খবর

বিনিয়োগের পথে কাঁটা বালোচ

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকার ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল ওয়াসিম মুনির একটি ব্রিফকেস খোলেন।
  • পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।
  • এই ফিল্মি কায়দায় পাকিস্তান আসলে ট্রাম্প প্রশাসনকে বুঝিয়ে দেয়, খনিজ সম্পদে মার্কিন বিনিয়োগের দরজা খুলে দিতে প্রস্তুত ইসলামাবাদ।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: গত সেপ্টেম্বরে আমেরিকার ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের সময় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল ওয়াসিম মুনির একটি ব্রিফকেস খোলেন। পাশে দাঁড়িয়েছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। ব্রিফকেসের ভেতরে ছিল ঝকঝকে সব খনিজ আকরিক। এই ফিল্মি কায়দায় পাকিস্তান আসলে ট্রাম্প প্রশাসনকে বুঝিয়ে দেয়, খনিজ সম্পদে মার্কিন বিনিয়োগের দরজা খুলে দিতে প্রস্তুত ইসলামাবাদ।

কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির ওপর এখন অন্ধকারের ছায়া। পাকিস্তানের খনিজ সম্পদের বড় ভাণ্ডারই হল বালোচিস্তান। আয়তনে দেশের বৃহত্তম কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে চরমভাবে পিছিয়ে থাকা এই অঞ্চলে গত শনিবারের সরকার ও লিবারেশন আর্মির সংঘর্ষ কার্যত পাকিস্তানের ‘অর্থনৈতিক স্বপ্নভঙ্গ’। পাশাপাশি এই ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও নিরাপত্তার বিষয়ে সন্দিহান।

শনিবার বালোচিস্তানে ১২টিরও বেশি জায়গায় বিএলএ-র হামলায় ৩১ জন সাধারণ নাগরিক এবং ১৭ জন পাকিস্তানী সেনাকর্মী নিহত হন। পালটা অভিযানে সেনাবাহিনী খতম করে ১৪৫ জন হামলাকারীকে। এই হামলা এমন এক সময়ে হল যখন পাকিস্তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন, উভয় দেশকেই বালোচিস্তানের খনিজ উত্তোলনে পাশে পেতে মরিয়া।

হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি কোনো প্রমাণ ছাড়াই প্রতিবেশী দেশ ভারতকে এর জন্য দায়ী করেছেন। যদিও ভারত এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে একে পাকিস্তানের ‘অভ্যন্তরীণ ব্যর্থতা’ বলে অভিহিত করেছে। বিদ্রোহী গোষ্ঠী বালোচ লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) এই হামলার দায় স্বীকার করে একে তাদের ‘অপারেশন হেরোফ ২.০’ (কৃষ্ণঝড়)-এর অংশ বলে দাবি করেছে।

২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, পাকিস্তানের ২৪ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি ৫০ লক্ষ বালোচিস্তানের বাসিন্দা। এই প্রদেশে তেল, কয়লা, সোনা, তামা ও গ্যাসের বিশাল ভাণ্ডার রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকার বিপুল সম্পদ শোষণ করলেও এর সুফল বালোচবাসীরা পায় না। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর থেকেই এই অঞ্চলে অন্তত পাঁচবার বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা দিয়েছে। ২০০০ সালের পর থেকে যা পূর্ণ স্বাধীনতার দাবিতে রূপ নিয়েছে।

বালোচিস্তান শুধু খনিজ নয়, চীনের ৬০ বিলিয়ন ডলারের চিনা পাকিস্তান ইকোনমিক কারিডোর (CPEC) প্রকল্পেরও প্রাণকেন্দ্র। গোয়াদর সমুদ্রবন্দর এই প্রদেশেই অবস্থিত। অন্যদিকে, গত বছর মার্কিন খনি সংস্থা ইউএসএসএম পাকিস্তানের খনিখাতে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান এই অস্থিরতাকে রাজনৈতিক সমস্যার বদলে কেবল একটি ‘নিরাপত্তা সমস্যা’ হিসেবে দেখাতে চায়। বার্লিনবাসী গবেষক সাহের বালোচ আল-জাজিরাকে বলেন, “বালোচিস্তানের এই অস্থিতিশীলতা আসলে দেশের কাঠামোগত ত্রুটির ফল। পাকিস্তান সরকার অন্যায়ভাবে সেখানে রাজনৈতিক বহিষ্করণ করেছে এবং সামরিক শাসন তৈরি করে রেখেছে। আগে বালোচবাসীর স্বাতন্ত্র্যের বিষয়ে না ভাবলে, সেখানে সরকারের পক্ষে বিদেশি বিনিয়োগ আনা কঠিন হবে।”

২০২৩ সালের গ্রীষ্মে পাকিস্তান দেউলিয়া হওয়া থেকে অল্পের জন্য বেঁচে যায়। বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল মনেটারি ফান্ড বা আইএমএফ-এর থেকে ৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণে দেশটি ধুঁকছে। স্টেট ব্যাংক অফ পাকিস্তানের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৬ অর্থবর্ষের প্রথম অর্ধে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৮০৮ মিলিয়ন ডলারে।

ইসলামাবাদের এক বিশ্লেষক, ইমতিয়াজ গুল বলেন, “কোনো সুস্থমস্তিষ্কের বিনিয়োগকারী এমন অস্থির পরিস্থিতিতে টাকা ঢালবে না।” তবে সিঙ্গাপুরের গবেষক আব্দুল বাসিতের মতে, চীন ও আমেরিকা উভয়েই এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন এবং কৌশলগত কারণে তারা সম্ভবত এখনই বিনিয়োগ তুলে নেবে না।

বালোচিস্তানের এই সংকট কেবল এক সাময়িক সমস্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার বহিঃপ্রকাশ। আন্তর্জাতিক মহলের সহানুভূতি পাওয়ার জন্য ইসলামাবাদ ভারতকে দায়ী করলেও, স্থানীয় মানুষের ক্ষোভ প্রশমন না করলে খনিজ সমৃদ্ধ ওই প্রদেশে বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা পাকিস্তানের জন্য আরো কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

পার্বণ

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles