হরমুজ এড়িয়ে ভারতে রেল!

যা জানা জরুরি
- আর সেই ঝুঁকি এড়াতে ভারত পর্যন্ত নতুন রেলপথ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে রাশিয়া।
- রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন জানিয়েছেন, ভারত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছতে একটি বিকল্প রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার কথা ভাবা যেতে পারে।
- সম্ভাব্য সেই রেলপথ তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে ভারতে পৌঁছতে পারে।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
হরমুজ প্রণালী ঘিরে বাড়ছে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি। আর সেই ঝুঁকি এড়াতে ভারত পর্যন্ত নতুন রেলপথ তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে রাশিয়া। রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী মারাত খুসনুলিন জানিয়েছেন, ভারত মহাসাগর পর্যন্ত পৌঁছতে একটি বিকল্প রেল যোগাযোগ গড়ে তোলার কথা ভাবা যেতে পারে। সম্ভাব্য সেই রেলপথ তুর্কমেনিস্তান, ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান হয়ে ভারতে পৌঁছতে পারে।
খুসনুলিনের মতে, এমন একটি স্থলপথ তৈরি করা গেলে বসফরাস ও হরমুজ প্রণালীর উপর নির্ভরতা অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। ভারত পর্যন্ত পৌঁছনোর জন্য যে কোনও কার্যকর বিকল্প পথই রাশিয়ার কাছে বিবেচনাযোগ্য বলে জানিয়েছেন তিনি।
রুশ সংবাদ সংস্থা তাসকে খুসনুলিন জানিয়েছেন, রাশিয়ার নির্মাণশিল্পের আরও বিকাশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন প্রয়োজন। তাঁর দাবি, দেশের নির্মাণশিল্প বছরে অতিরিক্ত এক লক্ষ কোটি রুবলের কাজ সামলানোর ক্ষমতা রাখে। আগামী পাঁচ বছর এই অর্থের জোগান নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন ও নির্মাণক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব।
হরমুজে ঝুঁকি, বিকল্প পথে নজর
রাশিয়ার এই রেল পরিকল্পনার কথা এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন আমেরিকা ও ইরানের চলতি সংঘাতকে ঘিরে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
তাসের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২৫ শতাংশ এবং এলএনজি পরিবহণের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের উপর নির্ভরশীল। ফলে হরমুজে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ থেকে বাণিজ্য—সব ক্ষেত্রেই তার বড়সড় প্রভাব পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সমুদ্রপথের বিকল্প হিসেবে স্থলপথের গুরুত্বও বাড়ছে। রাশিয়ার প্রস্তাবিত রেলপথ বাস্তবায়িত হলে মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগের নতুন দরজা খুলতে পারে।
ভারতের সঙ্গে রেল-সহ একাধিক ক্ষেত্রে আলোচনা
এর মধ্যেই ৭ অগস্ট নয়াদিল্লিতে ভারত ও রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র পর্যালোচনা করেছে।
ভারত-রাশিয়া আধুনিকীকরণ ও শিল্প সহযোগিতা সংক্রান্ত কর্মীগোষ্ঠীর দ্বাদশ অধিবেশনে আধুনিকীকরণ, খনি, সার এবং রেল পরিবহণ-সহ একাধিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা হয়।
বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতি সংক্রান্ত ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকারি কমিশনের অধীনে আয়োজিত ওই বৈঠকে রেল পরিবহণে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্রগুলিকে স্বাগত জানায় দুই দেশ। রেল পরিকাঠামো, বন্দে ভারত ট্রেন এবং সিগন্যাল ব্যবস্থার মতো বিষয়েও সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
শুধু রেল নয়, চালকবিহীন আকাশযান, ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তি, রাশিয়ার এসজে-১০০ আঞ্চলিক যাত্রীবাহী বিমান এবং বিমানের ইঞ্জিন উৎপাদন নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে।
রাশিয়ার আন্তর্জাতিক রেল নেটওয়ার্ক কতটা বড়?
রাশিয়ার জাতীয় যাত্রীবাহী রেল সংস্থা ফেডারেল প্যাসেঞ্জার কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ইউরোপ ও এশিয়ার ১৯টি দেশের সঙ্গে রাশিয়ার ৪০টি আন্তর্জাতিক দূরপাল্লার রেল যোগাযোগ রয়েছে।
এই তালিকায় রয়েছে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, পোল্যান্ড, অস্ট্রিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র, লাতভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া, ফিনল্যান্ড, চিন, মঙ্গোলিয়া, উত্তর কোরিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্তান, কিরঘিজস্তান, উজবেকিস্তান, বেলারুশ এবং মলদোভা।
তবে ভারত পর্যন্ত প্রস্তাবিত রেলপথ এখনও বাস্তব প্রকল্প নয়, বরং প্রাথমিক ভাবনার স্তরেই রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে রেল সংযোগ তৈরি করা। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পরিকাঠামোগত ঘাটতি, ভিন্ন রেলগেজ, বিপুল বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তা, নিরাপত্তা এবং জটিল ভূরাজনৈতিক সমীকরণ।
তবু হরমুজ প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে ঝুঁকি যত বাড়ছে, ততই বিকল্প স্থলপথের গুরুত্বও বাড়ছে। সেই কারণেই তুর্কমেনিস্তান-ইরান-আফগানিস্তান-পাকিস্তান হয়ে ভারত পর্যন্ত রেলপথের ভাবনা রাশিয়ার কাছে শুধু পরিবহণের প্রকল্প নয়, ভবিষ্যতের কৌশলগত বিকল্প হিসাবেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



