Home International গাজা-গেরো!

গাজা-গেরো!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
8 views 9 minutes read
A+A-
Reset

ট্রাম্পের পরিকল্পনা মানছেন না নেতানিয়াহু, হামাসের নিরস্ত্রীকরণেই আটকে শান্তির পথ

গাজায় যুদ্ধ থামানোর রাস্তা যেন ফের একই জায়গায় এসে আটকে গেল—বন্দুক আগে নামবে, না সেনা আগে সরবে?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ১৫ দফা গাজা পরিকল্পনার কেন্দ্রে রয়েছে হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ, ধাপে ধাপে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী গাজার জন্য নতুন প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা কাঠামো। কিন্তু ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর অবস্থান স্পষ্ট—হামাস পুরোপুরি অস্ত্র না ছাড়া পর্যন্ত আইডিএফ গাজা ছাড়বে না।

আর এখানেই ট্রাম্পের পরিকল্পনার সঙ্গে ইজরায়েলের অবস্থানের সবচেয়ে বড় সংঘাত।

আগে অস্ত্র, পরে সেনা

ট্রাম্পের দাবি, তাঁর পরিকল্পনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে এবং হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি হতে পারে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় হামাসের অস্ত্র ছাড়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ধাপে ধাপে ইজরায়েলি বাহিনী পিছিয়ে যাওয়ার কথা।

কিন্তু নেতানিয়াহু এই সমান্তরাল প্রক্রিয়ায় রাজি নন।

তাঁর বক্তব্য, ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ বলতে শুধু রকেট বা ভারী অস্ত্র জমা দেওয়া বোঝায় না। ছোট আগ্নেয়াস্ত্র থেকে শুরু করে হামাসের গোটা সামরিক কাঠামো—সব কিছুই ভেঙে দিতে হবে। আর সেই প্রক্রিয়া হতে হবে বাস্তব, সম্পূর্ণ এবং যাচাইযোগ্য।

অর্থাৎ ইজরায়েলের বার্তা একটাই—আগে হামাসের সামরিক শক্তির অবসান, তার পরে সেনা প্রত্যাহার।

হামাসের হিসাব উল্টো

হামাসের অবস্থান আবার ঠিক বিপরীত।

সংগঠনটি নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়নি। কিন্তু তাদের দাবি, তার আগে গাজা থেকে ইজরায়েলি বাহিনী সরতে হবে, যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বন্দোবস্তের পথ স্পষ্ট করতে হবে।

অর্থাৎ হামাসের যুক্তি—আগে ইজরায়েলি সেনা সরুক, যুদ্ধ থামুক; তার পরে অস্ত্র ছাড়ার প্রশ্ন।

এখানেই শান্তি পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় জট।

ইজরায়েল ভয় পাচ্ছে, আগে সেনা সরলে হামাস গোপনে অস্ত্র রেখে ফের শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

হামাসের ভয়, আগে অস্ত্র ছেড়ে দিলে ইজরায়েল পরে সেনা প্রত্যাহারের প্রতিশ্রুতি না-ও রাখতে পারে।

দুই পক্ষের অবিশ্বাস তাই একই প্রশ্নকে দুই বিপরীত উত্তর দিচ্ছে।

শুধু যুদ্ধবিরতি নয়, পুরো গাজাই বদলাতে চান ট্রাম্প

ট্রাম্পের পরিকল্পনা কেবল বন্দিমুক্তি বা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব নয়। যুদ্ধের পরে গাজা কে চালাবে, নিরাপত্তা কে দেখবে এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত ভূখণ্ডটি কী ভাবে পুনর্গঠন করা হবে—তারও একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো রয়েছে।

পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য, গাজাকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকৃত অঞ্চলে পরিণত করা এবং এমন কোনও সামরিক শক্তিকে সেখানে ভবিষ্যতে জায়গা না দেওয়া, যারা ইজরায়েল বা অন্য কোনও প্রতিবেশী দেশের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে।

চুক্তি কার্যকর হলে যুদ্ধ বন্ধ হবে, ইজরায়েলি বাহিনী নির্দিষ্ট অবস্থানে পিছিয়ে যাবে এবং বন্দিমুক্তির প্রক্রিয়া শুরু হবে। জীবিত ও মৃত ইজরায়েলি পণবন্দিদের ফেরত দেওয়ার বিনিময়ে ইজরায়েল বিপুল সংখ্যক প্যালেস্তিনীয় বন্দিকে মুক্তি দেবে।

অর্থাৎ প্রথম ধাপেই থাকবে—বন্দি বিনিময়, যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক সাহায্যের প্রবেশ।

কিন্তু আসল কঠিন কাজ শুরু হবে তার পরে।

গাজা চালাবে কারা?

