নদী শুকোল, নিউক্লিয়ার বন্ধ

যা জানা জরুরি
- তীব্র খরা আর লাগাতার দাবদাহে দানিয়ুব নদীর জলস্তর নেমেছে রেকর্ড নিচে।
- আর তার জেরেই দেশের শেষ সচল পরমাণু চুল্লিটিও বন্ধ করতে বাধ্য হল রোমানিয়া।
- বৃহস্পতিবার চেরনাভোদা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় চুল্লিটি নিয়ন্ত্রিত ভাবে বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদক সংস্থা নিউক্লিয়ারইলেকট্রিকা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
তীব্র খরা আর লাগাতার দাবদাহে দানিয়ুব নদীর জলস্তর নেমেছে রেকর্ড নিচে। আর তার জেরেই দেশের শেষ সচল পরমাণু চুল্লিটিও বন্ধ করতে বাধ্য হল রোমানিয়া। বৃহস্পতিবার চেরনাভোদা পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় চুল্লিটি নিয়ন্ত্রিত ভাবে বন্ধ করার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ উৎপাদক সংস্থা নিউক্লিয়ারইলেকট্রিকা। এর আগে জুলাইয়ের শেষেই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল কেন্দ্রটির প্রথম চুল্লি। ফলে আপাতত রোমানিয়ায় পরমাণু শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন পুরোপুরি থমকে গেল।
রোমানিয়ার একমাত্র পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র চেরনাভোদায় ৭০৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দু’টি চুল্লি রয়েছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ২০ শতাংশ মেটায় এই কেন্দ্র। চুল্লি ঠান্ডা রাখতে বিপুল পরিমাণ জল প্রয়োজন হয়, যার মূল উৎস দানিয়ুব। কিন্তু কয়েক সপ্তাহের ভয়াবহ তাপপ্রবাহ এবং প্রায় বৃষ্টিহীন আবহাওয়ায় নদীর জলস্তর এতটাই নেমে যায় যে নিরাপদে কেন্দ্র চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত মরিয়া চেষ্টা চালিয়েছিল কর্তৃপক্ষ। দানিয়ুবের জল কেন্দ্রের দিকে ঘোরানোর চেষ্টা হয়েছে, নদীর গতিপথে বাধা হয়ে থাকা পাথর বিস্ফোরণে সরানো হয়েছে, অস্থায়ী বাঁধ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমনকি জলপ্রবাহ বদলাতে পুরনো বার্জ ডুবিয়ে দেওয়ার মতো নজিরবিহীন ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোনও চেষ্টাতেই প্রয়োজনীয় জলস্তর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষের দাবি, চুল্লিটি পরিকল্পিত ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতেই বন্ধ করা হচ্ছে। তাই পরমাণু নিরাপত্তা নিয়ে কোনও ঝুঁকি তৈরি হয়নি। তবে বিদ্যুৎ সরবরাহে এর প্রভাব যথেষ্ট বড়। দুই চুল্লিই বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অগস্টে শক্তি-সঙ্কটকালীন সতর্কতা জারি করেছে রোমানিয়া সরকার। সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়ে পরিবার ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর অনুরোধ করা হয়েছে।
ঘাটতি সামাল দিতে একটি লিগনাইটচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ফের চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি বায়ু ও জলবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বুলগেরিয়া ও ইউক্রেন থেকেও বিদ্যুৎ আমদানির উপর নির্ভরতা বাড়ছে। বিদ্যুতের চাপ কমাতে ডাচিয়া ও ফোর্ডের মতো গাড়ি নির্মাতারাও সাময়িক ভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
এই সঙ্কটের আঁচ পড়তে পারে প্রতিবেশী মলদোভাতেও। দেশটির প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের প্রায় ৬০ শতাংশ পর্যন্ত রোমানিয়া থেকে আসে। রোমানিয়ার সরবরাহ কমে গেলে মলদোভাকে ইউক্রেন বা পশ্চিম ইউরোপ থেকে বেশি দামে বিদ্যুৎ কিনতে হতে পারে। বিকল্প জোগান না মিললে পর্যায়ক্রমিক বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের আশঙ্কাও রয়েছে।
খরার কারণে এর আগেও ২০০৩ সালে চেরনাভোদা কেন্দ্র বন্ধ করতে হয়েছিল। তবে এবারের ঘটনা ইউরোপের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর সামনে আরও বড় প্রশ্ন তুলে দিল। হাঙ্গেরির পাকস পরমাণু কেন্দ্রেও জলস্তর কমে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাপক ভাবে কমাতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে খরা ও তাপপ্রবাহ যদি আরও ঘন ঘন এবং তীব্র হয়, তা হলে নদীর জলের উপর নির্ভরশীল পরমাণু ও জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলিকে দ্রুত বিকল্প শীতলীকরণ ব্যবস্থা ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। কারণ এবার দানিয়ুব শুধু জল কমায়নি—ইউরোপের বিদ্যুৎ নিরাপত্তার দুর্বলতাটাও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



