বাংলাস্ফিয়ার: ভারতীয় শিল্পপতি গৌতম আদানির বিরুদ্ধে চলা বহুচর্চিত ফৌজদারি মামলা স্থায়ীভাবে খারিজ করে দিল আমেরিকার একটি আদালত। নিউইয়র্কের ব্রুকলিনে আমেরিকার পূর্বাঞ্চলীয় জেলা আদালতের বিচারক নিকোলাস গারাউফিস বিচার দফতরের আবেদন মেনে আদানি, তাঁর ভাইপো সাগর আদানি এবং আদানি গ্রিন এনার্জির শীর্ষকর্তা বিনীত জৈনের বিরুদ্ধে আনা গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগগুলি বাতিল করেছেন। ‘উইথ প্রেজুডিস’ বা স্থায়ীভাবে মামলা খারিজ হওয়ায় একই অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা শুরু করা যাবে না। প্রায় দু’বছর ধরে চলা আইনি অনিশ্চয়তার অবসান ঘটায় এই সিদ্ধান্তকে আদানি গোষ্ঠীর বড় জয় হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

তবে আদালতের নির্দেশকে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে আদানিদের নির্দোষ ঘোষণার সমতুল বলে মনে করা ঠিক হবে না। বিচারক স্পষ্ট করেছেন, মামলা খারিজের অর্থ এই নয় যে তিনি বিচার দফতরের সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত অথবা অভিযোগগুলির গুণাগুণ সম্পর্কে কোনও মতামত দিয়েছেন। বিচার দফতর আর মামলা চালাতে না চাওয়ায় এবং সেই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে আদালতের ক্ষমতা সীমিত হওয়ায় তিনি আবেদন মঞ্জুর করেছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদন⁠ অনুযায়ী, মামলা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়ায় কিছু “উদ্বেগজনক অনিয়ম” ঘটেছে বলেও মন্তব্য করেছেন বিচারক।

২০২৪ সালের নভেম্বরে গৌতম আদানি-সহ আট জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র প্রকাশ করেছিল আমেরিকার বিচার দফতর। অভিযোগ ছিল, ভারতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের বরাত এবং বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি পেতে সরকারি আধিকারিকদের প্রায় ২৬ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার ঘুষ দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সেই অভিযোগের কথা গোপন রেখে আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ এবং সংস্থার দুর্নীতিবিরোধী নীতি সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়।

গৌতম আদানি ও তাঁর গোষ্ঠী প্রথম থেকেই যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে। তাদের বক্তব্য ছিল, অভিযোগগুলি ভিত্তিহীন এবং আমেরিকার কোনও সরকারি আধিকারিককে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগও মামলায় নেই। গৌতম আদানি এই মামলায় আমেরিকার আদালতে কখনও সশরীরে হাজির হননি।

ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের অধীনে বিচার দফতর গত মে মাসে জানায়, তারা আর মামলাটি চালাতে চায় না। দফতরের প্রধান সহযোগী উপ-অ্যাটর্নি জেনারেল ট্রেন্ট ম্যাককটার আদালতকে জানান, ঘটনাটি মূলত ভারতকেন্দ্রিক, অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন এবং মামলাটি বর্তমান প্রশাসনের আইন প্রয়োগের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর দাবি, বাস্তবে বিচার পর্যন্ত পৌঁছনোর সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও আগের প্রশাসনের শেষ পর্যায়ে অভিযুক্তদের জনসমক্ষে হেয় করার উদ্দেশ্যে মামলাটি আনা হয়েছিল।

কিন্তু বিচারক গারাউফিস বিচার দফতরের প্রাথমিক ব্যাখ্যাকে অস্পষ্ট এবং অপর্যাপ্ত বলে মনে করেছিলেন। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ২০২৪ সালে আমেরিকায় এক হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগের যে প্রতিশ্রুতি গৌতম আদানি দিয়েছিলেন, তার সঙ্গে মামলা প্রত্যাহারের কোনও সম্পর্ক ছিল কি না। আদানি শপথপত্র দিয়ে জানান, মামলার বিনিময়ে কোনও চুক্তি বা প্রতিদানের বিষয়ে তিনি অবগত নন। বিচার দফতরও দাবি করে, বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেনি। বিচারক শেষ পর্যন্ত এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেছেন।

তার পরেও বিচার দফতরের সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। বিচারকের মতে, ম্যাককটার তদন্তকারী আধিকারিক এবং মামলাটির সঙ্গে যুক্ত সরকারি আইনজীবীদের পেশাগত মতামত যথাযথভাবে না নিয়ে আদানিদের আইনজীবীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অসংখ্য সরকারি আধিকারিকের মতামতের জায়গায় এক জন কর্তার ব্যক্তিগত বিবেচনা স্থান পাওয়া উদ্বেগজনক বলে তাঁর পর্যবেক্ষণ।

আদানিদের আইনজীবীরা বিনিয়োগের প্রস্তাবকে সমঝোতার অংশ হিসেবে একাধিকবার উল্লেখ করেছিলেন বলেও আদালতের নথিতে উঠে এসেছে। এর ফলে ন্যায়বিচারের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে মানুষের ধারণার উপর কী প্রভাব পড়তে পারে, তা জনগণই বিচার করবে বলে মন্তব্য করেছেন গারাউফিস।

রায়কে স্বাগত জানিয়ে গৌতম আদানি বলেছেন, বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা এবং বিনয়ের সঙ্গে তিনি সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করছেন। কঠিন সময়েও সত্য, ন্যায্যতা ও আইনের শাসনের প্রতি তাঁর বিশ্বাস অটুট ছিল বলে দাবি করেছেন তিনি।

এই নির্দেশে আদানি, সাগর আদানি ও বিনীত জৈনের বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ প্রতারণা, তার ষড়যন্ত্র এবং তারযোগে প্রতারণার ষড়যন্ত্রসংক্রান্ত ফৌজদারি অভিযোগের অবসান ঘটেছে। তবে মামলার অন্য পাঁচ অভিযুক্তের বিরুদ্ধে থাকা কয়েকটি অভিযোগ একই সঙ্গে খারিজ করেননি বিচারক। সেগুলি প্রত্যাহারের পক্ষে আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে বিচার দফতরকে বলা হয়েছে। ফলে আদানির ব্যক্তিগত আইনি বিপদ আপাতত শেষ হলেও গোটা মামলার সমস্ত অধ্যায় এখনও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।