কিউবার রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় তাঁর কোনও বড় পদ নেই। তিনি মন্ত্রী নন, কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষনেতাও নন। সরকারি পরিচয়ে তিনি মূলত প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোর দেহরক্ষী ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী। অথচ ওয়াশিংটন-হাভানার সাম্প্রতিক গোপন যোগাযোগে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছেন রাউলের নাতি রাউল গিয়ের্মো রদ্রিগেস কাস্ত্রো।
তাই প্রশ্নটা এখন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে—ফিদেল ও রাউলের পর কিউবার ক্ষমতার কেন্দ্রে কি ফের জায়গা করে নিতে চলেছে কাস্ত্রো পরিবার?
৪২ বছরের রদ্রিগেস কাস্ত্রো কিউবায় পরিচিত ‘এল কাংরেহো’ বা ‘কাঁকড়া’ নামে। জন্মগত ভাবে তাঁর ডান হাতে অতিরিক্ত একটি আঙুল থাকায় এই ডাকনাম। কিন্তু তাঁর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের চেয়ে এখন বেশি আলোচনায় তাঁর ক্ষমতার পরিধি।
তিনি রাউল কাস্ত্রোর বড় মেয়ে দেবোরা কাস্ত্রো এসপিনের ছেলে। তাঁর বাবা প্রয়াত জেনারেল লুইস আলবের্তো রদ্রিগেস লোপেস-কায়েহা ছিলেন কিউবার সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত বিশাল ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ‘গায়েসা’র প্রধান। পর্যটন, হোটেল, খুচরো ব্যবসা, বৈদেশিক মুদ্রা এবং আমদানি-রফতানির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই গোষ্ঠীর প্রভাব রয়েছে।
অর্থাৎ, মায়ের দিক থেকে বিপ্লবী কাস্ত্রো পরিবারের উত্তরাধিকার, বাবার দিক থেকে সামরিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ—দুই দিকই তাঁর।
দাদুর দেহরক্ষী, নাকি ক্ষমতার দরজার চাবি?
২০১৬ সালে রদ্রিগেস কাস্ত্রোকে রাউল কাস্ত্রোর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বিশেষ বিভাগের প্রধান করা হয়। নামটি শুনলে কাজটা নিছক দেহরক্ষীর মনে হতে পারে। বাস্তবে তাঁর ভূমিকা ছিল অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
রাউলের কাছে কে পৌঁছবেন, কোন বার্তা তাঁর কাছে যাবে এবং প্রবীণ নেতার নির্দেশ কার কাছে পৌঁছবে—এই যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ছিলেন তাঁর নাতি।
সোজা কথায়, রাউল কাস্ত্রোর কাছে যাওয়ার দরজার পাহারাদারই শুধু ছিলেন না, সেই দরজার চাবিও তাঁর হাতে ছিল।
আর সেই প্রভাবই এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির নজরে।
রুবিয়ো থেকে র্যাটক্লিফ—আমেরিকার সঙ্গে গোপন যোগাযোগ
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে রদ্রিগেস কাস্ত্রোর যোগাযোগ তাঁর অবস্থানকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ক্যারিবীয় দেশগুলির একটি সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিয়োর সঙ্গে তাঁর গোপন বৈঠক হয়েছিল বলে একাধিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়। পরে সিআইএ-র অধিকর্তা জন র্যাটক্লিফও হাভানায় গিয়ে কিউবার কয়েক জন শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তার পাশাপাশি রদ্রিগেস কাস্ত্রোর সঙ্গে বৈঠক করেন।
আলোচনায় উঠে আসে নিরাপত্তা সহযোগিতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ওয়াশিংটন-হাভানার সম্পর্কের ভবিষ্যৎ।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ, মে মাসে রাউল কাস্ত্রো ও তাঁর পরিবারের কয়েক জন সদস্যের বিরুদ্ধে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারি হলেও রদ্রিগেস কাস্ত্রোর নাম সেই তালিকায় ছিল না।
এই ব্যতিক্রমই জল্পনা আরও উসকে দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের একাংশের ধারণা, ট্রাম্প প্রশাসন হয়তো তাঁকে ভবিষ্যতের কোনও সমঝোতার সম্ভাব্য মুখ হিসেবে খোলা রাখতে চাইছে।
