স্কুল দেখার ‘অপরাধ’, প্রাণ গেল বাবার!

যা জানা জরুরি
- বাঁকুড়ার ইন্দাসে সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো দেখতে গিয়ে হামলার শিকার হলেন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র এক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক এবং তাঁর বাবা।
- সিজেপি-র অভিযোগ, বিজেপি-আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই হামলা চালিয়েছে।
- যদিও মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিজেপির কর্মী বলে উল্লেখ করা হয়নি।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাঁকুড়ার ইন্দাসে সরকারি স্কুলের পরিকাঠামো দেখতে গিয়ে হামলার শিকার হলেন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)-র এক তরুণ স্বেচ্ছাসেবক এবং তাঁর বাবা। গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে মৃত্যু হয়েছে বাবার। ঘটনাকে ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চাপানউতোর। সিজেপি-র অভিযোগ, বিজেপি-আশ্রিত দুষ্কৃতীরাই হামলা চালিয়েছে। যদিও মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের বিজেপির কর্মী বলে উল্লেখ করা হয়নি।
মৃতের নাম শেখ মহম্মদ মাফিক। তাঁর ছেলে ২৫ বছরের শেখ আবদুল হাফিজ সিজেপির স্বেচ্ছাসেবক। সংগঠনের দেশব্যাপী ‘স্কুল ঠিক করো’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ১৩ আগস্ট নিজের গ্রামের কড়িশুন্ডা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছিলেন হাফিজ। যে স্কুলে তাঁর নিজেরও পড়াশোনা, সেখানকার ঘর, শৌচাগার, পানীয় জল-সহ বিভিন্ন পরিকাঠামোর ছবি ও ভিডিয়ো তুলে জনসমক্ষে আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।
অভিযোগ, সেদিন সন্ধ্যাতেই কয়েকজন ব্যক্তি জোর করে হাফিজদের বাড়িতে ঢুকে পড়েন। স্কুলের ছবি ও ভিডিয়ো কেন তোলা হয়েছে, তা জানতে চেয়ে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়। তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে স্কুলের ভিডিয়োর পাশাপাশি দিল্লির যন্তর মন্তরে আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কিছু ছবিও মুছে ফেলতে বাধ্য করা হয় বলে দাবি হাফিজের।
এর পর তাঁকে একটি ক্ষমাপ্রার্থনার ভিডিয়ো রেকর্ড করতে বলা হয়। সেখানে বলতে বলা হয়েছিল, বাইরের কারও প্ররোচনায় তিনি স্কুল পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। হাফিজ তাতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে আক্রান্ত হন তাঁর বাবা মাফিকও। পরিবারের দাবি, হামলাকারীদের কয়েকজনের হাতে ধারালো অস্ত্র ছিল।
হামলায় হাফিজের ঘাড়ে গুরুতর চোট লাগে। তাঁর বাবার মাথায় ভারী কোনও বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করার পর তাঁকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানেই শনিবার তাঁর মৃত্যু হয়। তবে ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত ঠিক কোন আঘাতের কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে, তা নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয়।
হাসপাতাল থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিয়োয় হাফিজের দাবি, হামলার পরেও তাঁদের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে স্কুলের পরিকাঠামো নিয়ে কথা বললে প্রাণে মেরে ফেলার ভয় দেখানো হয়। নিরাপত্তার আশঙ্কায় পরে তাঁকে কলকাতায় চলে আসতে হয়েছে বলে জানিয়েছে সিজেপি।
ঘটনার তীব্র নিন্দা করেছেন সিজেপি-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপক। তাঁর প্রশ্ন, যে স্কুলে আবদুল নিজে পড়েছেন, সেই স্কুলের উন্নতির দাবি তোলাই কি তাঁর অপরাধ? তাঁর অভিযোগ, হামলাকারীরা বিজেপির সঙ্গে যুক্ত। তাঁর কথায়, ভাল স্কুলের দাবি তোলার জন্য যদি মানুষকে প্রাণ দিতে হয়, তবে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সিজেপি জানিয়েছে, দলের একটি প্রতিনিধিদল হাফিজের পরিবারের সঙ্গে দেখা করবে এবং আইনি লড়াইয়েও পাশে থাকবে।
সংগঠনের মুখ্য মুখপাত্র সৌরভ দাসের অভিযোগ, সরকারি স্কুলের উন্নতির দাবি কোনও রাজনৈতিক দলের বিরোধিতা করার বিষয় নয়; বরং সব দলেরই তা সমর্থন করা উচিত। তাঁর আরও অভিযোগ, হামলার পর যথাযথ চিকিৎসা ও আইনি নথি তৈরি এবং অভিযোগ গ্রহণের ক্ষেত্রেও গড়িমসি করা হয়েছিল। সংগঠনটি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পরিবারের নিরাপত্তা দাবি করেছে।
তবে সরকারের বক্তব্য ভিন্ন। মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, দায়ের হওয়া অভিযোগে পাঁচজনের নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, বাকি দু’জনের খোঁজ চলছে। আরও পাঁচজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
অধিকারীর দাবি, অভিযোগপত্রে অভিযুক্তদের বিজেপি কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়নি। তাঁদের অজ্ঞাতপরিচয় হামলাকারী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজ্যের নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পালও জানিয়েছেন, অভিযুক্তদের রাজনৈতিক পরিচয় যা-ই হোক, কাউকে রেয়াত করা হবে না।
ফলে আপাতত দুই বিপরীত দাবি—সিজেপির বিজেপির দিকে অভিযোগের আঙুল এবং সরকারের রাজনৈতিক যোগ অস্বীকার—দুটিই সামনে রয়েছে। প্রকৃত ঘটনা কী, তা নির্ধারণ করবে পুলিশের তদন্ত।
তবে অভিযোগগুলি সত্য হলে ঘটনাটি আরও বড় একটি প্রশ্ন তুলে দেয়। একটি সরকারি স্কুলের ভাঙাচোরা পরিকাঠামোর ছবি তোলা, তার উন্নতির দাবি জানানো এবং সেই নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যদি হিংসার কারণ হয়ে থাকে, তবে তা শুধু একটি পরিবারের উপর হামলা নয়—প্রশ্ন করার অধিকারকেই ভয় দেখানোর চেষ্টা।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



