প্রামাণিকতা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের পরেই অভিযোগের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।