অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে ইতিহাস গড়লেন ভারতের বাসন্ত ও শাহনওয়াজ। আমেরিকায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় হাই জাম্পে রুপো জিতেছেন বাসন্ত, আর লং জাম্পে ব্রোঞ্জ পেয়েছেন শাহনওয়াজ। একই বিশ্বমঞ্চে ভারতের দুই জাম্পারের পদক জয় দেশের অ্যাথলেটিক্সে নতুন অধ্যায় যোগ করল।
এই দুই পদকের সঙ্গে জ্যাভলিনে আশিস যাদবের রুপো যোগ হওয়ায় এবারের প্রতিযোগিতায় ভারতের পদকসংখ্যা দাঁড়াল তিন। এর ফলে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে নিজেদের সর্বোচ্চ পদক জয়ের নজির স্পর্শ করল ভারত। এর আগে ২০২১ ও ২০২২ সালের আসরেও তিনটি করে পদক জিতেছিল ভারত।
প্রাক্তন জাতীয় রেকর্ডধারী সাহানা কুমারীর কাছে প্রশিক্ষণ নেওয়া বাসন্ত হাই জাম্পের ফাইনালে ২.২১ মিটার উচ্চতা পার করেন। নিজের ব্যক্তিগত সেরা পারফরম্যান্স স্পর্শ করলেও কাউন্টব্যাকে আলজেরিয়ার ইউনেস আয়াচির কাছে সোনা হারাতে হয় তাঁকে।
বাসন্তের সাফল্যে উচ্ছ্বসিত সাহানা বলেন, ‘‘ওর এবং দেশের জন্য এটা বিরাট মুহূর্ত। আমি সব সময়ই জানতাম, বড় মঞ্চে বাসন্ত নিজেকে প্রমাণ করবে।’’
ভারতীয় নৌবাহিনীর পেটি অফিসার বাসন্ত সাম্প্রতিক সময়ে সাহানার প্রশিক্ষণে দ্রুত উন্নতি করেছেন। বছরের গোড়ায় জুনিয়র ফেডারেশন কাপে তাঁর উন্নতির প্রথম বড় প্রমাণ পাওয়া যায়। সাহানার কথায়, ‘‘জুনিয়র ফেডারেশন কাপে যখন ও ২.২১ মিটার লাফাল, তখনই বুঝেছিলাম ওর বিরাট উন্নতি হয়েছে। আমার কাছে যখন প্রথম অনুশীলন শুরু করেছিল, তখন ও ২.১১ মিটার লাফাত।’’
২০২৬ মরসুমটা দুর্দান্ত যাচ্ছে বাসন্তের। অনূর্ধ্ব-২০ এশীয় অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপেও সোনা জিতেছেন তিনি। রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরের অনুপগড় গ্রামের বাসিন্দা বাসন্ত এখন ভারতের প্রতিশ্রুতিমান হাই জাম্পারদের নতুন প্রজন্মের অন্যতম মুখ। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ, ডায়মন্ড লিগ এবং কমনওয়েলথ গেমসে সর্বেশ কুশারের সাফল্যের পরে ভারতীয় হাই জাম্পে যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, বাসন্ত সেই ধারাকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
অন্য দিকে, লং জাম্পে শাহনওয়াজের কাছে প্রত্যাশা ছিল আরও বেশি। চলতি মরসুমে ৮.৩০ মিটার লাফিয়ে ব্যক্তিগত সেরা গড়েছিলেন তিনি। ফলে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে তাঁকে অন্যতম খেতাবের দাবিদার হিসেবেই দেখা হচ্ছিল। কিন্তু ফাইনালে পেশিতে টান এবং গোড়ালির চোট তাঁর সমস্যা বাড়ায়। শেষ পর্যন্ত ৭.৮৭ মিটার লাফিয়ে ব্রোঞ্জ জেতেন তিনি।
শাহনওয়াজ বলেন, ‘‘আমার প্রথম ও দ্বিতীয় লাফ ভালই হয়েছিল। কিন্তু তৃতীয় লাফের পরে পেশিতে টান ধরতে শুরু করে, সঙ্গে গোড়ালিতেও চোট পাই। সেটাই প্রধান সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। আমি এখানে ব্যক্তিগত সেরা ফল করার লক্ষ্য নিয়েই এসেছিলাম, কারণ খুব ভাল ছন্দে ছিলাম।’’
উত্তরপ্রদেশের প্রতাপগড়ের শাহনওয়াজ এ মরসুমে ভারতের অন্যতম চমক। তিরুঅনন্তপুরমের ন্যাশনাল সেন্টার অব এক্সেলেন্সে মুরলী শ্রীশঙ্করের সঙ্গে অনুশীলন করেন তিনি। ভুবনেশ্বরে আন্তঃরাজ্য জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে ৮.৩০ মিটার লাফিয়ে নজর কেড়েছিলেন।
বিশ্ব অনূর্ধ্ব-২০ চ্যাম্পিয়নশিপে নিজের প্রত্যাশিত দূরত্বে পৌঁছতে না পারলেও মাত্র ১৯ বছর বয়সে বিশ্বমঞ্চে ব্রোঞ্জ তাঁর কেরিয়ারের বড় অর্জন। শাহনওয়াজ বলেন, ‘‘আজ আমার মাথায় একটাই কথা ছিল—যে ভাবেই হোক পোডিয়ামে থাকতে হবে এবং ভারতের জন্য পদক জিততে হবে। এটা আমার কাছে অত্যন্ত গর্বের মুহূর্ত। দেশের জন্য পদক জেতার সুযোগটা হাতছাড়া করিনি, সেটাই সবচেয়ে আনন্দের।’’
শাহনওয়াজের এই উত্থানের পিছনে রয়েছে ব্যক্তিগত বেদনার এক কাহিনিও। গত বছর ভুবনেশ্বরে একটি বিশ্ব কন্টিনেন্টাল ব্রোঞ্জ প্রতিযোগিতায় প্রথম বার আট মিটারের সীমা অতিক্রম করার পরে তিনি প্রয়াত বাবা নাসিমুদ্দিনকে স্মরণ করেছিলেন। নিজের বিবে লিখেছিলেন, ‘‘৮+ জাম্প, আই মিস ড্যাড।’’ ২০১৮ সালে অসুস্থতায় তাঁর বাবা মারা যান। গ্রামের মধ্যে যাত্রী পরিবহণের জন্য জিপ চালাতেন নাসিমুদ্দিন। শাহনওয়াজ বলেছিলেন, বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই তিনি ওই কথাগুলি লিখেছিলেন।
ভারতের লং জাম্পে এখন প্রতিযোগিতাও ক্রমশ বাড়ছে। দু’বারের কমনওয়েলথ গেমস পদকজয়ী মুরলী শ্রীশঙ্কর গত মাসেই বলেছিলেন, সামগ্রিক ভাবে ভারতীয় লং জাম্পারদের জন্য সম্ভবত এটাই সেরা বছর। তরুণদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়ছে এবং তাঁরা একে অপরকে আরও ভাল করার দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
শাহনওয়াজ সম্পর্কে শ্রীশঙ্করের মূল্যায়ন আরও তাৎপর্যপূর্ণ। তাঁর কথায়, ‘‘ও সব সময় আরও উন্নতি করতে চায়। অনুশীলনে অসম্ভব পরিশ্রম করে। ওর কাজের প্রতি নিষ্ঠা দেখলেই বোঝা যায়, এই ছেলেটা কত দূর যেতে পারে।’’
বাসন্তের রুপো ও শাহনওয়াজের ব্রোঞ্জ তাই শুধু দু’টি পদক নয়। ভারতীয় অ্যাথলেটিক্সের জাম্প বিভাগে নতুন প্রজন্ম যে দ্রুত আন্তর্জাতিক মানের কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে, আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে একই সঙ্গে দুই ভারতীয়ের পোডিয়ামে ওঠা তারই বড় প্রমাণ।