বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লির যন্তর মন্তরে ছাত্র আন্দোলনের পর এ বার উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বসলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। শনিবার ‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচিতে তাঁর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ভয়, শিক্ষা ব্যবস্থার সংকট, বেকারত্ব এবং তরুণদের প্রতিবাদের অধিকার। ছাত্রদের উদ্দেশে রাহুলের বার্তা—আগের প্রজন্ম যে ভয়কে অতিক্রম করতে পারেনি, বর্তমান প্রজন্ম সেই ভয়কে জয় করেই দেশের রাজনীতির ভাষা বদলে দিয়েছে।

রাহুল বলেন, ছাত্রদের আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কোনও একটি পরীক্ষা বা প্রশ্নপত্র ফাঁসের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আসল বিষয় হল ভয়কে অতিক্রম করা। তাঁর বক্তব্য, বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের বাবা-মায়ের প্রজন্মের অনেকেই বিজেপি বা আরএসএসের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর সাহস পাননি। কিন্তু তাঁদের ছেলেমেয়েরা সেই ভয়কে জয় করেছেন। নিজেদের ভবিষ্যৎ, চাকরি এবং শিক্ষার অধিকার নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। এর আগে সংসদেও ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে রাহুল বলেছিলেন, এই তরুণেরা তাঁদের সামনে ছুড়ে দেওয়া সমস্ত বাধা মোকাবিলা করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে ভয় দেখিয়ে তাঁদের চুপ করানো যাবে না।

প্রয়াগরাজের সভায় সেই বক্তব্যকেই আরও বিস্তৃত করেন কংগ্রেস নেতা। তাঁর কথায়, ভয় মানুষের সবচেয়ে বড় বাধা। কোনও রাজনৈতিক সংগঠন বা সরকারের শক্তি তখনই কার্যকর হয়, যখন সাধারণ মানুষ তাকে ভয় পায়। সেই ভয় চলে গেলে ক্ষমতার কাঠামোটিও দুর্বল হতে শুরু করে। ছাত্র আন্দোলনে তিনি সেই পরিবর্তনেরই লক্ষণ দেখতে পাচ্ছেন বলে জানান।

রাহুলের দাবি, দেশের তরুণদের সামনে এখন এক ধরনের ‘চক্রব্যূহ’ তৈরি হয়েছে। এক দিকে উচ্চশিক্ষার খরচ বাড়ছে, অন্য দিকে চাকরির সুযোগ সঙ্কুচিত হচ্ছে। প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য বছরের পর বছর প্রস্তুতি নেওয়ার পরেও প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল বা নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার মতো সমস্যায় পড়ছেন বহু তরুণ। তাঁর অভিযোগ, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের এই কাঠামোয় ছাত্র এবং তাঁদের পরিবার আর্থিক চাপ বহন করছে, অথচ অর্থনৈতিক সুবিধা পৌঁছচ্ছে অল্প কয়েকটি বড় শিল্পগোষ্ঠীর কাছে। তিনি বলেন, তরুণদের তথ্য তাঁদেরই, যন্ত্রণা তাঁদেরই, কিন্তু সম্পদ অন্যদের হাতে জমা হচ্ছে।

‘ছাত্রোঁ কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি অবশ্য প্রয়াগরাজে শুরু হয়নি। এর আগে রাজস্থানের কোটা থেকে এই ছাত্র-সংযোগ অভিযান শুরু করেছিলেন রাহুল। জুনে কোটার কর্মসূচিতে চার হাজারেরও বেশি ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবক যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে পরীক্ষার কাঠামো, কোচিংয়ের বিপুল খরচ, শিক্ষাঋণ, ভর্তি এবং চাকরির অনিশ্চয়তার মতো বিষয় উঠে এসেছিল। ছাত্রদের সঙ্গে মঞ্চে সরাসরি কথোপকথনের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাকে বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রশ্নে পরিণত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

তার পরে দিল্লিতে প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং পরীক্ষা ব্যবস্থার অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। আন্দোলনকারী ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়ে রাহুল বলেছিলেন, ‘‘ছাত্ররা সন্ত্রাসবাদী নয়।’’ তাঁর অভিযোগ ছিল, ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা এক সময় বিশ্বের অন্যতম সেরা বলে বিবেচিত হলেও এখন সেখানে গুরুতর অনিয়ম ঢুকে পড়েছে। ছাত্রদের দাবি শোনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার করা সরকারের দায়িত্ব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

প্রয়াগরাজের কর্মসূচি ঘিরেও রাজনৈতিক টানাপড়েন কম হয়নি। সভাস্থল নিয়ে শেষ মুহূর্তে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কংগ্রেস অভিযোগ করে, উত্তরপ্রদেশ সরকার প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করে অনুষ্ঠান বানচাল করার চেষ্টা করছে। পরে অবশ্য সভাস্থল ব্যবহারের অনুমতি ফিরে আসে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় রাহুলকে নিশানা করে পোস্টারও দেখা যায়।

এই আবহেই রাহুল ছাত্রদের সামনে ‘ভয়’-এর প্রসঙ্গ তোলেন। তাঁর বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্যও রয়েছে। গত কয়েক মাসে ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে তিনি ধারাবাহিক ভাবে তরুণ ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। তাঁর বক্তব্যে শিক্ষা বা চাকরির পাশাপাশি বারবার উঠে আসছে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকের সম্পর্কের প্রশ্ন। তাঁর যুক্তি, চাকরি বা পরীক্ষায় ক্ষতির আশঙ্কা দেখিয়ে যদি তরুণদের প্রশ্ন করা থেকে বিরত রাখা হয়, তা হলে সমস্যাটি কেবল শিক্ষা ব্যবস্থার থাকে না—তা গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।

রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রজন্ম সেই জায়গাতেই একটি পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তারা প্রশ্ন করছে—চাকরি কোথায়, পরীক্ষায় অনিয়ম কেন, ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে নিশানা করা হচ্ছে কেন? তাঁর দাবি, এই প্রশ্নগুলির সামনে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা দিয়ে দীর্ঘ দিন টিকে থাকা সম্ভব নয়। সংসদে ছাত্র আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলেও তিনি বলেছিলেন, বিজেপি বা আরএসএসকে মোকাবিলা করাই আসল চ্যালেঞ্জ নয়; আসল চ্যালেঞ্জ নিজের ভিতরের ভয়কে মোকাবিলা করা। ছাত্ররা সেটিই করেছেন।

তবে রাহুল শুধু কেন্দ্র বা বিজেপি-শাসিত সরকারকেই ছাত্রদের কথা শোনার পরামর্শ দিচ্ছেন, এমন নয়। সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি বলেছেন, সরকার কংগ্রেসের হোক, কেন্দ্রের হোক বা ঝাড়খণ্ডের—ছাত্রদের কথা শোনা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ত্রুটি সংশোধন করা প্রত্যেক সরকারের দায়িত্ব। এই অবস্থান তাঁর ছাত্র-সংযোগ অভিযানের রাজনৈতিক বার্তাকে কিছুটা বিস্তৃত করেছে।

প্রয়াগরাজের সভায় তাই রাহুলের মূল সুর ছিল আত্মবিশ্বাসের। তাঁর মতে, তরুণ প্রজন্মের শক্তি শুধু সংখ্যায় নয়, তাদের প্রশ্ন করার ক্ষমতায়। আমেরিকা, চিন বা রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের তুলনা যতই করা হোক, ভারতের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ সমাজ। কিন্তু সেই শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে এমন শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যেখানে বছরের পর বছর প্রস্তুতি নিয়েও একজন তরুণকে প্রশ্নপত্র ফাঁস, পরীক্ষা বাতিল বা নিয়োগ আটকে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকতে হবে না।

আর সেই দাবির সঙ্গেই রাহুল জুড়ে দিলেন তাঁর রাজনৈতিক বার্তা—ভয়কে জয় করা। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, আগের প্রজন্ম যে প্রশ্ন হয়তো মনে রেখেও প্রকাশ্যে তুলতে পারেনি, নতুন প্রজন্ম তা রাস্তায় দাঁড়িয়ে তুলছে। সেই কারণেই ছাত্র আন্দোলন তাঁর কাছে শুধু শিক্ষা বা চাকরির আন্দোলন নয়; এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।

প্রয়াগরাজে ছাত্রদের উদ্দেশে রাহুলের তাই বার্তা—তাঁদের সবচেয়ে বড় অর্জন কোনও সরকারের কাছ থেকে একটি দাবি আদায় নয়। সবচেয়ে বড় অর্জন হল, তাঁরা ভয় পাওয়া বন্ধ করেছেন। আর একবার একটি প্রজন্ম ভয় কাটিয়ে প্রশ্ন করতে শুরু করলে, দেশের রাজনীতিও আর আগের জায়গায় থাকে না।