জুলাইয়ে এক সাক্ষাৎকারে রদ্রিগেস কাস্ত্রো নিজেও জানান, সুযোগ তৈরি হলে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনায় বসতে তাঁর আপত্তি নেই। এমনকি উপযুক্ত পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তির সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেননি।
দিয়াস-কানেল আছেন, কিন্তু ছায়া রাউলের
কিউবার বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াস-কানেলের মেয়াদ এখনও শেষ হয়নি। কিন্তু দেশের বাস্তব পরিস্থিতি তাঁর সরকারের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বিদ্যুৎ-সংকট, জ্বালানি ও খাদ্যের ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং বিপুল সংখ্যক মানুষের দেশত্যাগে জনঅসন্তোষ বাড়ছে। অন্যদিকে ৯৫ বছর বয়সি রাউল কাস্ত্রো এখনও পর্দার আড়ালে কিউবার অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি বলে মনে করা হয়।
এই পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন যদি সরকারি নেতৃত্বের পাশাপাশি রাউলের নাতির সঙ্গেও সরাসরি যোগাযোগ রাখে, তা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এর অর্থ এমনও হতে পারে—কিউবার ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে কোথায় আসল প্রভাব রয়েছে, আমেরিকা সেটি খুব ভালো করেই জানে।
তবে ‘উত্তরাধিকারী’ হিসেবে তাঁকে ঘিরে বিতর্কও কম নয়
রদ্রিগেস কাস্ত্রোর উত্থান অবশ্য বিতর্কমুক্ত নয়। কিউবার সাধারণ মানুষ যখন খাদ্য, ওষুধ ও বিদ্যুতের সংকটে ভুগছেন, তখন কাস্ত্রো পরিবারের সদস্যদের বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ রয়েছে। রদ্রিগেস কাস্ত্রোর বিরুদ্ধেও বিশেষ সুবিধা ভোগের অভিযোগ উঠেছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ এসেছে মেক্সিকোর কিন্তানা রু-তে সক্রিয় একটি কিউবান মানবপাচার চক্রের তদন্তে। সাজাপ্রাপ্ত এক ব্যক্তির বক্তব্যে তাঁর নাম উঠে এসেছে বলে সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। ওই চক্রের বিরুদ্ধে কিউবা থেকে মেক্সিকো হয়ে আমেরিকায় মানুষ পাচার, অপহরণ, নৌযান চুরি ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, রদ্রিগেস কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে এই অভিযোগে কোনও দণ্ডাদেশ হয়নি। কিউবা সরকারও অভিযোগগুলিকে অপপ্রচার বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
‘রাজনীতিতে আগ্রহ নেই’—তবু নজর তাঁর দিকেই
রদ্রিগেস কাস্ত্রো নিজে অবশ্য প্রকাশ্যে দাবি করেছেন, রাজনীতিতে তাঁর আগ্রহ নেই।
কিন্তু কিউবার ইতিহাসে ক্ষমতার গল্প সব সময় সরকারি পদ দিয়ে লেখা হয়নি। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক, পারিবারিক আস্থা, রাষ্ট্রীয় ব্যবসার উপর নিয়ন্ত্রণ এবং শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে সরাসরি পৌঁছনোর ক্ষমতা—অনেক সময় এগুলিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
তাই এখনই তাঁকে কিউবার পরবর্তী নেতা বলে ঘোষণা করার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তিনি হয়তো শুধুই দাদুর বিশ্বস্ত দূত। হয়তো ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাব্য মধ্যস্থতাকারী। আবার কিউবার পুরনো ব্যবস্থাকে কিছুটা বদলে টিকিয়ে রাখার জন্য কাস্ত্রো পরিবারের পছন্দের উত্তরসূরিও হয়ে উঠতে পারেন।
নিশ্চিত উত্তর এখনও নেই।
তবে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট—১৯৫৯ সালের বিপ্লবের প্রায় সাত দশক পরেও কিউবার ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা উঠলেই কাস্ত্রো পরিবারের ছায়া সরছে না। আর এ বার সেই ছায়ার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দাদুর একসময়ের দেহরক্ষী—যিনি এখন ওয়াশিংটনের সঙ্গেও কথা বলছেন।