বছরের শেষে কয়েক দশকের প্রবলতম এল নিনোর আশঙ্কা, ভারতের বৃষ্টি ও কৃষিতে কী প্রভাব পড়তে পারে

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রশান্ত মহাসাগরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হতে পারে।
- আমেরিকার ন্যাশনাল ওশ্যানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ‘নোয়া’-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর গোলার্ধের আসন্ন শীতে একটি প্রবল এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ।
- আরও উদ্বেগজনক হল, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই এল নিনোর তীব্রতা ১৯৫০ সালের পরবর্তী সমস্ত নজির ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৬৯ শতাংশ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: চলতি বছরের শেষ নাগাদ প্রশান্ত মহাসাগরে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হতে পারে। আমেরিকার ন্যাশনাল ওশ্যানিক অ্যান্ড অ্যাটমস্ফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ‘নোয়া’-র পূর্বাভাস অনুযায়ী, উত্তর গোলার্ধের আসন্ন শীতে একটি প্রবল এল নিনো সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশ। আরও উদ্বেগজনক হল, অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই এল নিনোর তীব্রতা ১৯৫০ সালের পরবর্তী সমস্ত নজির ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ৬৯ শতাংশ।
ভারতের ক্ষেত্রে এল নিনো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। অতীতে বহু এল নিনো-বছরে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু দুর্বল হয়েছে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে। তবে এল নিনো দেখা দিলেই ভারতে খরা হবে, এমন সরল সমীকরণ নেই। ভারতীয় বর্ষা প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা ছাড়াও ভারত মহাসাগরের পরিস্থিতি, বায়ুপ্রবাহ, তুষারপাত, আরব সাগরের তাপমাত্রা এবং আঞ্চলিক নিম্নচাপের মতো একাধিক বিষয়ের উপর নির্ভর করে।
এল নিনো কী
এল নিনো–সাদার্ন অসিলেশন বা এনসো হল ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা এবং বায়ুমণ্ডলীয় চাপের স্বাভাবিক ওঠানামা। এর তিনটি পর্যায়—এল নিনো, নিরপেক্ষ অবস্থা এবং লা নিনা। মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা নির্দিষ্ট সীমার চেয়ে দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে এল নিনো ঘোষণা করা হয়।
এল নিনোর সময়ে প্রশান্ত মহাসাগরের উপর দিয়ে প্রবাহিত বাণিজ্যবায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে। উষ্ণ জল পূর্ব দিকে সরে যায় এবং সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডলের স্বাভাবিক তাপবিন্যাস বদলে যায়। তার প্রভাব শুধু প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও খরার প্রকৃতিও বদলে যেতে পারে।
নোয়া জানিয়েছে, জুলাই মাসে এল নিনো আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসে তার তীব্রতা বাড়তে পারে। সংস্থাটির মতে, এল নিনো যত প্রবল হবে, তার সঙ্গে সাধারণত সম্পর্কিত আবহাওয়াগত প্রভাবগুলি বাস্তবে দেখা দেওয়ার সম্ভাবনাও তত বাড়বে।
চলতি বর্ষায় কতটা প্রভাব
ভারতে ১ জুন থেকে ১৩ আগস্ট পর্যন্ত ৪৯১.৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে, যা স্বাভাবিকের তুলনায় ১২ শতাংশ কম। জুন মাসে ঘাটতি ছিল ৩৫.৪ শতাংশ। জুলাইয়ে বৃষ্টি মোটামুটি স্বাভাবিকের কাছাকাছি এলেও সামগ্রিক ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ হয়নি। ভারতীয় আবহাওয়া দফতর আগস্ট এবং বর্ষার অবশিষ্ট সময়েও স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়েছে।
তা সত্ত্বেও আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, চলতি বর্ষা এখনও সরাসরি এল নিনোর প্রভাবে পড়েনি। এর অন্যতম কারণ সময়ের ব্যবধান। প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনোর পরিবর্তন ভারত মহাসাগর এবং ভারতের কাছাকাছি অঞ্চলের আবহাওয়ায় প্রতিফলিত হতে সাধারণত ৪০ থেকে ৪৫ দিন লাগে। সেই প্রভাব স্পষ্ট হওয়ার সময় দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু তার সরকারি প্রত্যাহারের তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বরের কাছাকাছি পৌঁছে যাবে।
ফলে এ বছরের বর্ষার শেষ ভাগে কিছু প্রভাব পড়তে পারে, কিন্তু পুরো বর্ষাকে এল নিনো নিয়ন্ত্রণ করবে—এমন সিদ্ধান্তে এখনই পৌঁছনো ঠিক নয়। বরং বছরের শেষ দিকে তাপমাত্রা, শীতকালীন বৃষ্টি এবং পরবর্তী কৃষি মরসুমে এর প্রভাবের দিকে নজর থাকবে।
রক্ষাকবচ হতে পারে ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু
ভারতের পক্ষে কিছুটা স্বস্তির কারণ হতে পারে ভারত মহাসাগরীয় দ্বিমেরু বা আইওডি। এটি ভারত মহাসাগরের পশ্চিম ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পার্থক্যের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়। আইওডি বর্তমানে নিরপেক্ষ অবস্থায় থাকলেও বর্ষার শেষ দিকে তা ইতিবাচক হতে পারে বলে আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস।
ইতিবাচক আইওডি তৈরি হলে পশ্চিম ভারত মহাসাগর তুলনামূলক উষ্ণ হয়ে ভারতের দিকে আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ বাড়াতে পারে। অতীতে কিছু ক্ষেত্রে এটি এল নিনোর বিরূপ প্রভাব আংশিকভাবে সামলেছে। তবে সম্ভাব্য এল নিনো যদি সত্যিই ঐতিহাসিক শক্তি অর্জন করে, আইওডি কতটা প্রতিরোধ গড়তে পারবে, তা এখনই নিশ্চিত নয়।
কৃষি, খাদ্যমূল্য ও জলভাণ্ডার নিয়ে উদ্বেগ
কম বৃষ্টি হলে ধান, ডাল, তৈলবীজ, আখ ও তুলোর মতো খরিফ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অসম বৃষ্টিবণ্টনও বড় সমস্যা—দেশের মোট বৃষ্টির পরিমাণ খুব কম না হলেও কোনও অঞ্চলে অতিবৃষ্টি এবং অন্য অঞ্চলে দীর্ঘ অনাবৃষ্টি কৃষির ক্ষতি করতে পারে। এর ফল খাদ্যপণ্যের দাম, গ্রামীণ আয় এবং মূল্যস্ফীতির উপর পড়ার আশঙ্কা থাকে।
বর্ষার ঘাটতিতে জলাধার, ভূগর্ভস্থ জল এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদনও চাপের মুখে পড়তে পারে। বছরের শেষে প্রবল এল নিনো স্থায়ী হলে পরবর্তী গ্রীষ্মে তাপপ্রবাহের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। তাই শুধু জাতীয় বৃষ্টির গড় নয়, অঞ্চলভিত্তিক বৃষ্টি, আইওডি-র গতিপ্রকৃতি এবং প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা—সব ক’টি সূচকের উপরই নজর রাখা জরুরি।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



