দেশপ্রেম, রাজনীতি আর সমাজমাধ্যমের কটাক্ষ—এই তিন ইস্যুতেই এ বার নিজের অবস্থান স্পষ্ট করলেন অভিনেতা-পরিচালক আর মাধবন। তাঁর ছবি ‘রকেট্রি: দ্য নাম্বি এফেক্ট’ থেকে সাম্প্রতিক ‘ধুরন্ধর’—দুই ছবিকেই একাংশের দর্শক ও সমালোচক ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে কটাক্ষ করেছেন। সেই সমালোচনার জবাবে মাধবনের পাল্টা প্রশ্ন, “ভারতীয় হওয়াকে কী করে ভুল বা অন্যায় বলে দেখা যেতে পারে?”
গালাট্টা প্লাসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাধবন বলেন, প্রত্যেক মানুষই তাঁর বেড়ে ওঠা, পরিবার এবং চারপাশের পরিবেশের ফসল। ছোটবেলা থেকেই তাঁকে শেখানো হয়েছে, নিজের দেশ এবং দেশের জন্য একজন মানুষ কী করছেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ।
মাধবনের দাবি, তাঁর সমাজমাধ্যমের পোস্ট বা সাক্ষাৎকার দেখলেই বোঝা যাবে, তিনি কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতার বিরুদ্ধে কখনও কটাক্ষ করেননি। বরং কেউ ভাল কিছু করলে তিনি প্রকাশ্যেই প্রশংসা করেন। উদাহরণ হিসেবে তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনের নামও উল্লেখ করেছেন তিনি।
‘নির্বাচিত সরকারকে সমর্থন করা কর্তব্য’
নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মাধবন বলেন, তিনি ইচ্ছাকৃত ভাবেই ইতিবাচক বিষয় নিয়ে কথা বলেন। কোনও বিষয়ে নিশ্চিত না হলে প্রকাশ্যে মন্তব্য না করাই তাঁর নীতি।
তাঁর বক্তব্য, “কোনও নির্বাচিত রাজনীতিক যখন প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী হন, তখন তাঁকে সমর্থন করা আমার কর্তব্য বলে মনে করি।”
একই সঙ্গে তাঁর দাবি, এখনও পর্যন্ত কোনও রাজনৈতিক দল—তামিলনাড়ুর হোক বা জাতীয় স্তরের—তাঁকে প্রচারে অংশ নেওয়ার জন্য বলেনি কিংবা দলে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণও জানায়নি।
সমাজমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে নানা মন্তব্য বা কটাক্ষও নিজের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে না বলে জানিয়েছেন অভিনেতা। তাঁর মতে, অনেক সময় এই ধরনের মন্তব্য আসলে মানুষের হতাশা বা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
কোনও ভারতীয় খেলোয়াড় আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভাল ফল করলে দেশের সম্মান বাড়ে—আর সেই কারণেই তাঁকে নিয়ে পোস্ট করা মাধবনের কাছে একেবারেই স্বাভাবিক। কেউ যদি সেই জন্য তাঁকে অপরাধবোধে ভোগানোর চেষ্টা করেন, বরং সেই ব্যক্তির উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন তুলবেন তিনি।
‘অতিরিক্ত ভারতীয়’ মানে কী?
‘ধুরন্ধর’ এবং মাধবনের পরিচালনায় তৈরি ‘রকেট্রি: দ্য নাম্বি এফেক্ট’ নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গও ওঠে সাক্ষাৎকারে।
‘ধুরন্ধর’-কে একাংশ যেমন ‘প্রোপাগান্ডা’ বলে আখ্যা দিয়েছে, তেমনই ২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রকেট্রি’-র বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল—ছবিতে ভারতীয় পরিচয়, দেশপ্রেম এবং ঐতিহ্যের উপর অতিরিক্ত জোর দেওয়া হয়েছে।
এই যুক্তি মানতে নারাজ মাধবন। তাঁর পাল্টা প্রশ্ন, “ভারতীয় হওয়াকে কী করে ভুল বলে দেখা যেতে পারে? ‘অতিরিক্ত ভারতীয়’ হওয়ার অর্থই বা কী?”
