বাংলাস্ফিয়ার: রুটিন স্বাস্থ্য পরীক্ষার অঙ্গ হিসেবে অধিকাংশ মানুষই কখনও না কখনও সাধারণ লিপিড প্রোফাইল করিয়েছেন। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে সাধারণত চার থেকে ছয় বছর অন্তর এই পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। আর যাঁদের হৃদ্রোগ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাঁদের আরও ঘন ঘন পরীক্ষা করতে হয়।
এই রক্ত পরীক্ষায় দেখা হয় মোট কোলেস্টেরলের মাত্রা, লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এলডিএল, হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন বা এইচডিএল এবং ট্রাইগ্লিসারাইডের পরিমাণ।
এলডিএলকে সাধারণত ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল বলা হয়। কারণ, এর মাত্রা বেশি হলে ধমনীর দেওয়ালে চর্বিজাতীয় আস্তরণ বা প্লাক জমতে পারে। অন্য দিকে, এইচডিএলকে বলা হয় ‘ভাল’ কোলেস্টেরল। এটি রক্তে থাকা অতিরিক্ত চর্বি যকৃতে পৌঁছে দিয়ে শরীর থেকে তা অপসারণে সাহায্য করে। ট্রাইগ্লিসারাইডও রক্তে থাকা একটি সাধারণ ধরনের চর্বি। এলডিএল ও ট্রাইগ্লিসারাইড—দু’টির মাত্রাই বেশি হলে হৃদ্যন্ত্রের বিপদের আশঙ্কা বাড়তে পারে।
কিন্তু সাধারণ লিপিড প্রোফাইলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরীক্ষা করা হয় না। সেটি হল লাইপোপ্রোটিন(এ), সংক্ষেপে এলপি(এ)।
অরল্যান্ডো হেলথ হার্ট অ্যান্ড ভাসকুলার ইনস্টিটিউটের হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ রায়ান স্মিথের কথায়, এলপি(এ) হল রক্তে সঞ্চালিত এক বিশেষ ধরনের কোলেস্টেরল কণা, যা নিজেই হৃদ্রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বতন্ত্র ঝুঁকি।
আনুমানিক প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে এক জনের রক্তে এলপি(এ)-র মাত্রা বেশি। সমস্যাটি হল, অন্যান্য ধরনের কোলেস্টেরলের মতো এলপি(এ)-র মাত্রা বেশি হলেও সাধারণত কোনও উপসর্গ দেখা যায় না। বিপদটি বোঝা যেতে পারে তখনই, যখন কোনও রক্তনালীতে বাধা সৃষ্টি হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো গুরুতর ঘটনা ঘটে।
জীবনে অন্তত একবার পরীক্ষা
চলতি বছরের মার্চে আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন-সহ একাধিক চিকিৎসা সংস্থা কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের নতুন নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে প্রথম বারের মতো সুপারিশ করা হয়েছে, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জীবনে অন্তত একবার এলপি(এ) পরীক্ষা করানো উচিত।
সাধারণ লিপিড প্রোফাইল বা অন্য কোনও নিয়মিত রক্ত পরীক্ষার সঙ্গে চিকিৎসক আলাদা করে এই পরীক্ষাটি লিখে দিতে পারেন। আমেরিকায় বর্তমানে অধিকাংশ বড় স্বাস্থ্যবিমা সংস্থাও এই পরীক্ষার খরচ বহন করছে।
আগের কোলেস্টেরল সংক্রান্ত নির্দেশিকায় এলপি(এ) পরীক্ষার কথা কেন ছিল না?
এনওয়াইইউ ল্যাঙ্গোন হার্টের সেন্টার ফর দ্য প্রিভেনশন অব কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের অধিকর্তা জেফ্রি বার্গারের মতে, তার অন্যতম কারণ ছিল—রক্তে এলপি(এ)-র মাত্রা বেশি পাওয়া গেলে তা নিয়ে ঠিক কী করা সম্ভব, সেটাই পরিষ্কার ছিল না।
এলপি(এ)-র মাত্রা কমিয়ে দিলে সত্যিই হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমে কি না, এখনও তার চূড়ান্ত উত্তর পাওয়া যায়নি। যদিও বার্গারের বক্তব্য, সাম্প্রতিক গবেষণা এবং ওষুধের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ থেকে ক্রমশ এমন ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে এলপি(এ) কমানো উপকারী হতে পারে।
আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এলপি(এ)-র মাত্রা মূলত বংশগতির দ্বারা নির্ধারিত। ফলে খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা বা অন্যান্য জীবনযাত্রাগত পরিবর্তনের মাধ্যমে এলডিএল বা ট্রাইগ্লিসারাইড যতটা নিয়ন্ত্রণ করা যায়, এলপি(এ)-র ক্ষেত্রে সেই সুযোগ অনেক কম।
কিন্তু গত কয়েক বছরে একের পর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, এলপি(এ)-র মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্রোগজনিত গুরুতর ঘটনার আশঙ্কাও বাড়ে। তাই চিকিৎসকদের একাংশের মতে, কোনও ব্যক্তির এই বংশগত ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা জানা জরুরি। কারণ, এলপি(এ) সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হলেও হৃদ্রোগের অন্যান্য নিয়ন্ত্রণযোগ্য ঝুঁকি—যেমন এলডিএল, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান, ডায়াবেটিস বা অতিরিক্ত ওজন—আরও কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
এলপি(এ) কেন আলাদা ধরনের বিপদ
রক্তে এলপি(এ)-র মাত্রা প্রতি লিটারে ১২৫ ন্যানোমোলের বেশি হলে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে বলে গবেষণায় দেখা গিয়েছে। অন্য একক ব্যবহার করলে এই মাত্রাটি প্রায় ৫০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার।
মাত্রা যদি প্রতি লিটারে ২৫০ ন্যানোমোল, অর্থাৎ প্রায় ১০০ মিলিগ্রাম প্রতি ডেসিলিটার হয়, তা হলে হৃদ্রোগের ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে।
এলডিএলের মতো অতিরিক্ত এলপি(এ)-ও ধমনীর দেওয়ালে জমতে পারে। এর ফলে অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস তৈরি হয়—অর্থাৎ ধমনীর ভিতরে প্লাক জমে রক্ত চলাচলের পথ ক্রমশ সরু হয়ে আসে। গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে পর্যাপ্ত রক্ত পৌঁছতে বাধা সৃষ্টি হলে তার পরিণতি হতে পারে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক।
কিন্তু এলপি(এ)-কে এলডিএলের তুলনায় আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে তার বিশেষ গঠন।
এলপি(এ)-র সঙ্গে একটি অতিরিক্ত প্রোটিন অংশ যুক্ত থাকে। এই প্রোটিনের কারণে কণাটি তুলনামূলক ভাবে বেশি ‘আঠালো’ এবং ধমনীর দেওয়ালে চর্বিজাতীয় প্লাক তৈরির প্রবণতাও বেশি বলে স্মিথ জানিয়েছেন।
এখানেই শেষ নয়। এলপি(এ) শরীরের রক্তের জমাট ভাঙার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেও বাধা দিতে পারে। ফলে রক্ত জমাট বাঁধার প্রবণতা বেড়ে যেতে পারে।
এ ছাড়া এলপি(এ) এমন কিছু অণু বহন করে, যা শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে হৃদ্যন্ত্রের অ্যাওর্টিক ভাল্ভের ক্ষতি হতে পারে এবং ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হতে পারে।
ফলে এলপি(এ)-র বিপদ একাধিক দিক থেকে—এটি ধমনীতে প্লাক জমাতে সাহায্য করতে পারে, রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি বাড়াতে পারে এবং প্রদাহের মাধ্যমে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালীর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে।
এই কারণেই নতুন চিকিৎসা নির্দেশিকার মূল বার্তা অত্যন্ত সহজ: সাধারণ কোলেস্টেরল পরীক্ষার ফল স্বাভাবিক হলেও এমন একটি বংশগত হৃদ্রোগের ঝুঁকি থেকে যেতে পারে, যা সাধারণ লিপিড প্রোফাইলে ধরা পড়ে না। জীবনে অন্তত একবার এলপি(এ) পরীক্ষা সেই অদৃশ্য ঝুঁকিটি চিহ্নিত করার সুযোগ দিতে পারে।