গ্রেফতারি, প্রার্থী প্রত্যাহার, ভয় দেখানোর অভিযোগ: উপনির্বাচনে চাপে বিরোধীরা

যা জানা জরুরি
- রেজিনগরে পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলে সরাসরি প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত হুমায়ুন কবীরের।
- তার মধ্যেই প্রার্থীপদ প্রত্যাহার, সিদ্ধান্ত বদল এবং তৃণমূলের নাম-প্রতীক নিয়ে টানাপড়েন।
- আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের দুই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগে বিরোধীদের সামনে এখন ভোটের লড়াই চালিয়ে যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী জেলে। রেজিনগরে পুলিশি হয়রানির অভিযোগ তুলে সরাসরি প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত হুমায়ুন কবীরের। তার মধ্যেই প্রার্থীপদ প্রত্যাহার, সিদ্ধান্ত বদল এবং তৃণমূলের নাম-প্রতীক নিয়ে টানাপড়েন। আগামী ৬ অক্টোবর রাজ্যের দুই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনের আগে বিরোধীদের সামনে এখন ভোটের লড়াই চালিয়ে যাওয়াই বড় চ্যালেঞ্জ। বিজেপির পাল্টা দাবি, পরাজয় বুঝতে পেরেই অজুহাত খুঁজছে বিরোধীরা।
দুই কেন্দ্রেই উপনির্বাচন হচ্ছে জয়ী বিধায়কের একটি করে আসন ছেড়ে দেওয়ায়। শুভেন্দু নন্দীগ্রাম ও ভবানীপুরে জিতে ভবানীপুর রাখেন। অন্যদিকে, নওদা ও রেজিনগরে জয়ী হুমায়ুন রাখেন নওদা। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে বিজেপির সামনে এটাই প্রথম নির্বাচনী পরীক্ষা। সরকার বদলের পর বিরোধীরা কতটা সংগঠিত হতে পারছে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে এই ভোটে।
নন্দীগ্রামে ঘটনার সূত্রপাত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে-র সরে দাঁড়ানোকে ঘিরে। প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের আগের দিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। পরে মমতা ঘোষণা করেন, তাঁর দল কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করবে। সঞ্চিতাকে ভয় দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। তবে তাঁর দাবি, কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত আগেই নেওয়া হয়েছিল। বৃহত্তর বিরোধী ঐক্য ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের শরিকদের সম্পর্ক মজবুত করতেই এই পদক্ষেপ। সঞ্চিতা নিজেই প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন বলেও জানিয়েছেন তৃণমূল নেত্রী।
মমতা জানান, সমর্থনের সিদ্ধান্ত তাঁদের একতরফা; কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা করে কোনও আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয়নি। কিন্তু সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই, ১৮ সেপ্টেম্বর, গ্রেফতার হন মিলন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলি ২০০৭ সালের নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের সময়কার।
পূর্ব মেদিনীপুর পুলিশের বক্তব্য, নন্দীগ্রাম ও খেজুরি থানার মামলায় মিলনের বিরুদ্ধে চারটি জামিন অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে খুন, খুনের চেষ্টা, খুনের উদ্দেশ্যে অপহরণ, প্রমাণ লোপাট এবং অস্ত্র নিয়ে দাঙ্গা। পুলিশের দাবি, তিনি উনিশ বছর ধরে আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে চলছিলেন; অভিযোগপত্রেও তাঁকে পলাতক দেখানো হয়েছে। ভোটের আগে দীর্ঘদিনের বকেয়া পরোয়ানা কার্যকর করার নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনেই গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মিলনের আইনজীবী অবশ্য পুলিশের ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর বক্তব্য, পুরনো মামলাগুলি প্রত্যাহৃত হওয়ার পরে সেগুলি ফের চালুর আবেদন হয়েছিল হাইকোর্টে। মামলার সম্পূর্ণ বিবরণ ও অভিযোগপত্র তাঁদের দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ তাঁর। প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার জানিয়েছেন, প্রার্থী জেলে থাকলেও দল লড়াই ছাড়বে না। মিলনের হয়ে কর্মীরাই প্রচারে নামবেন। শুভঙ্করের বক্তব্য, ভোটাররা প্রচারে প্রার্থীকে দেখতে না পেলেও কংগ্রেসের প্রতীক দেখতে পাবেন। ব্যক্তির অনুপস্থিতি দলের প্রচার বন্ধ করতে পারবে না বলেই তাঁর দাবি।
এর মধ্যেই আইনি সুরক্ষা চেয়ে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মিলন। সোমবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তাঁর আইনজীবী। পাঁচটি মামলায় গ্রেফতার-সহ কঠোর পদক্ষেপ থেকে সুরক্ষা এবং তাঁর বিরুদ্ধে আরও পরোয়ানা রয়েছে কি না, তা জানানোর আর্জি জানানো হয়েছে। মঙ্গলবার সেই আবেদনের শুনানি হওয়ার কথা। তাঁর আইনজীবী আদালতকে জানান, শনিবার খেজুরি পুলিশ আরও একটি মামলার পরোয়ানা জমা দিয়েছে। রবিবার নন্দীগ্রাম পুলিশও আর একটি পরোয়ানা দিয়েছে। ফলে একটি মামলায় স্বস্তি মিললেও অন্য মামলায় আটকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
প্রথমে হলদিয়ার আদালত তাঁকে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত জেল হেফাজতে পাঠিয়েছিল। সোমবার খেজুরি থানার আর একটি পুরনো মামলায় কাঁথির আদালত ৫ অক্টোবর পর্যন্ত হেফাজতের নির্দেশ দেয়। অথচ ভোট ৬ অক্টোবর, প্রচার শেষ ৪ অক্টোবর। আইনজীবীর বক্তব্য, এই অবস্থায় প্রার্থীর নিজের কেন্দ্রে প্রচারের সুযোগ কার্যত শেষ হয়ে যাচ্ছে। কাঁথির আদালতের নির্দেশও হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করার কথা জানিয়েছেন তাঁর আইনজীবী।
রেজিনগরে আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রধান হুমায়ুন কবীরের অভিযোগ, তাঁর দলের নেতা-কর্মীদের বেছে বেছে হয়রানি ও গ্রেফতার করছে পুলিশ। ওই কেন্দ্রে তাঁর ছেলে গোলাম নবী আজাদ প্রার্থী। কবীর জানিয়েছেন, কর্মীদের আরও গ্রেফতারি ও হয়রানি এড়াতে তিনি সরাসরি প্রচারে নামবেন না; ছেলেকেও নামতে দেবেন না। সমাজমাধ্যমেই ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবেন। তবে নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা বলেননি তিনি।
ফেসবুকে প্রতিদিন এলাকার পরিস্থিতি এবং দলের বক্তব্য তুলে ধরার পরিকল্পনা জানিয়েছেন কবীর। পুলিশের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও নিজের অভিযোগের সমর্থনে নির্দিষ্ট প্রমাণ তিনি পেশ করেননি বলে এক্সপ্রেসের বাংলা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর নির্দল প্রার্থী সাইফুল ইসলামকে ২০২১ সালের নির্বাচনী সংঘর্ষের মামলায় গ্রেফতার করা হয়।
কবীরকে জিজ্ঞাসাবাদের নেপথ্যে রয়েছে একটি ছড়িয়ে পড়া কথোপকথনের রেকর্ড। পুলিশের দাবি, মুর্শিদাবাদে নির্মীয়মাণ বাবরি মসজিদের আদলে মসজিদ চত্বরে নজরদারি ক্যামেরা বন্ধ করে বিজেপির পতাকা লাগিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরির আলোচনা রয়েছে তাতে। ওই তদন্তেই সোমবার বহরমপুর থানায় হাজির হন কবীর।
রেজিনগরে মমতা শিবিরের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীও প্রথমে সরে দাঁড়ানোর কথা জানিয়েছিলেন। দলীয় সমস্যা এবং নতুন ‘ফুটবল খেলোয়াড়’ প্রতীক নিয়ে সংশয় ছিল তাঁর। মমতা ও নেতৃত্বের হস্তক্ষেপে পরে সিদ্ধান্ত বদলান। তৃণমূলের দুই শিবিরের বিরোধের জেরে নির্বাচন কমিশন পুরনো নাম ও জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার স্থগিত রেখেছে। মমতার শিবির পেয়েছে ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম; প্রতিদ্বন্দ্বী শিবির ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম ও খাম প্রতীক। কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছেন মমতা।
বিজেপি অবশ্য চাপ সৃষ্টির অভিযোগ অস্বীকার করছে। রেজিনগরের প্রার্থী শাখরাভ সরকারের দাবি, শিল্প, কর্মসংস্থান, কলেজ ও সেতু তৈরির কথাই বলছেন তিনি। মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের বক্তব্য, হার নিশ্চিত বুঝে কবীর অজুহাত দিচ্ছেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বিরোধীদের সাংগঠনিক দুরবস্থা নিয়ে কটাক্ষ করলেও বলেছেন, কার্যকর বিরোধী শক্তির অনুপস্থিতি গণতন্ত্রের পক্ষে কাম্য নয়। দুই কেন্দ্রের ফল ঘোষণা ৯ অক্টোবর।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



