সেনা চাই, গণসমাবেশ নয়!

যা জানা জরুরি
- ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার রুশ সেনা নিহত বা আহত হচ্ছেন।
- বিপরীতে, নতুন করে বাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন দিনে গড়ে প্রায় এক হাজার জন।
- অর্থাৎ, নতুন নিয়োগের সিংহভাগই যাচ্ছে ক্ষয়প্রাপ্ত ইউনিটগুলির শূন্যস্থান পূরণে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার রুশ সেনা নিহত বা আহত হচ্ছেন। বিপরীতে, নতুন করে বাহিনীতে যোগ দিচ্ছেন দিনে গড়ে প্রায় এক হাজার জন। অর্থাৎ, নতুন নিয়োগের সিংহভাগই যাচ্ছে ক্ষয়প্রাপ্ত ইউনিটগুলির শূন্যস্থান পূরণে। যুদ্ধের সামনের সারিতে নতুন শক্তি যোগ করার মতো অতিরিক্ত বাহিনী তৈরি হচ্ছে না।
প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলা যুদ্ধের এই হিসাবই এখন ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য বড় মাথাব্যথা। রাশিয়ার ঘরে ঘরে, কর্মক্ষেত্রে এবং টেলিগ্রাম গোষ্ঠীতে তাই ঘুরছে একটাই প্রশ্ন—পুতিন কি ফের গণসমাবেশের পথে হাঁটবেন?
২০২২-এর স্মৃতি এখনও তাজা
২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে যুদ্ধক্ষেত্রে একের পর এক ধাক্কার পর রাশিয়া তিন লক্ষ সংরক্ষিত সেনাকে ডেকে পাঠিয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তে দেশে প্রবল অস্থিরতা তৈরি হয়। বহু তরুণ সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে যান, বিমানবন্দরগুলিতে ভিড় জমে এবং পুতিন সরকারের উপরও চাপ বাড়ে।
সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণেই দ্বিতীয় দফার গণসমাবেশ ঘোষণা করতে এখনও অনিচ্ছুক ক্রেমলিন।
তার বদলে চলছে অন্য কৌশল—উচ্চ বেতন, বিপুল যোগদান-অনুদান এবং যুদ্ধে মৃত্যু হলে পরিবারের জন্য মোটা ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগ।
মস্কোর দাবি, ২০২২ সালের পর থেকে প্রায় ১৩ লক্ষ চুক্তিভিত্তিক সেনা সংগ্রহ করা হয়েছে। বিশেষ করে দরিদ্র অঞ্চলের মানুষের কাছে এই অর্থের প্রলোভন যথেষ্ট বড়। কোথাও যোগদানের অনুদান ও বেতন মিলিয়ে কয়েক বছরের স্থানীয় আয়ের সমান অর্থ পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু সেই টোপেও এখন আর আগের মতো কাজ হচ্ছে না।
মানবাধিকারকর্মী আলেক্সেই তাবালভের মতে, “অস্বাভাবিক পরিমাণ টাকা দিয়েও যুদ্ধে যেতে ইচ্ছুক মানুষ খুঁজে পাওয়া এখন অনেক কঠিন।”
টাকা দিয়েও মিলছে না সেনা
পশ্চিমি হিসাব অনুযায়ী, রুশ বাহিনীতে নিহত ও আহতের সংখ্যা মাসে ৩০ হাজারের বেশি। ছোট ছোট দলকে বারবার যুদ্ধের সম্মুখভাগে পাঠানোর ক্ষয়যুদ্ধের কৌশলই এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ।
জার্মান ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্সের বিশেষজ্ঞ ইয়ানিস ক্লুগের হিসাবে, রাশিয়া এখন দিনে প্রায় এক হাজার সেনা নিয়োগ করছে। অর্থাৎ নিয়োগের গতি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ক্ষয়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
যত সেনা আসছে, প্রায় ততটাই হারিয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে নতুন করে কয়েক লক্ষ মানুষকে একসঙ্গে ডাকার সিদ্ধান্ত সামরিক দিক থেকে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে তা পুতিনের জন্য বড় ঝুঁকি।
‘গণসমাবেশ হবে না’—তবু ভয় কাটছে না
রুশ শীর্ষকর্তারা অবশ্য দ্বিতীয় গণসমাবেশের সম্ভাবনা অস্বীকার করেছেন। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ এমন খবরকে ইউক্রেনের ছড়ানো ‘মিথ্যা প্ররোচনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। মস্কোর নীতিনির্ধারণী মহলের সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরাও জানিয়েছেন, পুতিন এখনও এমন কোনও সিদ্ধান্ত নেননি। পশ্চিমি আধিকারিকদের কাছেও তেমন কোনও নিশ্চিত ইঙ্গিত নেই।
তবু রাশিয়ার মানুষের ভয় কাটছে না।
স্থানীয় খেলাধুলার দল, সহকর্মী এবং বন্ধুদের টেলিগ্রাম গোষ্ঠীতে সম্ভাব্য সেনা-ডাক এড়ানোর উপায়, প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র এবং দেশ ছাড়ার পথ নিয়ে আলোচনা চলছে। কারও কারও ধারণা, সেপ্টেম্বরে দুমা নির্বাচন শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি বদলাতে পারে।
ভয়ই হয়ে উঠছে নিয়োগের হাতিয়ার
মানবাধিকারকর্মীদের অভিযোগ, সম্ভাব্য গণসমাবেশের আতঙ্ককেই এখন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
পুরুষদের বলা হচ্ছে—গণসমাবেশ হলে নিজের পছন্দের সুযোগ থাকবে না; তার চেয়ে এখনই চুক্তি সই করে টাকা নেওয়া ভালো।
কোথাও পুলিশ রাস্তা বা কর্মক্ষেত্র থেকে পুরুষদের তুলে নিয়ে নিয়োগকেন্দ্রে হাজির করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রতারণা, ভয় দেখানো, মামলা দেওয়ার হুমকি এমনকি মারধরের অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষ নজর পড়ছে ঋণগ্রস্ত, মামলায় অভিযুক্ত কিংবা সামাজিকভাবে দুর্বল মানুষদের উপর। দক্ষিণের পেনজা অঞ্চলে আত্মীয়দের প্রতিবাদের মধ্যেই পুরুষদের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য সমাজমাধ্যমে ছড়িয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে মামলা ও নির্যাতনের ভয় দেখিয়ে চুক্তিতে সই করানোর অভিযোগও উঠেছে।
এবার বিশ্ববিদ্যালয়েও নজর
সেনা সংগ্রহের পরিধিও বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি কলেজ এবং বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলিকে নতুন ড্রোন ইউনিটের জন্য ছাত্র সংগ্রহে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।
পুতিন সম্প্রতি এমন একটি আইনেও সই করেছেন, যার ফলে গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত আরও বেশি সংখ্যক বন্দি সেনাবাহিনীর সঙ্গে চুক্তি করার সুযোগ পেতে পারেন।
অর্থাৎ, সেনা জোগাড়ের পথ যতটা সম্ভব বিস্তৃত করছে মস্কো—শুধু প্রকাশ্যে গণসমাবেশের ঘোষণা না দিয়েই।
দায়টা ঠেলে দেওয়া হয়েছে অঞ্চলের ঘাড়ে
নতুন সেনা সংগ্রহের বড় অংশের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আঞ্চলিক গভর্নর ও স্থানীয় প্রশাসনের উপর। মস্কো শুধু লক্ষ্য বেঁধে দিচ্ছে; সেই লক্ষ্য পূরণের দায় স্থানীয় কর্তাদের।
ফলে ক্রেমলিন সরাসরি জনরোষের মুখে পড়ছে না। বরং স্থানীয় প্রশাসনকেই বাড়ি বাড়ি, কর্মক্ষেত্রে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের চাপ সামলাতে হচ্ছে।
এই ব্যবস্থাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আলাদা এক নিয়োগ-ব্যবসাও।
কাউকে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে রাজি করাতে পারলে দালাল, এমনকি সাধারণ নাগরিকও অর্থ পাচ্ছেন। কোথাও চালু হয়েছে ‘বন্ধুকে নিয়ে আসুন’ ধরনের প্রকল্প। স্বাধীন রুশ সংবাদমাধ্যম আইস্টোরিজের হিসাবে, এমন প্রকল্প চালুর পর বিভিন্ন অঞ্চল নিয়োগকারীদের অন্তত ৭৭০ কোটি রুবল দিয়েছে।
এক নিয়োগকারী জানিয়েছেন, তাঁর সংস্থাকে প্রতি মাসে ২০ থেকে ৩০ জন নতুন সেনা জোগাড়ের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। লক্ষ্য ছাড়ালে পুরস্কার, ব্যর্থ হলে শাস্তি। তাঁর স্বীকারোক্তি—গত বছর কাজটি তুলনায় সহজ ছিল, এখন মানুষ পাওয়া ক্রমেই কঠিন হচ্ছে।
আসল ভয় যুদ্ধ নয়, জনরোষ?
দ্বিতীয় গণসমাবেশ তাই পুতিনের কাছে শুধু সামরিক সিদ্ধান্ত নয়, রাজনৈতিক দুঃস্বপ্নও।
সাম্প্রতিক জনমত সমীক্ষায় ইউক্রেন অভিযান সঠিক পথে এগোচ্ছে বলে মনে করা রুশ নাগরিকের হার ২০২২ সালের এপ্রিলের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। এই অবস্থায় জোর করে আরও কয়েক লক্ষ মানুষকে যুদ্ধে পাঠালে এত দিন চাপা থাকা অসন্তোষ প্রকাশ্যে চলে আসার আশঙ্কা রয়েছে।
তাই আপাতত ক্রেমলিনের কৌশল—বেশি টাকা, বেশি প্রশাসনিক চাপ এবং যতটা সম্ভব নীরব জবরদস্তি।
কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা ক্ষয়ের গতি যদি একই থাকে, এই কৌশল কত দিন টিকবে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সামনে তখন পুতিনের বিকল্পও কমে আসবে—আরও একটি বড় গণসমাবেশ, নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে বেছে নিয়ে সেনা-ডাক, বর্তমানে প্রশিক্ষণরত বাধ্যতামূলক সেনাদের যুদ্ধে পাঠানো, অথবা নিঃশব্দে সংরক্ষিত বাহিনী সক্রিয় করা।
পুতিন জানেন, দ্বিতীয় গণসমাবেশের রাজনৈতিক মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে। তাই তিনি এখনও সেটি এড়িয়ে চলতে চাইছেন।
কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে যদি প্রতি মাসে হাজার হাজার সেনা ঝরে পড়ে, আর নতুন নিয়োগ সেই ক্ষত ঢাকতেই ব্যস্ত থাকে, তাহলে একসময় সিদ্ধান্তটি আর শুধু পুতিনের পছন্দের বিষয় থাকবে না।
যুদ্ধের হিসাব যদি ক্রেমলিনকে কোণঠাসা করে, গণসমাবেশের দরজা হয়তো শেষ পর্যন্ত খুলতেই হবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