ট্রাম্পের পরিকল্পনায় যুদ্ধের পর গাজার প্রশাসনে হামাস বা অন্য কোনও সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ ভূমিকা থাকবে না।

তার বদলে তৈরি হবে একটি অস্থায়ী প্যালেস্তিনীয় প্রশাসনিক কমিটি। এতে থাকবেন প্রযুক্তিবিদ, প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দক্ষ প্যালেস্তিনীয় ব্যক্তিরা। প্রয়োজন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও যুক্ত হবেন।

তাঁদের কাজ হবে একেবারে দৈনন্দিন জীবন ফেরানো—জল, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, রাস্তা, পুর পরিষেবা থেকে শুরু করে সরকারি পরিষেবাগুলি সচল করা।

তবে এখানেই শেষ নয়।

এই প্রশাসনের উপর নজরদারি করবে একটি আন্তর্জাতিক অন্তর্বর্তী সংস্থা—‘বোর্ড অব পিস’।

এর চেয়ারম্যান হওয়ার কথা ট্রাম্পের। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বদের এই বোর্ডে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের নামও পরিকল্পনায় এসেছে।

দীর্ঘমেয়াদে প্যালেস্তাইন কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পন্ন করলে গাজার দায়িত্ব তাদের হাতে তুলে দেওয়ার সম্ভাবনাও রাখা হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—কবে সেই সময় আসবে? কে ঠিক করবে প্যালেস্তাইন কর্তৃপক্ষ যথেষ্ট সংস্কার করেছে? আর অন্তর্বর্তী প্রশাসন কত দিন চলবে?

ধ্বংসস্তূপে নতুন অর্থনীতি

গাজাকে শুধু নিরাপদ করাই নয়, অর্থনৈতিক ভাবে পুনর্গঠনও ট্রাম্পের পরিকল্পনার বড় অংশ।

বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পৃথক অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরির প্রস্তাব রয়েছে। লক্ষ্য—পুনর্গঠনের পাশাপাশি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা।

একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরির কথাও বলা হয়েছে। সেখানে অংশগ্রহণকারী দেশগুলির সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে বিশেষ শুল্কহার এবং বাজারে প্রবেশের সুবিধা দেওয়া হতে পারে।

অর্থাৎ পরিকল্পনার যুক্তি হল—শুধু বন্দুক সরিয়ে শান্তি আসে না; মানুষের হাতে কাজ এবং ভবিষ্যতের আশা না থাকলে সেই শান্তিও টেকে না।

গাজা ছাড়তে বাধ্য করা হবে না

গাজাবাসীদের জোর করে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হবে না—পরিকল্পনায় এই বিষয়টিও স্পষ্ট করার চেষ্টা রয়েছে।

যাঁরা স্বেচ্ছায় গাজা ছেড়ে যেতে চান, তাঁরা যেতে পারবেন। আবার ফিরে আসার সুযোগও থাকবে।

মূল লক্ষ্য, গাজার মানুষকে নিজেদের ভূখণ্ডেই থাকার এবং সেখানেই নতুন জীবন গড়ার সুযোগ দেওয়া।

সুড়ঙ্গ থেকে অস্ত্র কারখানা—সবই টার্গেটে

নিরস্ত্রীকরণের সবচেয়ে কঠিন অংশ এখানেই।

হামাসের অস্ত্র শুধু রকেট বা বন্দুক নয়। রয়েছে সুড়ঙ্গ, অস্ত্র তৈরির পরিকাঠামো, গোলাবারুদের ভাণ্ডার এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা।

পরিকল্পনায় তাই শুধু অস্ত্র জমা দেওয়ার কথা নেই। হামাসের সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে তা আবার তৈরি করা না যায়, সেই ব্যবস্থাও করতে হবে।

অস্ত্রগুলিকেও শুধু জমা দিলেই হবে না। স্বাধীন পর্যবেক্ষকদের তত্ত্বাবধানে সেগুলিকে স্থায়ী ভাবে ব্যবহারের অযোগ্য করে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

