মধ্য কলকাতার হোটেলে গভীর রাতের আগুন, শিশুসহ মৃত ৯

যা জানা জরুরি
- তারাপীঠের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই এ বার মধ্য কলকাতায় আগুনে মৃত্যু হল এক শিশুসহ অন্তত ন’জনের।
- বুধবার ভোররাতে নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিট—পুরনো ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা হোটেলে আগুন লাগে।
- মৃতদের মধ্যে ছ’জন পুরুষ, দু’জন মহিলা এবং একটি শিশু রয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানিয়েছে পুলিশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
তারাপীঠের হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের রেশ কাটতে না কাটতেই এ বার মধ্য কলকাতায় আগুনে মৃত্যু হল এক শিশুসহ অন্তত ন’জনের। বুধবার ভোররাতে নিউ মার্কেট সংলগ্ন মির্জা গালিব স্ট্রিট—পুরনো ফ্রি স্কুল স্ট্রিটের একটি পাঁচতলা হোটেলে আগুন লাগে। মৃতদের মধ্যে ছ’জন পুরুষ, দু’জন মহিলা এবং একটি শিশু রয়েছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানিয়েছে পুলিশ। আহত হয়েছেন অন্তত ছ’জন। তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের অবস্থা গুরুতর।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গিয়েছে, মৃতেরা বাংলাদেশের নাগরিক। চিকিৎসার জন্য তাঁরা কলকাতায় এসে ওই হোটেলে উঠেছিলেন। তবে মৃতদের নাম-পরিচয় সরকারি ভাবে প্রকাশ করা হয়নি। তাঁদের আত্মীয়স্বজন এবং বাংলাদেশের উপদূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চলছে। মৃতদেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পরে আইনি প্রক্রিয়া মেনে সেগুলি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
পুলিশের কাছে রাত পৌনে দু’টো থেকে দু’টোর মধ্যে আগুনের খবর আসে। তখন হোটেলের অধিকাংশ আবাসিক ঘুমিয়ে ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে তৃতীয় তলার একটি ঘর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখা যায়। অল্প সময়ের মধ্যেই আগুন সংলগ্ন কয়েকটি ঘরে ছড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে ঘন কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় সিঁড়ি ও করিডর। ফলে উপরতলায় আটকে পড়া আবাসিকদের পক্ষে নীচে নেমে আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে যায়।
খবর পেয়েই দমকলের একাধিক ইঞ্জিন, কলকাতা পুলিশ এবং বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে চার থেকে পাঁচটি দমকলের ইঞ্জিন ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। দমকলকর্মীরা জানালা ভেঙে এবং মই ব্যবহার করে আটকে পড়া আবাসিকদের বার করে আনেন। অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা ন’জনকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। আহতদের এসএসকেএম-সহ কাছাকাছি কয়েকটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
ঘন ধোঁয়ার কারণে উদ্ধারকাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছিল। দমকলকর্মীরা শ্বাসযন্ত্র পরে হোটেলের ভিতরে ঢোকেন। সরু সিঁড়ি দিয়ে উপরের তলায় পৌঁছতেও তাঁদের সমস্যা হয়। শেষ পর্যন্ত আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পরে দীর্ঘ সময় ধরে ‘কুলিং’ বা ভিতরের উত্তপ্ত অংশ ঠান্ডা করার কাজ চলে। হোটেলের কোনও ঘরে আরও কেউ আটকে রয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি তলায় তল্লাশি চালানো হয়।
আগুনের কারণ এখনও নিশ্চিত নয়। কয়েকটি প্রাথমিক প্রতিবেদনে তৃতীয় তলার একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে বিস্ফোরণ থেকে আগুন ছড়ানোর আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। অন্য একটি সূত্রের দাবি, বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিটও সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। তবে ফরেন্সিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছতে নারাজ পুলিশ ও দমকল। ঘটনাস্থল থেকে পোড়া বৈদ্যুতিক তার, যন্ত্রাংশ এবং অন্যান্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে বিস্ফোরণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
দুর্ঘটনার পরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে হোটেলটির অগ্নিসুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে তদন্তকারীদের একাংশের দাবি, ভবনটিতে যথাযথ জরুরি নির্গমনপথ ছিল না। যাতায়াতের জন্য একটি সরু সিঁড়ির উপরেই মূলত নির্ভর করতে হত। আগুন শনাক্তকারী সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, স্বয়ংক্রিয় জলবর্ষণ ব্যবস্থা এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র কার্যকর অবস্থায় ছিল কি না, তা পরীক্ষা করা হচ্ছে। একই ভবনে একাধিক ছোট আবাসন বা হোটেল চলছিল কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে। জরুরি নির্গমনপথের অভাব এবং সরু সিঁড়ির কথা উল্লেখ করেছে।
হোটেলটির অগ্নিসুরক্ষা ছাড়পত্র, পুরসভার অনুমোদন, বাণিজ্যিক লাইসেন্স এবং সাম্প্রতিক পরিদর্শনের নথি চাওয়া হয়েছে। কোনও নিয়মভঙ্গ বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি প্রমাণিত হলে হোটেল পরিচালকদের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে পুলিশ সূত্রের খবর।
মাত্র দু’দিন আগে বীরভূমের তারাপীঠে একটি হোটেলে আগুন লেগে একাধিক পুণ্যার্থীর মৃত্যু হয়েছিল। তার পরেও কলকাতার প্রাণকেন্দ্রে আর একটি হোটেল কী ভাবে অগ্নিসুরক্ষার এমন দুর্বল ব্যবস্থা নিয়ে চলছিল, সেই প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। ২০২৫ সালের এপ্রিলে বড়বাজারের ঋতুরাজ হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে ১৪ জনের মৃত্যুর পর শহরের হোটেলগুলিতে বিশেষ অগ্নিসুরক্ষা পরীক্ষার ঘোষণা হয়েছিল। বুধবারের ঘটনা দেখিয়ে দিল, ঘোষণা এবং বাস্তব নিরাপত্তার মধ্যে বিপজ্জনক ব্যবধান এখনও রয়ে গিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



