বেজিং: ঘূর্ণিঝড় ডলফিন দুর্বল হয়ে ক্রান্তীয় নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিপদ কাটেনি। পূর্ব চিনে তাণ্ডব চালানোর পর স্থলভাগের আরও গভীরে ঢুকে বিপুল জলীয় বাষ্প টেনে আনছে এই ঝড়। তার জেরেই বেজিং-সহ উত্তর ও মধ্য চিনের বিস্তীর্ণ এলাকায় চলছে প্রবল থেকে অতিপ্রবল বৃষ্টি। আকস্মিক বন্যা, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি এবং পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কায় শুরু হয়েছে বড়সড় সরানোর অভিযান।
রাজধানী বেজিংয়ে জারি হয়েছে কমলা সতর্কতা। আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস, কোথাও কোথাও ২৪ ঘণ্টায় ১৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হতে পারে। কয়েকটি জেলায় সেই পরিমাণ ২০০ মিলিমিটারও ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ, এক দিনেই শহরের বার্ষিক গড় বৃষ্টির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ঝরে পড়ার আশঙ্কা।
ইতিমধ্যেই শুনই জেলায় জলমগ্ন রাস্তায় আটকে পড়েছে গাড়ি ও বাস। সেখানে এক ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৮৮.৫ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছে।
বন্যা পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজধানীর চারটি জেলায় সর্বোচ্চ স্তরের জরুরি ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। পশ্চিম বেজিংয়ের পাহাড়ি মেনতৌগৌ জেলায় জারি হয়েছে সর্বোচ্চ বন্যা সতর্কতা। বাসিন্দাদের ঘরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নদীর ধারের এলাকা, নিচু বসতি এবং নির্মাণস্থল থেকে প্রায় ১,৮০০ জনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বৃদ্ধাবাসগুলি থেকেও পাঁচ হাজারের বেশি প্রবীণকে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
প্রস্তুত রাখা হয়েছে ২৫০টিরও বেশি বন্যা মোকাবিলা দল। পাতালরেল, হাসপাতাল, বৃদ্ধাবাস এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামো রক্ষায় নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। বন্ধ রাখা হয়েছে বহু পর্যটনকেন্দ্র। অন্তত ২৫০টি বাসপথে পরিষেবা স্থগিত হয়েছে, কয়েকটি রেলপথে কমানো হয়েছে ট্রেনের গতি। অপ্রয়োজনীয় যাতায়াত এড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে প্রশাসন।
বেজিংয়ের পাশাপাশি তিয়ানজিন ও আশপাশের এলাকাতেও জরুরি মোকাবিলা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে চিনের জলসম্পদ মন্ত্রক।
পূর্ব উপকূলে ঝড়, এখন বৃষ্টির দাপট
ডলফিন চলতি বছরে চিনে আঘাত হানা সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। প্রায় ৬,০০০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে রবিবার ঝেজিয়াং প্রদেশের উপকূলে আছড়ে পড়ে এটি। তখন ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ঘণ্টায় প্রায় ১৫১ কিলোমিটার।
ঝড় আছড়ে পড়ার আগেই ঝেজিয়াং, ফুজিয়ান ও সাংহাই-সহ পূর্ব চিনের বিভিন্ন এলাকা থেকে ১০ লক্ষের বেশি মানুষকে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সাংহাইয়ের পুদং ও হংকিয়াও বিমানবন্দরে বাতিল করা হয় বহু উড়ান। বন্ধ রাখা হয় ফেরি ও প্রমোদতরীর পরিষেবা। শত শত জলযানকে সরিয়ে নেওয়া হয় নিরাপদ আশ্রয়ে।
স্থলভাগে ঢোকার পর ডলফিনের শক্তি কমেছে ঠিকই, কিন্তু ঝড়ের সঙ্গে আসা বিপুল জলীয় বাষ্প এখন পরিণত হয়েছে নতুন বিপদে—অতিবৃষ্টিতে।
মধ্য চিনেও বাড়ছে উদ্বেগ
হুবেই প্রদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। শিয়াংইয়াং-সহ বিভিন্ন এলাকায় বন্যা ও ভূমিধসের আশঙ্কায় প্রায় ১০ হাজার মানুষকে সরানো হয়েছে। নিরাপত্তার কারণে ২৬টি ঝুঁকিপূর্ণ নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হয়েছে। থ্রি গর্জেস বাঁধের পর্যটনকেন্দ্রও সাময়িক ভাবে বন্ধ।
প্রদেশের ৩৫টি জলাধারে জল নিরাপদ সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
প্রতিবেশী হেনানে জারি হয়েছে সর্বোচ্চ লাল বৃষ্টি সতর্কতা। কোথাও কোথাও ৩৫০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টির পূর্বাভাস রয়েছে। উগাং ও শিয়াংইয়াংয়ে যথাক্রমে ২০৯.৫ এবং ১৬৯.১ মিলিমিটার বৃষ্টি ইতিমধ্যেই রেকর্ড হয়েছে—আগস্টে এক দিনে বৃষ্টির নতুন নজির।
হেবেই প্রদেশের ২,১০০-র বেশি ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কায় উদ্ধারকারী দলগুলির জন্য পাঠানো হয়েছে কৃত্রিম উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগ সরঞ্জাম।
ঝড় দুর্বল, বিপদ কেন নয়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উষ্ণ সমুদ্র থেকে ঘূর্ণিঝড় বেশি জলীয় বাষ্প শুষে নিতে পারছে। ফলে স্থলভাগে ঢুকে ঝড়ের গতিবেগ কমে গেলেও তার সঙ্গে থাকা আর্দ্রতা দীর্ঘ সময় ধরে প্রবল বৃষ্টির জন্ম দিতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তন এবং এল নিনোর প্রভাবে এমন চরম আবহাওয়ার তীব্রতা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।
তাই ডলফিনের ঝড় থেমে গেলেও চিনের বিপদ এখনও কাটেনি। বেজিং প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—অল্প সময়ে নামা বিপুল বৃষ্টির চাপ শহরের নিকাশি ব্যবস্থা কতটা সামলাতে পারবে, আর পাহাড়ি এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধস কতটা ঠেকানো যাবে।