ই২০-তে ধাক্কা, ফিরছে ই১০?

যা জানা জরুরি
- ই২০ পেট্রল নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের মধ্যেই পুরনো গাড়ির মালিকদের জন্য ফের ই১০ চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে কেন্দ্র এবং জ্বালানি শিল্প।
- ই২০-র পাশাপাশি ই১০ বিক্রির ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে।
- ই২০ পেট্রলে থাকে ২০ শতাংশ ইথানল এবং ৮০ শতাংশ পেট্রল।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ই২০ পেট্রল নিয়ে দেশজুড়ে বিতর্কের মধ্যেই পুরনো গাড়ির মালিকদের জন্য ফের ই১০ চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে কেন্দ্র এবং জ্বালানি শিল্প। ই২০-র পাশাপাশি ই১০ বিক্রির ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। তবে এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ই২০ পেট্রলে থাকে ২০ শতাংশ ইথানল এবং ৮০ শতাংশ পেট্রল। ই১০-এ ইথানলের পরিমাণ ১০ শতাংশ। নির্ধারিত সময়ের পাঁচ বছর আগেই গত বছর পেট্রলে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানোর লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে ভারত। চলতি বছরের ১ এপ্রিল থেকে দেশের পেট্রল পাম্পগুলিতে কার্যত সাধারণ জ্বালানি হিসেবে ই২০-ই মিলছে।
বিতর্কের কেন্দ্রে মূলত ২০২৩ সালের এপ্রিলের আগে তৈরি গাড়িগুলি। ভারত স্টেজ-৬-এর দ্বিতীয় পর্যায়ের দূষণবিধি অনুযায়ী, ওই সময়ের পর তৈরি ও বিক্রি হওয়া পেট্রলচালিত গাড়িগুলিকে ই২০ ব্যবহারের উপযোগী করা বাধ্যতামূলক। ফলে নতুন গাড়িগুলি ই২০-উপযোগী হলেও তার আগে তৈরি অধিকাংশ গাড়ি, বিশেষ করে দু’চাকার যান, ই১০ ব্যবহারের কথা মাথায় রেখেই তৈরি হয়েছিল।
পুরনো গাড়ির মালিকদের একাংশের অভিযোগ, ই২০ ব্যবহারের পর মাইলেজ উল্লেখযোগ্য ভাবে কমছে। দীর্ঘদিন ব্যবহারে রবারের সিল, পাইপ, গ্যাসকেট এবং জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে বলে তাঁদের দাবি। কার্বুরেটর-নির্ভর পুরনো মোটরসাইকেল ও স্কুটারের ক্ষেত্রে এই উদ্বেগ আরও বেশি।
যদিও কেন্দ্র বরাবরই ই২০-র কারণে ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা খারিজ করেছে। সরকারের দাবি, পুরনো গাড়িতে মাইলেজ কমলেও তা সর্বাধিক ৩ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। কেন্দ্রের যুক্তি, ই২০ তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এবং এর পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সুবিধা এই সামান্য ক্ষতির তুলনায় বেশি।
কিন্তু সমস্যা তৈরি হয়েছে অন্য জায়গায়—পছন্দের সুযোগ নেই কেন? বিশুদ্ধ পেট্রল, ই১০ এবং ই২০—এই তিন ধরনের জ্বালানির মধ্যে গাড়ির মালিকদের নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত বলে দাবি উঠেছে। বিশেষত যে গাড়ি ই১০ ব্যবহারের জন্য তৈরি, তার মালিককে কেন ই২০ কিনতেই হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধীরা।
এই বিতর্কের মধ্যেই মুখ্য অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ভি অনন্ত নাগেশ্বরনের বক্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অর্থনৈতিক বিষয়ক দফতরের পরামর্শদাতা আকাশ পূজারির সঙ্গে লেখা এক নিবন্ধে তিনি পুরনো গাড়ির জন্য ই২০-র পাশাপাশি ই১০ ফেরানোর পক্ষে সওয়াল করেছেন। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় সাড়ে সাত থেকে আট কোটি পুরনো দু’চাকার যান রয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক গাড়িকে ই২০-উপযোগী করতে সময় লাগবে। তার মধ্যে ই১০ বাজারে থাকলে গাড়ির মালিকদের উদ্বেগ কমবে এবং পুরনো যানগুলিও তুলনামূলক নিরাপদে চালানো সম্ভব হবে।
কোনও উচ্চপদস্থ সরকারি আধিকারিকের তরফে প্রকাশ্যে এমন প্রস্তাব এই প্রথম। যদিও নাগেশ্বরন স্পষ্ট করেছেন, এটি তাঁর ব্যক্তিগত মতামত, সরকারের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন
তবে ই১০ ফেরানো মুখের কথা নয়। সবচেয়ে বড় বাধা জ্বালানি সরবরাহের পরিকাঠামো। দেশে এক লক্ষেরও বেশি পেট্রল পাম্প রয়েছে, যার অধিকাংশে মাত্র একটি বা দু’টি ভূগর্ভস্থ ট্যাঙ্ক। একই পাম্পে ই১০ এবং ই২০—দুই ধরনের জ্বালানি বিপুল পরিমাণে বিক্রি করতে হলে পৃথক ট্যাঙ্ক ও বিতরণ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
শুধু পেট্রল পাম্পেই নয়, শোধনাগার এবং তেল সংস্থার টার্মিনালেও আলাদা মিশ্রণ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। সড়কপথে পরিবহণের জন্য লাগবে পৃথক ট্যাঙ্কার। ই১০ এবং ই২০ যাতে পরস্পরের সঙ্গে মিশে না যায়, তার জন্য শোধনাগার থেকে পাম্প পর্যন্ত কার্যত দুটি সমান্তরাল সরবরাহ-শৃঙ্খল গড়ে তুলতে হবে।
জ্বালানি শিল্পের মতে, সীমিত চাহিদার প্রিমিয়াম পেট্রলের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা সম্ভব হলেও ই১০-এর মতো বিপুল চাহিদার জ্বালানি ফেরাতে গেলে পরিকাঠামোয় বড় বিনিয়োগ করতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লক্ষ টন পেট্রল ব্যবহৃত হয়েছে। এত বড় বাজারে দ্বৈত সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করা তাই যথেষ্ট জটিল।
গত জুলাইয়েই পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক জানিয়েছিল, একাধিক সাধারণ মানের পেট্রল বিক্রি করলে পরিবহণ ও মজুতের খরচ বাড়বে, মজুত পরিচালনা জটিল হবে এবং সামগ্রিক দক্ষতা কমতে পারে। ই২০-র পরিকাঠামো তৈরিতেও ইতিমধ্যে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে বলে কেন্দ্রের যুক্তি। ফলে সেই অবস্থান থেকে সরকার এখনও সরে আসেনি।
তবু ই১০ নিয়ে আলোচনা শুরু হওয়াই যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এটি ই২০ নীতি থেকে পিছিয়ে আসা নয়, বরং পুরনো গাড়ির জন্য একটি ‘ব্যাকআপ’ তৈরির সম্ভাবনা যাচাই।
শেষ পর্যন্ত ই১০ সত্যিই ফিরবে কি না, তা নির্ভর করবে দুটি বিষয়ের উপর—গাড়ির মালিকের পছন্দের অধিকার এবং সেই পছন্দ দেওয়ার খরচ। ই২০-র পথে এগিয়েও পুরনো গাড়ির জন্য কতটা দরজা খোলা রাখে কেন্দ্র, এখন নজর সেদিকেই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