এমনকি অস্ত্র সমর্পণকারী যোদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য আন্তর্জাতিক অর্থপুষ্ট কর্মসূচির কথাও বলা হয়েছে।

অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু ‘অস্ত্র কেড়ে নেওয়া’ নয়—‘অস্ত্রের প্রয়োজনটাই শেষ করা’।

হামাস সদস্যদের জন্য ক্ষমার দরজা

পরিকল্পনায় হামাসের সাধারণ সদস্যদের জন্যও একটি পথ রাখা হয়েছে।

যাঁরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতি মেনে নেবেন এবং নিজেদের অস্ত্র স্থায়ী ভাবে অকার্যকর করার প্রক্রিয়ায় অংশ নেবেন, তাঁদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

যাঁরা গাজা ছেড়ে অন্য দেশে যেতে চান, তাঁদেরও সংশ্লিষ্ট দেশ রাজি থাকলে নিরাপদে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

এই ব্যবস্থা হামাসকে সামরিক সংগঠন হিসেবে ভেঙে দেওয়ার পাশাপাশি তার সদস্যদের একটি অংশকে সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।

কিন্তু ইজরায়েলের কট্টরপন্থী অংশের কাছে এখানেও আপত্তির জায়গা রয়েছে—অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করা বহু মানুষ কি এ ভাবে শাস্তি এড়িয়ে যেতে পারবেন?

নিরাপত্তা দেখবে আন্তর্জাতিক বাহিনী

হামাসের সামরিক কাঠামো ভেঙে দেওয়ার পরে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—গাজার নিরাপত্তা কে সামলাবে?

উত্তর হিসাবে রয়েছে একটি অস্থায়ী ইন্টারন্যাশনাল স্টেবিলাইজেশন ফোর্স

আমেরিকা, আরব দেশ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতায় এই বাহিনী তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা গাজার নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলবে, প্যালেস্তিনীয় পুলিশকে প্রশিক্ষণ দেবে এবং সীমান্ত নিরাপত্তাতেও ভূমিকা নেবে।

জর্ডন ও মিশরের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে।

দীর্ঘমেয়াদে গাজার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা স্থানীয় প্যালেস্তিনীয় পুলিশের হাতে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক বাহিনীর সামনে কঠিন প্রশ্নও থাকবে—হামাস অস্ত্র ছাড়তে না চাইলে তারা কি শক্তি প্রয়োগ করবে? আর করলে সেই সংঘর্ষের রাজনৈতিক দায় নেবে কে?

সীমান্তে একসঙ্গে দুই কাজ

গাজার সীমান্তেও নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির কথা বলা হয়েছে।

এক দিকে অস্ত্র ও গোলাবারুদ যাতে ফের গাজায় ঢুকতে না পারে, তা আটকাতে হবে।

অন্য দিকে খাদ্য, ওষুধ, নির্মাণসামগ্রী এবং পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয় জিনিস যাতে নির্বিঘ্নে ঢুকতে পারে, তাও নিশ্চিত করতে হবে।

অর্থাৎ সীমান্তরক্ষীদের একসঙ্গে দু’টি কাজ করতে হবে—অস্ত্র আটকানো, কিন্তু সাহায্য আটকানো নয়।

আর তারপরই আসে সেনা প্রত্যাহার

পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাহিনী যত দ্রুত গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব নিতে শুরু করবে, ইজরায়েলি বাহিনীও তত ধাপে ধাপে পিছিয়ে যাবে।

নিরস্ত্রীকরণের অগ্রগতি, নিরাপত্তার মানদণ্ড এবং নির্দিষ্ট সময়সীমার ভিত্তিতে প্রত্যাহারের ধাপ নির্ধারণ করা হবে।

শেষ লক্ষ্য—ইজরায়েলি বাহিনীর সম্পূর্ণ প্রত্যাহার।

তবে গাজা থেকে নতুন সশস্ত্র হামলার আশঙ্কা পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত সীমান্তের কাছে একটি সীমিত নিরাপত্তা বলয় রাখার সম্ভাবনাও রয়েছে।

আর এখানেই নেতানিয়াহুর আপত্তি আরও স্পষ্ট।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা বলছে—

নিরস্ত্রীকরণ এগোবে → আন্তর্জাতিক বাহিনী দায়িত্ব নেবে → আইডিএফ ধাপে ধাপে সরবে।

নেতানিয়াহুর অবস্থান—

আগে সম্পূর্ণ ও যাচাইযোগ্য নিরস্ত্রীকরণ → তার পর ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার।

এই ক্রমের সামান্য পার্থক্যই আসলে গোটা পরিকল্পনার ভবিষ্যৎ আটকে দিতে পারে।

হামাস না মানলে?

