স্বাধীনতা দিবসে কংগ্রেসের সদর দফতরে ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশন ঘিরে বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। এ বার সরাসরি সনিয়া গান্ধীকে নিশানা করলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তাঁর অভিযোগ, জাতীয় গানটি সম্পূর্ণ পরিবেশন করার সময় আপত্তি জানিয়ে তা মাঝপথে থামাতে চেয়েছিলেন সনিয়া। দেশবাসী এবং ‘বন্দে মাতরম্’-এর স্রষ্টা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কাছে কংগ্রেস নেত্রীর ক্ষমা চাওয়া উচিত বলেও দাবি করেছেন তিনি। কংগ্রেস অবশ্য অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে জানিয়েছে, গানটির পূর্ণ সংস্করণই গাওয়া হয়েছিল; সনিয়ার অঙ্গভঙ্গির সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থ বার করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে বিজেপি।

রাজস্থানের চিত্তৌড়গড়ে এক জনসভায় শাহ বলেন, স্বাধীনতার ৮০ বছর পরে লালকেল্লা-সহ দেশের বিভিন্ন পতাকা উত্তোলন অনুষ্ঠানে পূর্ণ মর্যাদায় ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া হয়েছে। অথচ কংগ্রেসের সদর দফতরে জাতীয় গান চলাকালীন সনিয়া তা বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে তাঁর দাবি। শাহের কথায়, “দেশের ১৪০ কোটি মানুষ সব দেখেছেন। যে গানের জন্য হাজার হাজার স্বাধীনতা সংগ্রামী লাঠি ও গুলি খেয়েছেন, কারাবরণ করেছেন, সেই গান অসম্পূর্ণ রেখে দেওয়ার কথা কেউ ভাবতে পারেন কী করে?”

সনিয়ার উদ্দেশে শাহ আরও বলেন, “যদি সামান্য লজ্জাবোধ অবশিষ্ট থাকে, তা হলে হাতজোড় করে বঙ্কিমবাবুর অমর আত্মা এবং দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান।” কংগ্রেস তোষণের রাজনীতি ও ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ঐতিহাসিক তাৎপর্য ভুলে গিয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ইকনমিক টাইমসের প্রতিবেদনAttachment.png অনুযায়ী, দিল্লি এবং কর্নাটকের ম্যাঙ্গালুরুতে কংগ্রেস নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগও দায়ের হয়েছে।

বিতর্কের সূত্রপাত কংগ্রেস সদর দফতরের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের একটি ভিডিয়ো থেকে। সেখানে ‘বন্দে মাতরম্’ পরিবেশন চলাকালীন সনিয়াকে দলীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সঙ্গে কথা বলতে এবং হাত দিয়ে ইঙ্গিত করতে দেখা যায়। বিজেপির দাবি, পূর্ণ গান গাওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েই সনিয়া সেটি বন্ধ করতে বলেছিলেন। বিজেপি সভাপতি নিতিন নবীন ঘটনাটিকে কংগ্রেসের “তোষণের নোংরা রাজনীতি” বলে বর্ণনা করেছেন। কলকাতা, লখনউ-সহ কয়েকটি শহরে বিজেপির যুব শাখা প্রতিবাদও দেখিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বঙ্কিমচন্দ্রকে ‘সাহিত্যসম্রাট’ হিসেবে শ্রদ্ধা করা বাংলার মানুষ এই ঘটনায় গভীরভাবে আহত। কংগ্রেস নিঃশর্ত ক্ষমা না চাইলে বৃহত্তর আন্দোলন হতে পারে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্রের পঞ্চম প্রজন্মের উত্তরসূরি এবং নৈহাটির বিজেপি বিধায়ক সুমিত্র চট্টোপাধ্যায় সনিয়াকে চিঠি লিখে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছেন।

কংগ্রেসের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ আলাদা। দলের দাবি, গান বন্ধ করতে নয়, দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা প্রবীণ সভাপতি খাড়গের জন্য চেয়ার আনতে বলছিলেন সনিয়া। ‘বন্দে মাতরম্’-এর সম্পূর্ণ সংস্করণই অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয়েছিল। একটি অঙ্গভঙ্গিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করে বিজেপি দেশের প্রকৃত সমস্যা এবং সরকারের ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতে চাইছে বলে কংগ্রেসের অভিযোগ।

এআইসিসি-র সাধারণ সম্পাদক কে সি বেণুগোপাল বলেন, ‘বন্দে মাতরম্’-এর প্রতি কংগ্রেসের শ্রদ্ধা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও অবকাশ নেই। স্বাধীনতা আন্দোলনে গানটির প্রসার ও জনপ্রিয়তার সঙ্গে কংগ্রেসের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। তাঁর বক্তব্য, ১৯৩৭ সালে মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই কংগ্রেসের অধিবেশনে গানটির প্রথম দুই স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তকে দেশবিরোধিতা হিসেবে দেখানো অসৎ প্রচার।

কংগ্রেসের প্রচার বিভাগের প্রধান পবন খেরা স্মরণ করিয়েছেন, ব্রিটিশ পুলিশের লাঠির সামনে দাঁড়িয়ে ‘বন্দে মাতরম্’ ধ্বনি তুলেছিলেন কংগ্রেসেরই স্বাধীনতা সংগ্রামীরা। প্রাক্তন রাজস্থান মুখ্যমন্ত্রী অশোক গহলৌতের পাল্টা প্রশ্ন, ব্রিটিশ আমলে যে আরএসএস এই গান গেয়ে আন্দোলনে নামেনি, তারা আজ কংগ্রেসকে জাতীয়তাবাদের পাঠ পড়াচ্ছে কী করে?

ফলে জাতীয় গানের মর্যাদার প্রশ্ন দ্রুতই দলীয় রাজনৈতিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে। আসলে সনিয়া কী বলতে চেয়েছিলেন, একটি নীরব ভিডিয়ো থেকে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের আবেগময় উত্তরাধিকার ‘বন্দে মাতরম্’কে কেন্দ্র করে বিজেপি ও কংগ্রেসের পুরনো ইতিহাস-যুদ্ধ যে আরও এক দফা তীব্র হল, তা নিয়ে সংশয় নেই।