International

হাসপাতালে ইমরান, প্রশ্নে জেল

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • পাকিস্তানের কারাবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট।
  • বাইরে থেকে দেখলে এটি এক জন বন্দির চিকিৎসার ব্যবস্থা মাত্র।
  • কিন্তু ইমরানের শারীরিক অবস্থার অবনতি, তাঁর চিকিৎসা নিয়ে সরকার ও পরিবারের পরস্পরবিরোধী দাবি, ব্যক্তিগত চিকিৎসকের প্রবেশাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে এই নির্দেশ…

বিস্তারিত প্রতিবেদন

পাকিস্তানের কারাবন্দি প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগার থেকে ইসলামাবাদের শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট। বাইরে থেকে দেখলে এটি এক জন বন্দির চিকিৎসার ব্যবস্থা মাত্র। কিন্তু ইমরানের শারীরিক অবস্থার অবনতি, তাঁর চিকিৎসা নিয়ে সরকার ও পরিবারের পরস্পরবিরোধী দাবি, ব্যক্তিগত চিকিৎসকের প্রবেশাধিকার নিয়ে টানাপোড়েন এবং দীর্ঘদিনের বিচ্ছিন্নতা—সব মিলিয়ে এই নির্দেশ পাকিস্তানের চলমান রাজনৈতিক ও মানবাধিকার বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সুপ্রিম কোর্টের তিন বিচারপতির বেঞ্চের বক্তব্য, কারাগারে থাকা মানেই স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মৌলিক অধিকার হারানো নয়। রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা অবস্থায় ইমরানের চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়ও রাষ্ট্রেরই। সেই নীতির ভিত্তিতেই তাঁকে কারাগারের বদলে পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল-পরিবেশে চিকিৎসার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আদালতের নির্দেশে কী রয়েছে

মঙ্গলবার, ১৮ অগস্ট, বিচারপতি শাহিদ ওয়াহিদের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বেঞ্চ ইমরানকে শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য বিচারপতি নঈম আখতার আফগান এবং বিচারপতি ইশতিয়াক ইব্রাহিম।

আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী—

  • ইমরানের পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করতে হবে।
  • চক্ষু, হৃদ্‌রোগ এবং সাধারণ চিকিৎসার বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি চিকিৎসা পর্ষদ গঠন করতে হবে।
  • তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ফয়সল সুলতানকে সেই পর্ষদে রাখতে হবে।
  • চিকিৎসক ইমরানের বোন উজমা খানকেও চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হবে।
  • পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত, অন্তত সাপ্তাহিক, সাক্ষাতের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • বিদেশে থাকা দুই ছেলের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে।
  • চিকিৎসার খরচ বহন করবে ইমরানের পরিবার।
  • তাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথি রাজনৈতিক প্রচারে ব্যবহার করা যাবে না।
  • হাসপাতালের স্বাভাবিক কাজকর্ম ব্যাহত করে কোনও রাজনৈতিক জমায়েত করা যাবে না।

কয়েকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত, অর্থাৎ ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাঁকে হাসপাতালে রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে কত দিন তিনি হাসপাতালে থাকবেন, তা চিকিৎসকদের মূল্যায়ন এবং আদালতের পরবর্তী নির্দেশের উপর নির্ভর করবে।

চোখের দৃষ্টিশক্তিই বড় উদ্বেগ

ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তাঁর ডান চোখকে ঘিরে। তাঁর আইনজীবীদের দাবি, দীর্ঘদিন যথাযথ চিকিৎসা না পাওয়ায় ওই চোখের প্রায় ৮৫ শতাংশ দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। ইমরানও চিকিৎসকদের জানিয়েছেন, তাঁর দৃষ্টিশক্তি মাত্র ১৫ শতাংশে নেমে এসেছিল।

তাঁর ডান চোখে ধরা পড়েছে সেন্ট্রাল রেটিনাল ভেন অক্লুশন (CRVO)। সহজ ভাষায়, রেটিনা থেকে রক্ত বের করে নিয়ে যাওয়া প্রধান শিরা বন্ধ হয়ে গেলে এই সমস্যা হয়। এর ফলে চোখের ভিতরে ফোলা, রক্তক্ষরণ এবং অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। দ্রুত চিকিৎসা না হলে স্থায়ী ভাবে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি এবং হৃদ্‌রোগ এই সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইমরানের ক্ষেত্রেও রক্তচাপের ওঠানামা এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

