হৃদ্যন্ত্রের ৫ পাহারা

যা জানা জরুরি
- হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে শুধু শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ কিংবা ডায়েট মেনে চলাই যথেষ্ট নয়।
- প্রতিদিনের কিছু ছোট অভ্যাসও দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা নিতে পারে।
- হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিকোল হারকিন নিজের হৃদ্যন্ত্রের যত্নে পাঁচটি বিষয়কে কখনও অবহেলা করেন না—ধূমপান ও ভেপিং এড়ানো, বুকে ব্যথাকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রক্রিয়াজাত মাংস কমানো,…
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হৃদ্যন্ত্র ভালো রাখতে শুধু শরীরচর্চা, ওজন নিয়ন্ত্রণ কিংবা ডায়েট মেনে চলাই যথেষ্ট নয়। প্রতিদিনের কিছু ছোট অভ্যাসও দীর্ঘমেয়াদে হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে বড় ভূমিকা নিতে পারে। হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. নিকোল হারকিন নিজের হৃদ্যন্ত্রের যত্নে পাঁচটি বিষয়কে কখনও অবহেলা করেন না—ধূমপান ও ভেপিং এড়ানো, বুকে ব্যথাকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রক্রিয়াজাত মাংস কমানো, পারিবারিক রোগের ইতিহাস জানা এবং পর্যাপ্ত ঘুমকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ্যে উপলব্ধ তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যের ভিত্তিতে তৈরি। কোনও নতুন স্বাস্থ্যবিধি বা জীবনযাপনের পরিবর্তন করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১. সিগারেট নয়, ভেপও নয়
নিকোটিনের ঝুঁকি বোঝাতে ডা. হারকিন জানিয়েছেন, অল্পবয়সে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়া যে মহিলাদের তিনি দেখেছেন, তাঁদের প্রায় সকলেই ধূমপান করতেন অথবা ভেপ ব্যবহার করতেন। এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেকের এখনও ধারণা—সিগারেটের তুলনায় ভেপিং অনেক নিরাপদ।
কার্ডিয়া সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতা ডা. সি এম নাগেশের মতে, ধূমপান হৃদ্রোগের অন্যতম শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত ঝুঁকি। তামাকের ধোঁয়া রক্তনালির ভিতরের আবরণ ক্ষতিগ্রস্ত করে, ধমনিতে চর্বি জমার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বাড়ায়। এর ফলে হৃদ্রোগের পাশাপাশি স্ট্রোকের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
ভেপিংকেও তাই পুরোপুরি নিরাপদ ভাবার কারণ নেই। গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, ভেপিং রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যকারিতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে হৃদ্যন্ত্রের জন্য এটি ঝুঁকিমুক্ত বিকল্প নয়।
২. বুকে ব্যথা? অপেক্ষা নয়
বুকে ব্যথা বা অস্বস্তিকে ‘গ্যাস’ ভেবে বসে থাকা বিপজ্জনক হতে পারে। ডা. হারকিনের অন্যতম সতর্কবার্তা—বুকে ব্যথা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা দরকার।
বুকে চাপ, ভারী লাগা, আঁটসাঁট অনুভূতি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হলে সতর্ক হতে হবে। বিশেষ করে হাঁটা বা পরিশ্রমের সময় সমস্যা বাড়লে কিংবা সঙ্গে ঘাম, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব অথবা চোয়াল, ঘাড়, কাঁধ বা হাতে ব্যথা ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
মহিলা এবং ডায়াবিটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লক্ষণ সব সময় তীব্র বুকের ব্যথা নাও হতে পারে। অস্বাভাবিক ক্লান্তি, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, পিঠের উপরিভাগ বা পাকস্থলীর কাছে অস্বস্তিও সতর্কবার্তা হতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়—নিজে থেকে ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে এটি অম্বল বা পেশির ব্যথা। প্রয়োজন হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
৩. প্লেটে কমুক প্রক্রিয়াজাত মাংস
সসেজ, সালামি, হট ডগ, বার্গার প্যাটি এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষিত বিভিন্ন ধরনের মাংস নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস হৃদ্যন্ত্রের জন্য খুব একটা ভাল নয়।
ডা. নাগেশের মতে, এই ধরনের খাবারে প্রায়ই বেশি পরিমাণে লবণ, সম্পৃক্ত চর্বি এবং সংরক্ষণকারী উপাদান থাকে। এগুলি উচ্চ রক্তচাপ, ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের পরিবর্তন এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহের সঙ্গে যুক্ত।
মাঝেমধ্যে খাওয়া আর প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় প্রক্রিয়াজাত মাংস রাখা এক বিষয় নয়। হৃদ্যন্ত্রের কথা মাথায় রেখে দ্বিতীয় অভ্যাসটি যতটা সম্ভব এড়ানোই ভাল।
৪. পরিবারের ‘হার্ট হিস্ট্রি’ জানুন
হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাস একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। বাবা-মা, ভাইবোন কিংবা নিকট আত্মীয়ের অল্প বয়সে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবিটিস বা কোলেস্টেরলের সমস্যা থাকলে সেই তথ্য চিকিৎসককে জানানো উচিত।
বংশগত ঝুঁকি বদলানো সম্ভব নয়, কিন্তু তা জানা থাকলে আগেভাগে সতর্ক হওয়া যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্তচাপ, রক্তে শর্করা এবং কোলেস্টেরল পরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সম্ভব হয়।
কিছু ক্ষেত্রে পারিবারিক ইতিহাসের কারণে অপেক্ষাকৃত কম বয়স থেকেই বাড়তি নজরদারি বা প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের প্রয়োজন হতে পারে।
৫. ঘুমকে ‘পরে করব’ তালিকায় রাখবেন না
ভালো ঘুম শুধু পরের দিনের সতেজতার জন্য নয়, হৃদ্যন্ত্রের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত কম ঘুম, অনিয়মিত ঘুম কিংবা বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা, ডায়াবিটিস এবং হৃদ্স্পন্দনের কিছু অস্বাভাবিকতার সম্পর্ক রয়েছে।
প্রায় এক দশকের চিকিৎসা প্রশিক্ষণ, জরুরি হৃদ্রোগ পরিষেবায় কাজ এবং তিন সন্তান সামলানোর অভিজ্ঞতা থেকে ডা. হারকিন জানিয়েছেন, এখন তিনি ঘুমকে বিশেষ গুরুত্ব দেন। অর্থাৎ ব্যস্ততার মধ্যেও রাতের নিরবচ্ছিন্ন ঘুমকে বাদ দেওয়ার জায়গা নেই।
হৃদ্যন্ত্রের যত্নে শেষ কথা তাই খুব জটিল নয়—সিগারেট ও ভেপিং থেকে দূরে থাকুন, বুকে অস্বাভাবিক উপসর্গকে অবহেলা করবেন না, প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান, পারিবারিক ঝুঁকি জানুন এবং ঘুমকে গুরুত্ব দিন।
কারণ হৃদ্রোগের ক্ষেত্রে সময়ের মূল্য অনেক। উপসর্গ শুরু হলে দ্রুত চিকিৎসা শুধু জীবন বাঁচাতেই নয়, হৃদ্পেশির স্থায়ী ক্ষতি কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
স্বাস্থ্য সতর্কতা: এটি সাধারণ তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। পরীক্ষা বা চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিবন্ধিত চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করে নিন।



