মহিষের মাংসে ৫০০ কোটির বাজিমাত!

যা জানা জরুরি
- ভারতের কৃষিপণ্য রফতানির তালিকায় নতুন নজির গড়েছে মহিষের মাংস।
- ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এর রফতানি মূল্য ২৫.৬ শতাংশ বেড়ে প্রথম বার ৫০০ কোটি ডলারের সীমা পেরিয়েছে।
- মোট রফতানির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫১০ কোটি ডলারে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ভারতের কৃষিপণ্য রফতানির তালিকায় নতুন নজির গড়েছে মহিষের মাংস। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে এর রফতানি মূল্য ২৫.৬ শতাংশ বেড়ে প্রথম বার ৫০০ কোটি ডলারের সীমা পেরিয়েছে। মোট রফতানির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫১০ কোটি ডলারে। আর চলতি অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এই দৌড় থামার কোনও লক্ষণ নেই। বাণিজ্য মন্ত্রকের অনুমান, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে রফতানি ৬০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বৃদ্ধির ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় চলতি অর্থবর্ষের প্রথম ত্রৈমাসিকের হিসাব দেখলে। ২০২৫ সালের এপ্রিল-জুনে ভারত ৮৯ কোটি ৬৮ লক্ষ ডলারের মহিষের মাংস রফতানি করেছিল। ২০২৬ সালের একই সময়ে সেই অঙ্ক ৬৬.৬ শতাংশ বেড়ে প্রায় ১৫০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ শুধু রফতানির পরিমাণই বাড়েনি, প্রতি টন পণ্য থেকেও আগের তুলনায় বেশি আয় করছে ভারত।
এক দশক আগেও অবশ্য ছবিটা এতটা উজ্জ্বল ছিল না। ২০১৪-১৫ সালে ১৪ লক্ষ ৮০ হাজার টন মহিষের মাংস রফতানি করে ভারত আয় করেছিল ৪৮০ কোটি ডলার। প্রতি টনে গড় আয় ছিল প্রায় ৩,২৪০ ডলার। এরপর বেশ কয়েক বছর রফতানির পরিমাণ ও মূল্য—দুই-ই কমে যায়। প্রতি টনে আয় নেমে আসে ২,৭০০-৩,০০০ ডলারের মধ্যে।
ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ দেখা যায় ২০২৪-২৫ সালে। সে বছর রফতানি থেকে আয় হয় ৪১০ কোটি ডলার এবং প্রতি টনের গড় দাম দাঁড়ায় ৩,২৩৬ ডলার। ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে হয় ৩,৫৯১ ডলার। আর চলতি অর্থবর্ষের প্রথম তিন মাসে প্রতি টনের গড় রফতানি মূল্য লাফিয়ে ৪,৩৯২ ডলারে পৌঁছেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রকের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মহিষের মাংসের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ারই ইঙ্গিত এই মূল্যবৃদ্ধি। রফতানির অনুমতি পায় কেবল কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা অ্যাপেডা-নিবন্ধিত সংস্থা। খাদ্যনিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিকাঠামোর নির্দিষ্ট মান পূরণ করলেই মেলে ছাড়পত্র। তার পরেও চলে নিয়মিত ও আকস্মিক পরিদর্শন।
দেশে বর্তমানে অ্যাপেডা-অনুমোদিত ৮৩টি সমন্বিত কসাইখানা ও মাংস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র রয়েছে। প্রতিটি কেন্দ্রে দৈনিক ৫০০ থেকে ২,০০০টি পর্যন্ত মহিষ প্রক্রিয়াকরণের ক্ষমতা রয়েছে। এর বাইরে পাঁচটি স্বতন্ত্র কসাইখানা এবং দশটি পৃথক মাংস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রও রফতানির জন্য নথিভুক্ত।
একসময় আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় মহিষের মাংসকে গরুর মাংসের সস্তা বিকল্প হিসেবেই দেখা হত। ভারতীয় পণ্য যেখানে প্রতি টনে প্রায় ৩,০০০ ডলারে বিক্রি হত, সেখানে ব্রাজিলের গরুর মাংসের দাম ছিল প্রায় ৫,০০০ ডলার। এখন সেই ব্যবধান কমে টনপ্রতি ৫০০-৭০০ ডলারে দাঁড়িয়েছে। রফতানিকারকদের দাবি, ‘ক্যারাবিফ’-কে আলাদা আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ধীরে ধীরে সাফল্য পাচ্ছে।
