International

আকাশে চিনের ‘তৃতীয় শক্তি’

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • এ বার আন্তর্জাতিক রুটে পা রাখতে চলেছে চিনের তৈরি সি৯১৯।
  • বুধবার রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা এয়ার চায়নার হাত ধরে বেজিং থেকে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরে উড়বে বিমানটি।
  • এটাই কোনও বিদেশি দেশে সি৯১৯-এর প্রথম নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বেজিং: এত দিন দেশের আকাশেই সীমাবদ্ধ ছিল। এ বার আন্তর্জাতিক রুটে পা রাখতে চলেছে চিনের তৈরি সি৯১৯। বুধবার রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান সংস্থা এয়ার চায়নার হাত ধরে বেজিং থেকে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরে উড়বে বিমানটি। এটাই কোনও বিদেশি দেশে সি৯১৯-এর প্রথম নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা। আর এই উড়ানকে ঘিরেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে—চিন কি শেষ পর্যন্ত বোয়িং ও এয়ারবাসের একচেটিয়া আধিপত্যে ভাগ বসাতে পারবে?

১২ আগস্ট থেকে বেজিং ক্যাপিটাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ও উলানবাটোরের মধ্যে প্রতিদিন চলবে সি৯১৯। চিনের বিমানশিল্পের কাছে এটি নিছক একটি নতুন আন্তর্জাতিক রুট নয়। বরং দেশীয় বিমান নির্মাণ শিল্পকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে ধরার কৌশলগত পদক্ষেপ।

চিনের রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান নির্মাতা কমার্শিয়াল এয়ারক্র্যাফট কর্পোরেশন অব চায়না (কোম্যাক)-এর তৈরি সি৯১৯ হল দুই ইঞ্জিনের সরু কাঠামোর মাঝারি পাল্লার যাত্রিবাহী বিমান। আসনবিন্যাস অনুযায়ী এতে প্রায় ১৫৮ থেকে ১৯২ জন যাত্রী বসতে পারেন। ফলে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বী বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স এবং এয়ারবাস এ৩২০নিও।

কোম্যাকের পরিকল্পনা অবশ্য এক লাফে ইউরোপ বা আমেরিকার বাজার দখল করা নয়। প্রথমে চিনের বিপুল অভ্যন্তরীণ বাজারে শক্ত ভিত তৈরি করে দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বাজারে প্রবেশ করতে চায় তারা। তার পর লক্ষ্য বৃহত্তর আন্তর্জাতিক বাজার।

দীর্ঘ পরীক্ষার পর আন্তর্জাতিক আকাশে

সি৯১৯ প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল ২০০৮ সালে। প্রথম পরীক্ষামূলক উড়ান হয় ২০১৭ সালের মে মাসে। দীর্ঘ পরীক্ষা, নানা প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ এবং একাধিক বিলম্বের পরে ২০২২ সালে চিনের অসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পায় বিমানটি।

এর পর ২০২৩ সালের মে মাসে চায়না ইস্টার্ন এয়ারলাইন্স সাংহাই থেকে বেজিং পর্যন্ত সি৯১৯-এর প্রথম বাণিজ্যিক যাত্রা পরিচালনা করে। পরে এয়ার চায়না ও চায়না সাদার্নও বিমানটি নিজেদের বহরে যুক্ত করে।

বিদেশের আকাশ অবশ্য সি৯১৯-এর কাছে একেবারে নতুন নয়। ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরের বিমান প্রদর্শনীতে উড়ান প্রদর্শন করেছে এটি। একই বছর হংকং থেকে সাংহাইয়ের মধ্যে বিশেষ যাত্রিবাহী পরিষেবাও চালানো হয়। ২০২৫ সাল থেকে হংকংয়ের সঙ্গে নিয়মিত পরিষেবাতেও সি৯১৯ ব্যবহার করা হচ্ছে।

তবে উলানবাটোরের উড়ানই প্রথম বার কোনও বিদেশি রাষ্ট্রে নির্ধারিত নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিষেবা। সেই কারণেই বুধবারের উড়ানকে চিনের আন্তর্জাতিক বিমানবাজারে প্রকৃত প্রবেশের সূচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘চিনের তৈরি’—কতটা সত্যি?