কারাগারে থাকাকালীন তাঁকে পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস বা পিআইএমএসে নিয়ে গিয়ে চোখে একাধিক বার চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। সরকারি পক্ষের দাবি, তাতে তাঁর দৃষ্টিশক্তির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। কিন্তু পরিবার এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসক সেই মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

তাঁদের বক্তব্য, ব্যক্তিগত চিকিৎসককে স্বাধীন ভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ না দিলে সরকারি চিকিৎসকদের রিপোর্টও নিরপেক্ষ ভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। এই বিরোধী দাবিই শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন ও বহুমুখী চিকিৎসা পর্ষদের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে।

চোখের বাইরে রক্তচাপও চিন্তার

সমস্যা শুধু দৃষ্টিশক্তিতে সীমাবদ্ধ নয়। আগস্টে ইমরানের রক্তচাপ, হৃদ্‌কম্পন এবং মাথাব্যথা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।

কারাগারে তাঁকে পরীক্ষা করা চিকিৎসকদের প্রতিবেদনে অনিয়ন্ত্রিত ও ওঠানামা করা রক্তচাপ, বুক ধড়ফড়, মাথা ভার লাগা, মাথাব্যথা, অস্থিরতা এবং প্রবল উদ্বেগের উল্লেখ রয়েছে।

১ অগস্ট পিআইএমএসের হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আখতার আলি বান্দেশাহ তাঁকে পরীক্ষা করেন। একটি প্রতিবেদনে তাঁর রক্তচাপ ১৪০/১০০ এবং নাড়ির গতি মিনিটে ৫০ বলে উল্লেখ করা হয়। ইসিজিতে বড় কোনও অস্বাভাবিকতা ধরা না পড়লেও বয়স, মানসিক চাপ এবং রক্তচাপের ওঠানামার কারণে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন বলে মত দেওয়া হয়। সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিয়োগ্রাফির কথাও ওঠে।

১০ অগস্ট চার সদস্যের একটি চিকিৎসা পর্ষদ তাঁকে ফের পরীক্ষা করে। সে দিন রক্তচাপ ছিল ১৪০/৮০। তবে চিকিৎসকেরা তাঁর উদ্বেগের মাত্রা নিয়ে বিশেষ ভাবে সতর্ক করেন।

অর্থাৎ, হাসপাতাল-স্থানান্তরের কারণ কোনও একক আকস্মিক অসুস্থতা নয়। দীর্ঘদিনের চোখের সমস্যা, রক্তচাপের অস্থিরতা, হৃদ্‌কম্পন, মাথাব্যথা, প্রবল উদ্বেগ এবং বয়স—সব মিলিয়েই পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা মূল্যায়নের প্রয়োজন তৈরি হয়েছে।

অসুস্থতার সঙ্গে জুড়েছে নিঃসঙ্গতাও

এই মামলার আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ইমরানের কারাবাসের পরিবেশ।

চিকিৎসকদের কাছে ইমরান জানিয়েছেন, স্ত্রী বুশরা বিবি, পরিবারের সদস্য এবং পরিচিতদের সঙ্গে সীমিত যোগাযোগ তাঁর মানসিক চাপ বাড়াচ্ছে। সংবাদপত্র, বই, সাময়িকপত্র ও টেলিভিশনের মতো স্বাভাবিক বিনোদন বা তথ্যের সুযোগও সীমিত বলে তাঁর অভিযোগ।

এখানে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ চিকিৎসা পর্ষদও তাঁকে আরও বেশি পারিবারিক যোগাযোগ, পড়াশোনার সুযোগ এবং নিয়মিত হাঁটার পরামর্শ দিয়েছে।

পর্ষদের সুপারিশের মধ্যে ছিল—

  • প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা হাঁটা ও বিশ্রামের সুযোগ;
  • স্ত্রী ও নিকট আত্মীয়দের সঙ্গে আরও ঘন ঘন দেখা;
  • সংবাদপত্র, বই, সাময়িকপত্র ও টেলিভিশন ব্যবহারের সুযোগ;
  • রক্তচাপ ও উদ্বেগ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ;
  • প্রয়োজন অনুযায়ী হৃদ্‌যন্ত্রের আরও পরীক্ষা।

অর্থাৎ, চিকিৎসকদের মূল্যায়নে ইমরানের শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার মানসিক প্রভাবও গুরুত্ব পেয়েছে।

পরিবার বনাম কারা কর্তৃপক্ষ

ইমরানের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করছে, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তাঁকে নিয়মিত দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. ফয়সল সুলতানেরও স্বাধীন ভাবে পরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ।

কারা কর্তৃপক্ষ অবশ্য পাল্টা দাবি করেছে, ইমরানকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাঁর স্বাস্থ্যের বিষয়টি তাদের অগ্রাধিকারে রয়েছে। পিটিআই নেতারা কারাগারে গিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন এবং সেই কারণে সাক্ষাৎ-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলেও প্রশাসনের যুক্তি।

এই টানাপোড়েনের ফলে সমস্যা দাঁড়িয়েছে অন্য জায়গায়—ইমরানের প্রকৃত শারীরিক অবস্থা নিয়ে স্বাধীন ভাবে নিশ্চিত হওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল।

সুপ্রিম কোর্ট তাই দুই পক্ষের বয়ানের মধ্যে একটি মধ্যপথ তৈরি করেছে। সরকারি চিকিৎসক থাকবেন, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকও থাকবেন। পরিবারের সদস্য থাকবেন, আবার চিকিৎসার সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞদের হাতেই থাকবে।

ইমরানের চিকিৎসক বোন উজমা খানকে চিকিৎসা পর্ষদের সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশও এই দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।

সরকারি রিপোর্ট বনাম পরিবারের দাবি

ইমরানের স্বাস্থ্য নিয়ে পাকিস্তানে কার্যত দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত বয়ান তৈরি হয়েছে।

সরকারি পক্ষের বক্তব্য, তাঁকে নিয়মিত পরীক্ষা করা হয়েছে, প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে এবং চোখের চিকিৎসার পর তাঁর অবস্থার উন্নতিও হয়েছে। তাঁদের মতে, ইমরান চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত নন।

পরিবার ও পিটিআইয়ের অভিযোগ সম্পূর্ণ উল্টো। তাঁদের দাবি, চিকিৎসায় দেরি হয়েছে, ব্যক্তিগত চিকিৎসককে পর্যাপ্ত সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং প্রকৃত শারীরিক অবস্থা গোপন থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্ট এই দুই দাবির কোনওটিকেই সরাসরি সত্য বলে ঘোষণা করেনি। বরং আদালতের পথ ছিল অনেক বেশি বাস্তবমুখী—যখন দু’পক্ষের বক্তব্যে আস্থা নেই, তখন স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা করানো হোক।

এই কারণেই হাসপাতাল, বহুবিষয়ক চিকিৎসা পর্ষদ এবং ব্যক্তিগত চিকিৎসকের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ।

কেন কারাগার থেকে হাসপাতালে?

কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল, আদিয়ালা কারাগারেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে। সরকারি পক্ষও অবিলম্বে হাসপাতাল-স্থানান্তর নিয়ে আপত্তি তুলেছিল।

কিন্তু আদালতের সামনে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রথমত, CRVO-এর মতো চোখের সমস্যায় নিয়মিত বিশেষজ্ঞের নজরদারি প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, রক্তচাপের অস্বাভাবিক ওঠানামা এবং হৃদ্‌কম্পনের কারণ নির্ধারণে আরও পরীক্ষা দরকার হতে পারে। তৃতীয়ত, সরকারি ও ব্যক্তিগত চিকিৎসকদের মূল্যায়নের মধ্যে এতটাই ফারাক তৈরি হয়েছিল যে কারাগারের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর একক ভাবে নির্ভর করা কঠিন হয়ে পড়ে।

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—ইমরান রাষ্ট্রের হেফাজতে। তিনি নিজের ইচ্ছেমতো চিকিৎসক বা হাসপাতাল বেছে নেওয়ার স্বাধীনতায় নেই। ফলে তাঁর চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের উপরই বর্তায়।

এটি কি ইমরানের রাজনৈতিক জয়?

আপাতত একে সরাসরি রাজনৈতিক জয় বা কারা প্রশাসনের পরাজয় বলা ঠিক হবে না।

সুপ্রিম কোর্ট ইমরানের বিরুদ্ধে চলা মামলাগুলির বৈধতা নিয়ে কোনও সিদ্ধান্ত দেয়নি। তাঁর সাজাও বাতিল হয়নি। হাসপাতালেও তিনি রাষ্ট্রীয় হেফাজতেই থাকবেন।

তবে রাজনৈতিক তাৎপর্য একেবারেই নেই, এমনও নয়।

আদালত কার্যত স্বীকার করেছে যে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগকে নিছক রাজনৈতিক প্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্যক্তিগত চিকিৎসক এবং পরিবারের সদস্যকে চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার নির্দেশও সরকারি ব্যবস্থার প্রতি তৈরি হওয়া আস্থার ঘাটতিকে সামনে এনেছে।

আর পরিবার ও সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানোর নির্দেশ ইমরানের দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার নীতির উপরও একটি সীমা টেনেছে।

পাকিস্তানের রাজনীতির ছায়া

ইমরান খান ২০১৮ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তিনি পাকিস্তানের রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র।

২০২৩ সালের অগস্ট থেকে তিনি কারাবন্দি। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও অভিযোগ রয়েছে। কিছু মামলায় সাজা স্থগিত বা বাতিল হলেও অন্য মামলায় সাজা ও বিচারপ্রক্রিয়ার কারণে তিনি মুক্তি পাননি।

ইমরান ও তাঁর দল পিটিআইয়ের অভিযোগ, তাঁকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে রাখতেই একের পর এক মামলা করা হয়েছে। সরকার ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলি অবশ্য সেই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।

২০২৪ সালের নির্বাচনে পিটিআইয়ের নির্বাচনী প্রতীক বাতিল হলেও দল-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সাফল্য পান। পরে জোট সরকার ক্ষমতায় আসে।

ফলে ইমরানের কারাবাস কখনওই শুধু একটি আইনি বিষয় হয়ে থাকেনি। তাঁর স্বাস্থ্য, পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ কিংবা চিকিৎসা—সবকিছুর সঙ্গেই রাজনৈতিক উত্তেজনা জড়িয়ে গেছে।

হাসপাতালও যেন রাজনৈতিক মঞ্চ না হয়

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পাশাপাশি আর একটি বিষয় স্পষ্ট—হাসপাতালকে রাজনৈতিক সমাবেশের জায়গায় পরিণত করা যাবে না।

পিটিআইও সমর্থকদের হাসপাতালের বাইরে ভিড় না করার আহ্বান জানিয়েছে। কারণ সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা ব্যাহত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।

ইমরানকে ঘিরে ২০২৩ সালে পাকিস্তানে যে হিংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তার পর তাঁর হাসপাতাল-স্থানান্তরও নিরাপত্তার দিক থেকে সংবেদনশীল। আদালত তাই এক দিকে তাঁর চিকিৎসার অধিকার নিশ্চিত করেছে, অন্য দিকে হাসপাতালের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষার নির্দেশও দিয়েছে।

এখন নজর কোথায়

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হয়, সেটিই প্রথম পরীক্ষা।

তার পরে গুরুত্বপূর্ণ হবে নতুন চিকিৎসা পর্ষদের রিপোর্ট। ইমরানের ডান চোখের প্রকৃত অবস্থা কী? দৃষ্টিশক্তির কতটা ক্ষতি হয়েছে? রক্তচাপ ও হৃদ্‌যন্ত্রের ঝুঁকি কতটা? দীর্ঘ বিচ্ছিন্নতার কারণে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যে কতটা প্রভাব পড়েছে?

আরও একটি প্রশ্ন থাকবে—চিকিৎসা শেষ হলে তাঁকে কবে কারাগারে ফেরানো হবে এবং সেই সিদ্ধান্ত কে নেবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এবার ইমরানের চিকিৎসা নিয়ে সরকারি ও পারিবারিক দাবির মধ্যে যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা আদৌ কমে কি না।

শেষ কথা

ইমরান খানকে হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশ কোনও আকস্মিক অসুস্থতার প্রতিক্রিয়া নয়। দীর্ঘদিনের চোখের সমস্যা, দৃষ্টিশক্তি হারানোর আশঙ্কা, রক্তচাপের ওঠানামা, হৃদ্‌কম্পন, মাথাব্যথা, প্রবল উদ্বেগ এবং কারাগারে বিচ্ছিন্ন জীবন—সব মিলিয়েই আদালত পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসার প্রয়োজন দেখেছে।

কিন্তু এই মামলার গভীরতর প্রশ্ন চিকিৎসার বাইরেও।

কারাগারে বন্দি একজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের স্বাস্থ্য নিয়ে যখন সরকার এবং পরিবারের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত, তখন সত্যিটা নিশ্চিত করবে কে?

সুপ্রিম কোর্টের উত্তর আপাতত স্পষ্ট—স্বাধীন চিকিৎসক, পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা এবং রাষ্ট্রের স্বচ্ছ জবাবদিহি। ইমরানের হাসপাতাল-যাত্রা তাই শুধু এক জন অসুস্থ বন্দির চিকিৎসা নয়; পাকিস্তানে রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অধিকার কতটা সুরক্ষিত, তারও পরীক্ষা।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles