রাশিয়ার আকাশে ড্রোনঝড়, ছয় নিহত

যা জানা জরুরি
- যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলাগুলির একটি চালাল ইউক্রেন।
- মস্কোর দাবি, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রুশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া ১,৪৭৮টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
- সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নিজেদের সাফল্য তুলে ধরতে রুশ কর্তৃপক্ষ অনেক সময় পরিসংখ্যান বাড়িয়ে প্রকাশ করে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে সম্ভবত সবচেয়ে বড় ড্রোন হামলাগুলির একটি চালাল ইউক্রেন। মস্কোর দাবি, মাত্র ২৪ ঘণ্টায় রুশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়া ১,৪৭৮টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। সংখ্যাটি স্বাধীন ভাবে যাচাই করা যায়নি। সামরিক বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, নিজেদের সাফল্য তুলে ধরতে রুশ কর্তৃপক্ষ অনেক সময় পরিসংখ্যান বাড়িয়ে প্রকাশ করে। তবে মস্কো-সহ রাশিয়ার একাধিক অঞ্চলে আগুন, বিস্ফোরণ ও ক্ষয়ক্ষতির যে ছবি সামনে এসেছে, তাতে হামলার ব্যাপকতা নিয়ে সংশয় কম।
রুশ কর্তৃপক্ষের দাবি, হামলায় অন্তত ছ’জন নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে ইউক্রেন সীমান্তবর্তী রোস্তভ অঞ্চলে, আর মস্কো অঞ্চলে প্রাণ হারিয়েছেন আরও এক জন।
অন্য দিকে, রাশিয়ার পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ইউক্রেনেও অন্তত সাত জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ, যুদ্ধক্ষেত্রের সীমা পেরিয়ে দুই দেশের শহর, শিল্পাঞ্চল ও অসামরিক পরিকাঠামোই ক্রমশ আকাশযুদ্ধের নতুন ময়দান হয়ে উঠছে।
মস্কোর শহরতলিতে আগুন
সবচেয়ে বড় ক্ষয়ক্ষতির ছবি এসেছে মস্কোর শহরতলি থেকে। রাজধানীর কেন্দ্র থেকে প্রায় ২৫ মাইল দক্ষিণে পোদোলস্কের কাছে অনলাইন বিপণন সংস্থা ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর বিশাল পণ্যবণ্টন কেন্দ্রে আগুন ধরে যায়।
প্রায় আড়াই লক্ষ বর্গমিটার আয়তনের ওই গুদাম কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে দাবি করেছে ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী। সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা যায়, গোটা চত্বর জুড়ে আগুনের বিশাল শিখা আর ঘন কালো ধোঁয়া। দীর্ঘ সময় ধরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে লড়াই করতে হয় দমকলকর্মীদের।
মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন জানিয়েছেন, শুধু মস্কো অঞ্চলকে লক্ষ্য করেই প্রায় ৬০০টি ড্রোন পাঠানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, এর মধ্যে ২০১টি ধ্বংস করা হয়েছে।
মস্কো অঞ্চলের গভর্নর আন্দ্রেই ভোরোবিয়ভ ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় ড্রোন হামলা বলে বর্ণনা করেছেন। ইউক্রেনের দাবি, পোদোলস্কের পাশাপাশি কাছের দোমোদেদোভোর আরও একটি গুদামেও আঘাত হেনেছে তাদের ড্রোন।
‘ওয়াইল্ডবেরিজ’ কেন নিশানায়?
গত এক মাসে ‘ওয়াইল্ডবেরিজ’-এর পরিকাঠামো বারবার নিশানায় এসেছে। রাশিয়ার অসংখ্য বড় ও ছোট ব্যবসা এই সংস্থার গুদাম ও পরিবহণ ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীল।
কিয়েভের দাবি, সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্যের পাশাপাশি রুশ সামরিক বাহিনীর রসদ সরবরাহেও এই পরিকাঠামো ব্যবহার করা হচ্ছে। রবিবার ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী দাবি করেছে, সংস্থাটির দশটি বৃহত্তম গুদামের মধ্যে সাতটিই তারা অচল করে দিয়েছে।
অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু আগুন লাগানো নয়—রুশ সেনার সরবরাহব্যবস্থায় চাপ তৈরি করা এবং একই সঙ্গে দেশের অর্থনীতিতে ধাক্কা দেওয়া।
রোস্তভেও বিস্ফোরণ
রোস্তভ অঞ্চলে প্রায় ১৫০টি ড্রোন ধ্বংস করার দাবি করেছেন স্থানীয় গভর্নর। তবে ইউক্রেনের দাবি, কামেনস্ক-শাখতিনস্কি শহরে রকেটের জ্বালানি তৈরির একটি কারখানায় হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রাশিয়ার সামরিক ও শিল্প পরিকাঠামোর অনেক গভীরে পৌঁছে হামলা চালানোর ক্ষমতা যে কিয়েভ দ্রুত বাড়াচ্ছে, এই ঘটনাও তারই ইঙ্গিত।
এর পিছনে বড় ভূমিকা রয়েছে ইউক্রেনের নিজস্ব দূরপাল্লার অস্ত্রভাণ্ডারের। ‘ফ্লেমিঙ্গো’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ‘ফায়ার পয়েন্ট’-এর তৈরি এফপি-১ ড্রোন ব্যবহার করে সীমান্ত থেকে প্রায় দেড় হাজার মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও আঘাত হানার সক্ষমতা তৈরি করেছে কিয়েভ।
তেল শোধনাগার, বন্দর, গুদাম ও সামরিক কারখানায় ধারাবাহিক হামলা রাশিয়ার যুদ্ধ পরিচালনার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তবে দ্রুতগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে মস্কো এখনও এগিয়ে।
ইউক্রেনীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ সেরহি কুজানের মতে, রাশিয়া ধ্বংস করা ড্রোনের সংখ্যা বাড়িয়ে বললেও ইউক্রেনের উৎপাদন ক্ষমতা এবং দূরপাল্লার হামলার সামর্থ্য দ্রুত বাড়ছে—এটি অস্বীকার করার উপায় নেই।
তাঁর মতে, প্রতিটি সফল হামলা রাশিয়ার সামরিক ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যে কিছুটা করে চাপ তৈরি করছে এবং ক্রেমলিনকে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষয়যুদ্ধের নতুন সমস্যার মুখে ফেলছে।
পাল্টা হামলায় ইউক্রেনেও রক্তপাত
রাশিয়ার পাল্টা হামলায় ইউক্রেনেও প্রাণহানি হয়েছে। ক্রিভি রিহ শহরে দু’জন, সুমি সীমান্ত অঞ্চলে দু’জন এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় আরও তিন জন নিহত হয়েছেন।
ভোররাতে কিয়েভে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ছ’জন আহত হন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় আগুন লাগে। ওবোলোনস্কি জেলার পেত্রোভকা বইয়ের বাজারের বড় অংশও পুড়ে যায়। বহু বিক্রেতার বছরের পর বছর ধরে জমানো বই এবং স্কুলপাঠ্যের মজুত মুহূর্তে ছাই হয়ে যায়।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির অভিযোগ, রাশিয়া ইচ্ছাকৃত ভাবে অসামরিক পরিকাঠামোকে নিশানা করছে। তাঁর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে ইউক্রেনের শহর ও জনপদগুলিকে লক্ষ্য করে দেড় হাজারের বেশি ড্রোন, প্রায় সমসংখ্যক নিয়ন্ত্রিত আকাশবোমা এবং ৬২টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে রাশিয়া।
নেটোর আকাশেও যুদ্ধের ছায়া
এই সংঘাত এ দিন বিপজ্জনক ভাবে নেটোর আকাশসীমার কাছাকাছি পৌঁছে যায়। রোমানিয়ার আকাশে ঢুকে পড়া একটি সন্দেহভাজন রুশ ড্রোনকে গুলি করে নামিয়েছে নেটোর টহলদারিতে থাকা স্পেনের একটি এফ-১৮ যুদ্ধবিমান।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, দুই পক্ষই তত বেশি দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে। ফলে যুদ্ধের ভৌগোলিক পরিধি বাড়ছে, চাপ বাড়ছে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার উপর, আর তার সঙ্গে বাড়ছে অসামরিক মানুষের প্রাণহানির ঝুঁকিও।
রাশিয়ার আকাশে এক রাতের এই ড্রোনঝড় তাই শুধু সংখ্যার লড়াই নয়। ইউক্রেন যে এখন রাশিয়ার গভীরে গিয়ে আঘাত হানার সক্ষমতা বাড়াচ্ছে, তারও স্পষ্ট বার্তা।
আর পাল্টা হামলায় ইউক্রেনের শহরগুলিও যখন রক্তাক্ত হচ্ছে, তখন একটি বিষয় আরও পরিষ্কার—যুদ্ধের ময়দান যত দূরে সরে যাচ্ছে, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ততটাই অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