মহিষের মাংস মূলত সসেজ, বার্গার প্যাটি, নাগেট, টিনবন্দি খাবার এবং রেডি-টু-ইট পণ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। এত দিন ভারত মূলত ২০-৩০ কিলোগ্রামের হিমায়িত ব্লক রফতানি করত। এখন এক কিলোগ্রাম বা তারও কম ওজনের প্যাকেটে সরাসরি খুচরো বাজারে ঢোকার চেষ্টা চলছে। ফলে একই পরিমাণ পণ্যে আরও বেশি মূল্য পাওয়া সম্ভব হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় বদল অবশ্য বাজারে।
২০১৪-১৫ সালে ভারতের মোট মহিষের মাংস রফতানির প্রায় ৪৫ শতাংশই যেত ভিয়েতনামে। সেই বাজারের মূল্য ছিল প্রায় ২২০ কোটি ডলার। অর্থাৎ একটি দেশের উপর নির্ভরতা ছিল যথেষ্ট বেশি। ২০২৫-২৬ সালে ভিয়েতনামে রফতানি কমে ৯৩ কোটি ৩৯ লক্ষ ডলারে দাঁড়ালেও ভারতের মোট রফতানি বেড়েছে। কারণ, একের পর এক নতুন বাজার খুলেছে।
গত অর্থবর্ষে দশটি দেশ ভারত থেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের মহিষের মাংস কিনেছে। ভিয়েতনামের পরেই রয়েছে মিশর—৭২ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার, মালয়েশিয়া—৬৫ কোটি ৪১ লক্ষ ডলার, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি—৪৪ কোটি ৪২ লক্ষ ডলার এবং সৌদি আরব—৩৫ কোটি ৯৩ লক্ষ ডলার।
নতুন বড় বাজার হিসেবে উঠে এসেছে উজবেকিস্তানও। সেখানে রফতানি হয়েছে ৩০ কোটি ৭০ লক্ষ ডলারের পণ্য। ইন্দোনেশিয়া ও ইরাকেও প্রায় ৩০ কোটি ডলার করে মহিষের মাংস পাঠিয়েছে ভারত। ফিলিপিন্স কিনেছে ১৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ডলার এবং জর্ডন ১০ কোটি ৫৫ লক্ষ ডলারের পণ্য।
এর পাশাপাশি রাশিয়া, জর্জিয়া, ওমান এবং সেনেগালও গুরুত্বপূর্ণ ক্রেতা হয়ে উঠছে। ২০২৫-২৬ সালে রাশিয়ায় ৯ কোটি ৭৫ লক্ষ, ওমানে ৮ কোটি ২৭ লক্ষ, সেনেগালে ৭ কোটি ৯ লক্ষ এবং জর্জিয়ায় ৭ কোটি ৫ লক্ষ ডলারের মহিষের মাংস রফতানি করেছে ভারত। ফলে কোনও একটি বাজারে চাহিদা কমলেও পুরো রফতানি ব্যবস্থায় বড় ধাক্কার আশঙ্কা তুলনামূলক কমছে।
নতুন বাজার তৈরিতে অ্যাপেডার উদ্যোগও রয়েছে। প্রতি টন হিমায়িত বা শীতল মহিষের মাংসের উপর ২৫০ টাকা শুল্ক নিয়ে তৈরি করা হয়েছে মাংস রফতানি উন্নয়ন তহবিল। সেই অর্থে বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধিদল পাঠানো, ক্রেতা-বিক্রেতা সম্মেলন আয়োজন এবং অশুল্ক বাধা দূর করার চেষ্টা চলছে।
এই শিল্পের সঙ্গে ভারতের দুগ্ধ অর্থনীতিরও সরাসরি যোগ রয়েছে। ভারত গরুর মাংস রফতানি করে না। মূলত দুধ দেওয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া, বন্ধ্যা, শারীরিক ভাবে অক্ষম অথবা পুরুষ মহিষের মাংসই রফতানি করা হয়। অনুৎপাদক পশুকে দীর্ঘদিন পালন করা কৃষকের জন্য ব্যয়বহুল। তাই পুরনো মহিষ বিক্রি করে পাওয়া অর্থ নতুন দুধেল মহিষ কেনার কাজে লাগানো যায়।
প্রায় ৪০০ কিলোগ্রাম ওজনের একটি মহিষ বিক্রি করে কৃষক ৫৭ হাজার থেকে ৬১ হাজার টাকা পেতে পারেন। অন্য দিকে, বছরে প্রায় ২,০০০ লিটার দুধ দিতে সক্ষম একটি তরুণ মহিষের দাম ১ লক্ষ ২৫ হাজার থেকে দেড় লক্ষ টাকার মধ্যে। অর্থাৎ পুরনো মহিষ বিক্রি করেই নতুন পশু কেনার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ খরচ উঠে আসতে পারে।
তবে পাঁচশো কোটি ডলারের এই সাফল্যের সামনে সমস্যাও কম নয়। রফতানিকারকদের অভিযোগ, নীতি ও আইন প্রয়োগে এখনও যথেষ্ট স্থিরতা নেই। বৈধ অনুমোদন থাকা সত্ত্বেও উত্তরপ্রদেশে কয়েকটি প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র বন্ধ রয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
শিল্পমহলের বক্তব্য, গোবংশ হত্যা বা বেআইনি কসাইখানা বন্ধ করার নীতিতে তাঁদের আপত্তি নেই। সমস্যা তৈরি হয় যখন স্থানীয় আধিকারিকরা কেন্দ্র বা রাজ্যের নির্ধারিত বিধির বাইরে গিয়ে আলাদা নিয়ম প্রয়োগ করেন।
তাই ভারতের ‘ক্যারাবিফ’ রফতানির পরের লড়াই শুধু নতুন ক্রেতা খোঁজার নয়। বাজার যেমন দরকার, তেমনই দরকার স্থায়ী, স্পষ্ট এবং পূর্বানুমানযোগ্য নীতি। পাঁচশো কোটি ডলার পেরিয়ে এখন প্রশ্ন একটাই—মহিষের মাংসের এই দৌড় কি ৬০০ কোটির গণ্ডিও ছাপিয়ে যাবে?
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