পরিকল্পনায় একটি বিকল্প পথও রাখা হয়েছে।

হামাস কোনও নির্দিষ্ট এলাকা থেকে সরে গেলে বা সেখানে অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দিলে সেই এলাকায় আলাদা করে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন, প্রশাসন তৈরি এবং পুনর্গঠন শুরু করা যেতে পারে।

শুনতে বাস্তবসম্মত হলেও এর মধ্যে বড় ঝুঁকি রয়েছে।

গাজা তখন কার্যত দুই ভাগে ভাগ হয়ে যেতে পারে—এক দিকে নতুন প্রশাসন ও আন্তর্জাতিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা, অন্য দিকে হামাসের প্রভাবাধীন অঞ্চল।

এমন বিভাজন সাময়িক সমাধান হলেও দীর্ঘমেয়াদে নতুন সংঘর্ষের বীজ বুনতে পারে।

‘নিরস্ত্রীকরণ’ শেষ হল কী করে বুঝবে?

এটাই সম্ভবত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

একটি সশস্ত্র সংগঠনকে নিরস্ত্র করা মানে শুধু রকেট জমা দেওয়া নয়।

প্রথমে ভারী অস্ত্র ও বিস্ফোরক।

তার পর ছোট আগ্নেয়াস্ত্র।

তার পর সুড়ঙ্গ, অস্ত্র কারখানা, গোলাবারুদের ভাণ্ডার এবং সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা।

সব শেষে ভেঙে দিতে হবে সেই সাংগঠনিক কাঠামো, যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে ফের একটি সশস্ত্র বাহিনী তৈরি করা সম্ভব।

কিন্তু গাজার মাটির নীচে ঠিক কতটা সামরিক পরিকাঠামো রয়েছে, কত অস্ত্র কোথায় রয়েছে—তার সম্পূর্ণ হিসাব কারও হাতে নেই।

হামাস বলবে, নিরস্ত্রীকরণ শেষ।

ইজরায়েল বলতে পারে, অস্ত্র এখনও লুকিয়ে রয়েছে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের রিপোর্ট হয়তো আবার দু’পক্ষের কোনওটির সঙ্গেই মিলবে না।

তখন প্রশ্ন হবে—আইডিএফ কি সরবে?

আসল দ্বন্দ্ব বিশ্বাসের

ট্রাম্পের পরিকল্পনা আসলে দুই পক্ষকে এমন একটি সমান্তরাল পথে হাঁটাতে চাইছে, যেখানে কেউই প্রথমে পুরোপুরি ঝুঁকি নেবে না।

হামাস নিরস্ত্রীকরণ শুরু করবে।

আন্তর্জাতিক বাহিনী দায়িত্ব নেবে।

ইজরায়েল ধাপে ধাপে পিছোবে।

পুনর্গঠন এগোবে।

কিন্তু হামাসের ভয়—অস্ত্র ছেড়ে দিলে ইজরায়েল সেনা প্রত্যাহার না-ও করতে পারে।

ইজরায়েলের ভয়—সেনা আগে সরলে হামাস আবার অস্ত্র সংগ্রহ করতে পারে।

এটাই শান্তি আলোচনার সবচেয়ে পুরনো সমস্যা—বিশ্বাসের অভাব।

প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র কোথায় দাঁড়ায়?

পরিকল্পনার আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ রয়েছে—প্যালেস্তিনীয়দের আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা।

তবে ট্রাম্পের প্রস্তাব সরাসরি কোনও স্বাধীন প্যালেস্তাইন রাষ্ট্রের সময়সীমা ঘোষণা করছে না। বরং বলছে, গাজার পুনর্গঠন, প্যালেস্তাইন কর্তৃপক্ষের সংস্কার এবং রাজনৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে ভবিষ্যতে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য পথ তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ এটি নিশ্চয়তা নয়, সম্ভাবনার দরজা।

আর সেই দরজাটিই নেতানিয়াহুর জন্য রাজনৈতিক ভাবে সবচেয়ে অস্বস্তিকর।

তিনি ফের জানিয়েছেন, তাঁর নেতৃত্বে কোনও প্যালেস্তাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে না।

ফলে ওয়াশিংটনের কাছে এই পরিকল্পনা বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাওয়ার রাস্তা হতে পারে। কিন্তু জেরুসালেমে সেটিই হয়ে উঠতে পারে আপত্তির অন্যতম কারণ।

গাজার পর পশ্চিম তীর

আরও বড় সমস্যা—প্যালেস্তিনীয় প্রশ্নকে শুধু গাজায় আটকে রাখা সম্ভব নয়।

পশ্চিম তীর, ইজরায়েলি বসতি, জেরুসালেমের মর্যাদা, সীমান্ত এবং নিরাপত্তা—সব প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত সামনে আসবে।

গাজায় একটি কার্যকর অন্তর্বর্তী প্রশাসন তৈরি হলেই যে দুই রাষ্ট্রের সমাধান নিশ্চিত হয়ে যাবে, এমন নয়।

বরং গাজা যদি আলাদা ভাবে পরিচালিত হয় এবং পশ্চিম তীরের রাজনৈতিক বাস্তবতা অপরিবর্তিত থাকে, তা হলে প্যালেস্তিনীয় রাষ্ট্রের প্রশ্ন আরও জটিল হতে পারে।

বন্দিমুক্তির পরই আসল পরীক্ষা

চুক্তির প্রথম সাফল্য চোখে পড়বে বন্দিরা মুক্ত হলে, যুদ্ধ থামলে এবং মানবিক সাহায্য গাজায় ঢুকতে শুরু করলে।

কিন্তু প্রকৃত পরীক্ষা শুরু হবে তার পরে।

কে অস্ত্র গুনবে?

কে সুড়ঙ্গ খুঁজবে?

কে ঘোষণা করবে—হামাস পুরোপুরি নিরস্ত্র?

ইজরায়েল যদি বলে নিরাপত্তার ঝুঁকি এখনও রয়েছে, তা হলে সেনা প্রত্যাহার কত দিন পিছোতে পারবে?

আর সীমান্তে ‘সাময়িক’ ইজরায়েলি নিরাপত্তা বলয় যদি বছরের পর বছর থেকে যায়, তা হলে সেটিকে আর কত দিন সাময়িক বলা যাবে?

এই প্রশ্নগুলির উত্তর না মিললে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হলেও স্থায়ী শান্তি অধরাই থেকে যেতে পারে।

শেষ কথা: বন্দুক কার হাতে?

ট্রাম্পের পরিকল্পনার সামনে তাই আসল চ্যালেঞ্জ শুধু যুদ্ধ থামানো নয়।

হামাসকে মেনে নিতে হবে—যুদ্ধের পরে গাজার উপর তার সামরিক ও রাজনৈতিক একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকবে না।

ইজরায়েলকে মেনে নিতে হবে—অনির্দিষ্ট কাল সামরিক নিয়ন্ত্রণ রেখে স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানে পৌঁছনো সম্ভব নয়।

প্যালেস্তাইন কর্তৃপক্ষকে প্রমাণ করতে হবে, তারা সংস্কার করে কার্যকর প্রশাসন চালাতে পারে।

আর আমেরিকা ও আরব দেশগুলিকে এমন একটি নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে ইজরায়েলের নিরাপত্তা এবং প্যালেস্তিনীয়দের রাজনৈতিক অধিকার—দু’টিই জায়গা পায়।

শেষ পর্যন্ত গাজার শান্তির চাবিকাঠি তাই কোনও একক ঘোষণা নয়।

যুদ্ধ থামানো হয়তো সম্ভব। কিন্তু যুদ্ধের পরে ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং বন্দুক কার হাতে থাকবে—এই দুই প্রশ্নের একই সঙ্গে গ্রহণযোগ্য উত্তর খুঁজে পাওয়াই আসল পরীক্ষা।

সেই উত্তর মিললে গাজায় যুদ্ধের অবসান বৃহত্তর রাজনৈতিক সমাধানের দরজা খুলতে পারে।

না হলে যুদ্ধবিরতি হয়তো কেবল পরের যুদ্ধের আগে একটি দীর্ঘ বিরতিতে পরিণত হবে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles