খবর

৩° গরমে প্রবীণদের মহাবিপদ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে ভারতের ৮০ শতাংশেরও বেশি প্রবীণ মানুষ বছরে অন্তত ১৮০ ঘণ্টা এমন তাপ ও…
  • দিল্লি-সহ বৃহত্তর সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
  • ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই আশঙ্কাজনক ছবি।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বিশ্বের গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে ভারতের ৮০ শতাংশেরও বেশি প্রবীণ মানুষ বছরে অন্তত ১৮০ ঘণ্টা এমন তাপ ও আর্দ্রতার মুখে পড়তে পারেন, যা তাঁদের শরীরের জন্য বিপজ্জনক। দিল্লি-সহ বৃহত্তর সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমিতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই আশঙ্কাজনক ছবি।

গবেষকদের হিসাব, ৩ ডিগ্রি উষ্ণায়নে ভারতের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি এবং ষাটোর্ধ্ব মানুষের ৮০ শতাংশের বেশি বছরে অন্তত ১৮০ ঘণ্টা এমন গরমের মধ্যে থাকতে পারেন, যেখানে শরীর স্বাভাবিক ভাবে নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।

১৮০ ঘণ্টা মানে প্রায় এক মাস ধরে প্রতিদিন গড়ে ছয় ঘণ্টা করে এমন তাপ ও আর্দ্রতার মধ্যে থাকা। আর দিল্লি ও বৃহত্তর সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমিতে এই ঝুঁকি আরও দ্রুত বাড়তে পারে। উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রিতে পৌঁছলেই ওই অঞ্চলের প্রবীণদের বছরে প্রায় ১,০০০ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় বিপজ্জনক গরমের মধ্যে কাটাতে হতে পারে। ৩ ডিগ্রিতে তা বেড়ে ২,০০০ ঘণ্টা ছাড়িয়ে যেতে পারে—অর্থাৎ প্রায় তিন মাসের সমান সময়।

গবেষণার প্রধান লেখক অধ্যাপক চিনচিন কং জানিয়েছেন, এই চরম তাপ সারা বছর সমান ভাবে ছড়িয়ে থাকবে না। মূলত মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই তা বেশি দেখা যাবে। উষ্ণায়ন ৩ ডিগ্রি ছাড়িয়ে গেলে টানা কয়েক মাস দিন ও রাত উভয় সময়েই প্রবীণদের জন্য পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠতে পারে।

আর বিপদটা শুধু দিনের গরমে নয়। রাতে তাপমাত্রা যথেষ্ট না কমলে শরীর দিনের তাপজনিত চাপ থেকে সেরে ওঠার সুযোগ পায় না। ফলে তাপপ্রবাহের দীর্ঘস্থায়িত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদ্‌যন্ত্র, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং অন্যান্য শারীরিক ব্যবস্থার উপর চাপও বাড়তে পারে।

কেন প্রবীণদের ঝুঁকি বেশি?

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়। প্রবীণদের ঘাম কম হতে পারে, রক্তনালির তাপমাত্রাজনিত প্রতিক্রিয়াও ধীর হয়। অতিরিক্ত গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে হৃদ্‌যন্ত্রকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে একই তাপমাত্রা একজন তরুণের তুলনায় একজন প্রবীণের জন্য অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ, গান্ধীনগরের অধ্যাপক এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলা বিশেষজ্ঞ মহাবীর গোলেচ্ছার মতে, সবার জন্য বিপজ্জনক গরমের কোনও একক তাপমাত্রা নির্ধারণ করা যায় না। বয়স, শারীরিক সক্ষমতা এবং পরিবেশ—সবকিছুর উপর নির্ভর করে তাপের প্রভাব বদলে যায়।

এই গবেষণার বিশেষত্বও সেখানেই। আগে চরম গরমের ঝুঁকি নির্ধারণে মূলত সুস্থ তরুণদের শরীরের প্রতিক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হত। নতুন গবেষণায় বিভিন্ন বয়সের মানুষের তাপ সহনশীলতার পার্থক্যকে হিসাবের মধ্যে আনা হয়েছে।

গবেষকেরা ১৫-৩৯, ৪০-৫৯ এবং ৬০ বা তার বেশি বয়সি তিনটি গোষ্ঠীর পরীক্ষাগারে করা তাপ-সহনশীলতা পরীক্ষার তথ্য ব্যবহার করেছেন। এরপর উচ্চ বিভেদনক্ষম তাপচাপের মডেল ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কোন বয়সের মানুষের জন্য তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কোন সংমিশ্রণ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, তা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

১.৫ ডিগ্রিতেই বিপদ শুরু

গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্ব উষ্ণায়ন ১.৫ ডিগ্রিতে পৌঁছলেই বিশ্বের প্রায় ২২ শতাংশ প্রবীণ, অর্থাৎ প্রায় ২৯ কোটি মানুষ, বছরে অন্তত এক মাস বিপজ্জনক গরমের মুখে পড়তে পারেন।

তুলনায় তরুণদের ক্ষেত্রে একই মাত্রার ব্যাপক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে ৪ ডিগ্রি উষ্ণায়নে। তখন বিশ্বের প্রায় ১৭ শতাংশ তরুণ—আনুমানিক ৪৯ কোটি মানুষ—বছরে অন্তত ১৮০ ঘণ্টা বিপজ্জনক গরমের মধ্যে থাকতে পারেন।

গবেষকদের হিসাব আরও উদ্বেগজনক: পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা প্রতি অতিরিক্ত ১ ডিগ্রি বাড়লে প্রায় ১০০ কোটি নতুন মানুষ এমন তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার সংস্পর্শে আসতে পারেন, যেখানে শরীরের পক্ষে নিজের তাপের ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

তবে ‘তাপ সহনশীলতার সীমা’ পেরোনো মানেই সঙ্গে সঙ্গে মৃত্যু নয়। অধ্যাপক কংয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এমন পরিস্থিতিতে খুব হালকা কাজ করলেও শরীর নিজের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা স্থিতিশীল রাখতে ব্যর্থ হতে শুরু করে। দীর্ঘক্ষণ এই অবস্থায় থাকলে জলশূন্যতা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, তাপজনিত অবসাদ, হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। পর্যাপ্ত চিকিৎসা বা শীতল পরিবেশ না পেলে তা প্রাণঘাতীও হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ায় ঝুঁকি আরও তীব্র

দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য উপসাগর, পশ্চিম আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং পূর্ব চিনকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলির মধ্যে রাখা হয়েছে। এই সব জায়গায় জনঘনত্ব বেশি, অথচ তাপপ্রবাহ মোকাবিলার অর্থনৈতিক ও পরিকাঠামোগত ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।

ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং নাইজার নিয়ে বিশেষ উদ্বেগ রয়েছে। কারণ, বিপজ্জনক গরমের মুখে পড়তে চলা মানুষের সংখ্যা এখানে বিপুল এবং দারিদ্র্যও একটি বড় কারণ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব দরিদ্র প্রবীণদের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

ভারতের ক্ষেত্রে এর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যেই আটকে থাকবে না। সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমিতে চরম তাপের সময় বর্ষা ও খরিফ চাষের মরসুমের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। দিনে গরমের পাশাপাশি রাতে তাপমাত্রা বেশি থাকলে কৃষি, নির্মাণ এবং অন্যান্য বাইরের কাজ শুধু ভোর বা সন্ধ্যায় সরিয়ে নিয়ে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন হবে।

এর ফলে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও আয় যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তেমনই কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্যনিরাপত্তার উপরও চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রবীণ কৃষক এবং অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি হতে পারে।

সতর্কতা নয়, বদল চাই

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তাপপ্রবাহের সতর্কবার্তা জারি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রবীণ, একা বসবাসকারী মানুষ, দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতায় ভোগা ব্যক্তি এবং শীতলীকরণের সুযোগ থেকে বঞ্চিত মানুষদের আগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

তাপ-স্বাস্থ্য সতর্কীকরণ ব্যবস্থাতেও শুধু দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা দেখলে চলবে না। আর্দ্রতা, রাতের তাপমাত্রা, গরমের স্থায়িত্ব, স্থানীয় জনসংখ্যার বৈশিষ্ট্য এবং বয়সজনিত ঝুঁকিকেও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে। প্রবীণদের জন্য আলাদা সতর্কবার্তা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র, পর্যাপ্ত পানীয় জল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা জরুরি।

তবে অভিযোজনের ব্যবস্থা করেই দীর্ঘমেয়াদে এই বিপদ ঠেকানো যাবে না। গবেষকদের মতে, দীর্ঘস্থায়ী ও দিন-রাতব্যাপী তাপপ্রবাহের ঝুঁকি কমাতে গ্রিনহাউস গ্যাসের নিঃসরণ দ্রুত কমানো অপরিহার্য।

নইলে ভবিষ্যতের গ্রীষ্ম শুধু ‘গরমের মরসুম’ থাকবে না—ভারতের কোটি কোটি প্রবীণের কাছে তা হয়ে উঠতে পারে টিকে থাকার লড়াই।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles