বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে নতুন শিল্পনীতি তৈরির কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলেও জমি সংগ্রহের প্রশ্নে কঠিন ভারসাম্যের মুখে পড়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এক দিকে বড় শিল্পের জন্য এক লপ্তে জমির ব্যবস্থা করার দাবি জানাচ্ছেন শিল্পপতিরা। অন্য দিকে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের অভিজ্ঞতার পর কৃষিজমি অধিগ্রহণের পথে হাঁটা রাজনৈতিক ভাবে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা-ও বিলক্ষণ জানে সরকার। ফলে শিল্পায়নের প্রয়োজন এবং জমির মালিকদের স্বার্থ—দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর পথ খুঁজছে নবান্ন।
প্রস্তাবিত শিল্পনীতি নিয়ে মঙ্গলবার কলকাতায় শিল্প ও বণিক সংগঠনগুলির প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করে রাজ্য সরকার। শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পমন্ত্রী স্বপন দেবনাথ এবং সরকারের শীর্ষ আধিকারিকেরা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। শিল্পমহলের পরামর্শ নিয়ে খসড়া নীতিটি প্রথমে মন্ত্রীগোষ্ঠীর কাছে এবং পরে রাজ্য মন্ত্রিসভার অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। অগস্টের মধ্যেই নতুন নীতি ঘোষণা করার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। আলোচনার কেন্দ্রে ছিল জমির সহজলভ্যতা, অনুমোদনের সময়সীমা, পরিকাঠামো এবং শিল্পে সরকারি উৎসাহভাতা।
শিল্পপতিদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গে জমির মালিকানা অত্যন্ত খণ্ডিত। বড় কারখানার জন্য কয়েকশো একর জমি প্রয়োজন হলে কোনও বেসরকারি সংস্থাকে বহু মালিকের সঙ্গে আলাদা ভাবে দর-কষাকষি করতে হয়। কোনও একটি জমির মালিক বিক্রি করতে রাজি না হলে গোটা প্রকল্প আটকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ, জমির চরিত্র পরিবর্তন এবং বিভিন্ন দফতরের অনুমোদন পেতেও দীর্ঘ সময় লাগে। তাই সরকারের সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া বৃহৎ উৎপাদন শিল্প আনা কঠিন বলে শিল্পমহল জানিয়েছে।
ক্ষমতায় আসার পরে সরকার জানিয়েছিল, শিল্পের জন্য জমি জোগানোর ক্ষেত্রে আগের সরকারের সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় অবস্থান থেকে তারা সরে আসবে। তবে সরাসরি বাধ্যতামূলক অধিগ্রহণ নয়, জমির মালিকদের কাছ থেকে আলোচনার ভিত্তিতে সরাসরি জমি কেনার কথাই বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। সরকার প্রয়োজনীয় জমি কিনে সংশ্লিষ্ট শিল্পসংস্থাকে হস্তান্তর করতে পারে। এর ফলে শিল্পপতিকে প্রত্যেক জমিমালিকের সঙ্গে আলাদা ভাবে আলোচনা করতে হবে না। শুভেন্দু ইতিমধ্যেই ঘোষণা করেছেন, অন্তত ২৫টি শিল্পপ্রকল্পকে এক মাসের মধ্যে জমি দেওয়া হবে এবং বিনিয়োগের অনুমোদনের জন্য এক-জানালা ব্যবস্থা চালু করা হবে।
কিন্তু এখানেই সরকারের রাজনৈতিক সমস্যা। নন্দীগ্রামে প্রস্তাবিত রাসায়নিক শিল্পাঞ্চলের জন্য জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন শুভেন্দু নিজেই। সেই আন্দোলন এবং সিঙ্গুরে টাটা মোটরসের জমি অধিগ্রহণ-বিরোধী লড়াই বামফ্রন্ট সরকারের পতনের পথ তৈরি করেছিল। এখন শিল্পের স্বার্থে সরকার জমি কিনতে নামলে বিরোধীরা অতীতের সেই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে বিজেপির বিরুদ্ধে দ্বিচারিতার অভিযোগ আনতে পারে।
এই ঝুঁকি এড়াতে জমি একত্রীকরণের বিকল্প ব্যবস্থাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত জানিয়েছেন, বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট জমিকে একত্র করে শিল্পোপযোগী বড় জমিখণ্ড তৈরির ব্যবস্থা বিবেচনায় রয়েছে। এই পদ্ধতিতে জমির মালিকেরা সম্পূর্ণ ভাবে জমির অধিকার হারাবেন না; প্রকল্প গড়ে ওঠার পরে উন্নত জমির একটি অংশ কিংবা আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। অন্ধ্রপ্রদেশের অমরাবতী, গুজরাত, মহারাষ্ট্র, পঞ্জাব ও কেরলে এই ধরনের ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে পশ্চিমবঙ্গে তা চালু করতে নতুন আইন প্রয়োজন হতে পারে। জমির নথির স্বচ্ছতা, ক্ষতিপূরণের নির্দিষ্ট নিয়ম এবং কার্যকর অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থার উপর এই প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করবে।
সরকার আরও বেশি সংখ্যায় শিল্পতালুক তৈরির কথা ভাবছে। বেসরকারি নির্মাতারা সেখানে জমি একত্র করে রাস্তা, বিদ্যুৎ, জল ও নিকাশি-সহ প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গড়ে তুলবেন। শিল্পসংস্থাগুলিকে তৈরি জমি দেওয়া হবে। পাশাপাশি বন্ধ ও রুগ্ণ কারখানার অব্যবহৃত জমি পুনরুদ্ধার করে নতুন শিল্পে ব্যবহারের পরিকল্পনাও রয়েছে। ভূতথ্য-নির্ভর জমি ভাণ্ডার তৈরি হলে বিনিয়োগকারীরা কোথায় কত জমি পাওয়া যাবে, তা আগেই জানতে পারবেন।
নতুন নীতিতে সরকারি উৎসাহভাতার মাপকাঠিও বদলাতে পারে। শুধু বিনিয়োগের অঙ্ক নয়, একটি প্রকল্প কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, তার ভিত্তিতে সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছেন শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষিভিত্তিক উৎপাদন, বস্ত্র, চামড়া, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, বৈদ্যুতিন সামগ্রী এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতে পারে।
শিল্পমহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, নীতির অভাবের চেয়েও বড় সমস্যা প্রশাসনিক বিলম্ব ও অনিশ্চয়তা। তাই জমির পাশাপাশি দ্রুত অনুমোদন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত যোগাযোগ, দক্ষ শ্রমিক এবং স্থানীয় স্তরে তোলাবাজি বন্ধ করাও নতুন সরকারের পরীক্ষা। শিল্পের জন্য জমি জোগাতে পারলে শুভেন্দু সরকার বিনিয়োগের দরজা খুলতে পারে। কিন্তু কৃষকের আস্থা হারালে সেই উদ্যোগই রাজনৈতিক সঙ্কট ডেকে আনতে পারে। নতুন শিল্পনীতির সবচেয়ে কঠিন কাজ তাই শুধু জমি সংগ্রহ নয়—সম্মতি, স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে শিল্পায়নের গ্রহণযোগ্য পথ তৈরি করা।