তাঁর দাবি, নিজের দেশের ভাল দিক তুলে ধরার সঙ্গে কোনও রাজনৈতিক প্রচারের সম্পর্ক থাকা জরুরি নয়।
‘ধুরন্ধর’-এর কাহিনি পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে তৈরি হলেও ছবিতে ভাল-মন্দ দুই ধরনের ঘটনাই দেখানো হয়েছে বলে মনে করেন মাধবন। তাঁর যুক্তি, ভারতেও যেমন ভাল-মন্দ দুই-ই ঘটে, পাকিস্তানেও তেমনটাই ঘটে। তাই শুধু এই কারণে কোনও ছবিকে ‘প্রোপাগান্ডা’ বলা তাঁর কাছে যুক্তিসঙ্গত নয়।
‘রকেট্রি’-তে মন্দিরের দৃশ্য বাদ দেব কেন?
‘রকেট্রি’-র ক্ষেত্রে নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করেছেন মাধবন।
ছবিটি মহাকাশবিজ্ঞানী নাম্বি নারায়ণের জীবনের উপর ভিত্তি করে তৈরি। মাধবনের দাবি, তিনি চরিত্রটির জীবনকে যতটা সম্ভব বাস্তব ভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর প্রশ্ন, “নাম্বি স্যার মন্দিরে যান। আমি যদি তিনি আসলে কেমন মানুষ, সেটাই দেখাতে ভয় পাই, তা হলে তাঁর জীবনের গল্পের প্রতি সৎ থাকব কী করে?”
এর বিপরীতে উদাহরণ দিয়েছেন উদ্ভাবক ও প্রকৌশলী জি ডি নাইডুর। মাধবনের বক্তব্য, নাইডু ছিলেন নাস্তিক। তাই তাঁর জীবন নিয়ে ছবি বানালে তাঁকে মন্দিরে যেতে দেখানোও সঠিক হবে না।
অর্থাৎ চরিত্রের ধর্মবিশ্বাস বা অবিশ্বাস দেখানো আর অভিনেতার নিজের ব্যক্তিগত বিশ্বাস এক বিষয় নয়—এমনটাই মনে করেন মাধবন।
তাঁর কথায়, “আমি একজন অভিনেতা। আমার কাজ হল বিষয়গুলি যেমন, তেমন ভাবেই তুলে ধরা।”
নিজের অবস্থান আরও স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “ভারতের সমস্ত ভাল দিককে আরও সামনে তুলে ধরতে চাই। সেটা অপরাধ হতে পারে না।”
‘বট’ আর আসল অ্যাকাউন্ট চিনবেন কী ভাবে?
সমাজমাধ্যমের সমালোচনার ক্ষেত্রেও মাধবনের নিজস্ব কৌশল রয়েছে। কোনও মন্তব্য সত্যিই কোনও মানুষের মতামত, নাকি কৃত্রিম ভাবে তৈরি বা পরিচালিত—তা বোঝার জন্য কয়েকটি বিষয় দেখতে বলেন তিনি।
প্রথমে দেখতে হবে মন্তব্যটি কে করেছেন। তার পর অ্যাকাউন্টটি কবে তৈরি হয়েছে এবং তার অনুসরণকারীর সংখ্যা কত, সেটিও খতিয়ে দেখা উচিত বলে মনে করেন অভিনেতা।
তাঁর দাবি, এই কয়েকটি তথ্য দেখলেই অনেক ক্ষেত্রে বোঝা যায়, কোনও মন্তব্য প্রকৃত ব্যবহারকারীর কাছ থেকে এসেছে, নাকি সেটি ‘বট’ বা অর্থের বিনিময়ে পরিচালিত কোনও অ্যাকাউন্টের কাজ।
মাধবনকে সম্প্রতি পরিচালক কৃষ্ণকুমার রামকুমারের ‘জিডিএন’ ছবিতে দেখা গিয়েছে। উদ্ভাবক ও প্রকৌশলী জি ডি নাইডুর জীবন অবলম্বনে তৈরি ছবিতে নামভূমিকায় অভিনয় করেছেন তিনি। ছবিতে তাঁর সঙ্গে রয়েছেন সত্যরাজ, জয়রাম, প্রিয়ামণি এবং দুশারা বিজয়ন।
সব বিতর্কের মাঝেও মাধবনের অবস্থান অবশ্য স্পষ্ট—দেশের ভাল দিক নিয়ে কথা বলা, ভারতীয় পরিচয়কে উদ্যাপন করা এবং নিজের দেশকে ভালবাসা তাঁর কাছে কোনও রাজনৈতিক অপরাধ নয়।