এখানেই রয়েছে বড় প্রশ্ন। সি৯১৯-এর নকশা ও চূড়ান্ত সংযোজন চিনে হলেও বিমানটির বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও যন্ত্রাংশ আসে পশ্চিমি সংস্থার কাছ থেকে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ইঞ্জিন। সি৯১৯-এ ব্যবহৃত এলইএপি-১সি ইঞ্জিন তৈরি করেছে আমেরিকার জিই অ্যারোস্পেস এবং ফ্রান্সের সাফরানের যৌথ সংস্থা সিএফএম ইন্টারন্যাশনাল।

ফলে আমেরিকা-চিন বাণিজ্যিক সম্পর্কের অবনতি হলে কিংবা প্রযুক্তি রফতানিতে নতুন নিষেধাজ্ঞা জারি হলে সি৯১৯-এর উৎপাদনও চাপের মুখে পড়তে পারে। অর্থাৎ বিমানশিল্পে স্বনির্ভরতার পথে চিন এগোলেও এখনও পুরোপুরি বিদেশি প্রযুক্তির উপর নির্ভরতা কাটাতে পারেনি।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

কোম্যাকের সামনে আরও বড় বাধা হল আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশন। সি৯১৯ এখনও আমেরিকার ফেডারেল অ্যাভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তা সংস্থার অনুমোদন পায়নি।

ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, সি৯১৯-কে ইউরোপীয় স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ হতে আরও তিন থেকে ছয় বছর সময় লাগতে পারে। এই অনুমোদন ছাড়া ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার অধিকাংশ বিমান সংস্থার পক্ষে সি৯১৯ কেনা বা নিয়মিত পরিষেবায় ব্যবহার করা কার্যত কঠিন।

উৎপাদনের গতিও এখনও বোয়িং বা এয়ারবাসের ধারেকাছে নয়। কোম্যাকের দাবি, সি৯১৯-এর জন্য এক হাজারের বেশি আগ্রহপত্র ও ক্রয়াদেশ রয়েছে। তবে তার বড় অংশই চিনা বিমান সংস্থা এবং বিমান ইজারাদাতা সংস্থাগুলির কাছ থেকে এসেছে।

বিশ্ববাজারে জায়গা করে নিতে হলে তাই শুধু বিমান তৈরি করলেই হবে না। দ্রুত উৎপাদন বাড়ানো, সময়মতো যন্ত্রাংশ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিভিন্ন দেশে শক্তিশালী পরিষেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে কোম্যাককে।

বোয়িং-এয়ারবাসকে হারানো কি সম্ভব?

অদূর ভবিষ্যতে সরাসরি বোয়িং ও এয়ারবাসকে টক্কর দেওয়া সি৯১৯-এর পক্ষে কঠিন বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। একটি নতুন বিমান নির্মাতার কাছ থেকে বিমান কেনার আগে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি নিরাপত্তা, দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্যতা, জ্বালানি সাশ্রয় এবং বিক্রয়োত্তর পরিষেবার বহু বছরের তথ্য খতিয়ে দেখে।

এই জায়গাতেই কোম্যাক এখনও পিছিয়ে। বোয়িং ও এয়ারবাসের দশকের পর দশক ধরে তৈরি বিশ্বব্যাপী পরিষেবা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকাঠামোর সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সহজ নয়।

তবে চিনের হাতে রয়েছে একটি বড় সুবিধা—বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। দেশের বিমান সংস্থাগুলির চাহিদার একটা বড় অংশ সি৯১৯ দিয়ে পূরণ করতে পারলে বিদেশি নির্মাতাদের উপর নির্ভরতা কমানো সম্ভব। পাশাপাশি মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মতো তুলনামূলক কাছের বাজারে ঢুকে আন্তর্জাতিক পরিষেবার অভিজ্ঞতাও তৈরি করতে চাইছে কোম্যাক।

তাই বেজিং-উলানবাটোরের বুধবারের উড়ানকে শুধু একটি নতুন আন্তর্জাতিক রুট হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি চিনের বিমানশিল্পে স্বনির্ভর হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক—এবং দীর্ঘমেয়াদে বোয়িং ও এয়ারবাসের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রথম বড় পদক্ষেপ।

সি৯১৯ শেষ পর্যন্ত আকাশে ‘তৃতীয় শক্তি’ হয়ে উঠবে কি না, তার উত্তর এখনই নেই। তবে উলানবাটোরের পথে প্রথম নিয়মিত বিদেশযাত্রা সেই লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রথম উড়ান।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles