বাংলাস্ফিয়ার: ভালো আয়ের আশায় বাড়ি ছেড়ে কাশ্মীরে গিয়েছিলেন দু’জন পরিযায়ী শ্রমিক। পরিবার ভেবেছিল, কয়েক মাসের কঠোর পরিশ্রমের পর হাতে কিছু টাকা নিয়ে ফিরবেন তাঁরা। সেই অর্থে সংসারের অভাব কিছুটা হলেও মিটবে, সন্তানের পড়াশোনা চলবে, ঋণের বোঝাও কমবে। কিন্তু সেই প্রত্যাবর্তন আর হল না। সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারিয়ে তাঁদের যাত্রা শেষ হল উপত্যকাতেই। এই দুই শ্রমিকের মৃত্যু শুধু দুটি পরিবারের নয়, দেশের লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিকের অনিশ্চিত জীবনের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ কাশ্মীরে কাজের সন্ধানে যান। নির্মাণ, সড়ক প্রকল্প, কাঠের কাজ, ফলের বাগান, হোটেল-রেস্তরাঁ কিংবা ছোটখাটো ব্যবসায় শ্রমিক হিসেবে তাঁদের চাহিদা রয়েছে। নিজ রাজ্যে সীমিত মজুরি ও কাজের অভাবের কারণে তাঁরা দূর-দূরান্তে পাড়ি দেন। কারণ একটাই—বেশি আয় করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করা।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, নিহত দুই শ্রমিকের পরিবার তাঁদের উপার্জনের উপরেই নির্ভরশীল ছিল। একজনের বৃদ্ধ বাবা-মা, স্ত্রী ও সন্তান; অন্যজনের ক্ষেত্রেও একই ছবি—দৈনন্দিন খরচ, সন্তানের পড়াশোনা, বাড়ির ঋণ, সবকিছুর ভার ছিল তাঁদের কাঁধে। বাড়ি ছাড়ার সময় পরিবারের কাছে তাঁরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কয়েক মাসের মধ্যেই টাকা নিয়ে ফিরবেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি অপূর্ণই থেকে গেল।
পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবনে ঝুঁকি নতুন নয়। তাঁরা প্রায়ই অচেনা পরিবেশে, পরিবার থেকে বহু দূরে, সীমিত নিরাপত্তা ও অনিশ্চিত কর্মপরিস্থিতির মধ্যে কাজ করেন। অনেক সময় পর্যাপ্ত আবাসন, স্বাস্থ্যসুবিধা বা সামাজিক সুরক্ষাও পান না। তবুও বেশি আয়ের আশায় তাঁরা এই জীবন বেছে নিতে বাধ্য হন। কারণ নিজের রাজ্যে একই কাজের তুলনায় অন্যত্র মজুরি তুলনামূলক বেশি।
কাশ্মীরে কর্মরত অ-স্থানীয় শ্রমিকরা গত কয়েক বছরে একাধিকবার জঙ্গি হামলার শিকার হয়েছেন। নিরাপত্তা বাহিনী জঙ্গি দমনে ধারাবাহিক অভিযান চালালেও, সাধারণ শ্রমিকরা অনেক সময় সহজ লক্ষ্য হয়ে ওঠেন। তাঁদের কোনও রাজনৈতিক ভূমিকা নেই, সংঘাতের সঙ্গেও কোনও সম্পর্ক নেই। তবুও শুধুমাত্র বাইরের রাজ্য থেকে আসার কারণে তাঁরা হামলার শিকার হন।
এই মৃত্যুর পর দুই পরিবারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এবার কীভাবে চলবে সংসার? পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্যকে হারিয়ে তাঁদের সামনে নেমে এসেছে গভীর অনিশ্চয়তা। সরকারি ক্ষতিপূরণ বা সহায়তা কিছুটা স্বস্তি দিলেও, একজন মানুষের অনুপস্থিতি কখনও পূরণ করা সম্ভব নয়। সন্তানদের ভবিষ্যৎ, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়—সবই এখন বড় প্রশ্নচিহ্ন।
এই ঘটনা আরও একটি বাস্তবতা সামনে আনে। ভারতের অভ্যন্তরীণ শ্রম-অভিবাসন কেবল অর্থনীতির নয়, সামাজিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন। লক্ষ লক্ষ মানুষ উন্নত আয়ের আশায় রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র কাজ করতে যান। তাঁদের শ্রম দেশের অবকাঠামো, নির্মাণ, কৃষি ও পরিষেবা খাতকে সচল রাখে। অথচ বিপদের সময় তাঁদের নিরাপত্তা ও পরিবারকে সুরক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা এখনও পর্যাপ্ত নয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য আরও শক্তিশালী নিবন্ধন ব্যবস্থা, কর্মস্থলে নিরাপত্তা প্রোটোকল, বীমা, দ্রুত ক্ষতিপূরণ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পরিবারকে সহায়তার ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে কর্মসংস্থানের আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে নিজ নিজ রাজ্যেও পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা দরকার, যাতে শুধুমাত্র বেশি মজুরির জন্য হাজার কিলোমিটার দূরে যেতে বাধ্য না হন শ্রমিকরা।
ভালো জীবনের স্বপ্ন দেখেই দুই শ্রমিক উপত্যকায় গিয়েছিলেন। তাঁদের সেই স্বপ্ন অসমাপ্ত থেকে গেল। কিন্তু তাঁদের মৃত্যু দেশের কাছে একটি বড় প্রশ্ন রেখে গেল—যাঁরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি, সেই পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আমরা কি যথেষ্ট করছি? তাঁদের গল্প কেবল দুই ব্যক্তির নয়; এটি সেই অগণিত মানুষের গল্প, যাঁরা প্রতিদিন পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর আশায় বাড়ি ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়ান।