Home স্বাস্থ্য লজ্জায় গাল লাল? শরীরের এই ‘ফাঁস’ আসলে কেন!

লজ্জায় গাল লাল? শরীরের এই ‘ফাঁস’ আসলে কেন!

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
27 views 5 minutes read
A+A-
Reset

কেউ হঠাৎ সবার সামনে আপনার প্রশংসা করল। অথবা ভুল করে এমন কিছু বলে ফেললেন, যা বলা উচিত ছিল না। মুহূর্তের মধ্যে গাল গরম, মুখ লাল!

ইচ্ছে করলেই এই প্রতিক্রিয়া থামানো যায় না। বরং যত বেশি মনে হয়, ‘ইস, সবাই বুঝতে পারছে আমি লজ্জা পেয়েছি’, ততই যেন মুখ আরও লাল হয়ে ওঠে।

চার্লস ডারউইন একসময় লজ্জায় মুখ লাল হয়ে যাওয়াকে মানুষের অন্যতম অদ্ভুত এবং স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরেও বিজ্ঞানীদের কাছে এই শারীরিক প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট রহস্যময়।

কিছু পাখি যোগাযোগের সময় শরীরে গোলাপি আভা তৈরি করতে পারে। আবার উয়াকারি বানরের সুস্থ অবস্থায় মুখ স্বাভাবিকভাবেই লালচে থাকে। কিন্তু লজ্জা, সংকোচ বা বিব্রতবোধের কারণে মুখ লাল হয়ে যাওয়া—এখনও পর্যন্ত মানুষেরই বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলে মনে করা হয়।

শরীরে তখন কী হয়?

ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ইনস্টিটিউট অব কগনিটিভ নিউরোসায়েন্সের পরিচালক অধ্যাপক সোফি স্কটের মতে, মুখ লাল হওয়া এমন এক সংকেত, যা ইচ্ছা করে নকল করা কঠিন।

কারণ এটি সম্পূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত। আপনি চাইলেই মুখ লাল করতে পারবেন না। আবার লজ্জা পেলেও ইচ্ছা করলেই সেই লালভাব বন্ধ করা সম্ভব নয়।

এর পেছনে কাজ করে শরীরের সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম। চাপ, ভয়, উত্তেজনা বা অস্বস্তির মুহূর্তে এই স্নায়ুতন্ত্র শরীরকে ‘লড়াই করো অথবা পালাও’ বা fight-or-flight পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে।

তখন মস্তিষ্ক থেকে অ্যাড্রেনালিনসহ বিভিন্ন হরমোন ও রাসায়নিক সংকেতের প্রভাবে রক্তনালিগুলির পরিবর্তন ঘটে। মুখের ত্বকের রক্তপ্রবাহ বাড়ে, ফলে গাল ও মুখ লালচে দেখায়।

ফর্সা ত্বকে এই পরিবর্তন বেশি স্পষ্ট দেখা যায়। গাঢ় ত্বকের ক্ষেত্রে লালচে ভাব তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হলেও ত্বকের তাপমাত্রা বাড়তে পারে এবং রঙের পরিবর্তনও হতে পারে।

মুখ লাল, তারপর আরও লাল!

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল, মুখ লাল হওয়ার পর শুরু হতে পারে আরেকটি মানসিক চক্র।

প্রথমে আপনি বুঝলেন, আপনার মুখ গরম হয়ে উঠছে। তারপর মনে হল, অন্যরাও নিশ্চয়ই সেটা দেখতে পাচ্ছে। এরপর মাথায় এল—‘ওরা নিশ্চয়ই বুঝে গেছে আমি লজ্জা পেয়েছি!’

আর সেই চিন্তাই আরও অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

ফলে শরীরের প্রতিক্রিয়া আরও বাড়ে, মুখ আরও লাল হয়ে ওঠে।

অর্থাৎ, লজ্জা মুখ লাল করে, আবার মুখ লাল হয়েছে বুঝতে পারাও লজ্জা বাড়িয়ে দিতে পারে।

বিবর্তন কেন এমন ‘ফাঁস’ রাখল?

বিজ্ঞানীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হল, মুখ লাল হওয়া মানুষের সামাজিক জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।

প্রাচীন মানবসমাজে সামাজিক নিয়ম ভাঙা, ভুল করা বা দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্যকে চ্যালেঞ্জ করার পরিণতি গুরুতর হতে পারত। সংঘর্ষ এমনকি দল থেকে বহিষ্কারও ঘটতে পারত।

সেই পরিস্থিতিতে মুখ লাল হয়ে যাওয়া হয়তো এক ধরনের নিঃশব্দ ক্ষমাপ্রার্থনা বা অনুশোচনার সংকেত হিসেবে কাজ করত।

কথায় কিছু না বলেও শরীর যেন জানিয়ে দিত—‘হ্যাঁ, আমি বুঝতে পারছি ভুল হয়েছে।’

এই প্রতিক্রিয়া অন্যদেরও সংকেত দিতে পারত যে ভুলটি ইচ্ছাকৃত নয় এবং পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করার কোনও উদ্দেশ্য নেই।

লজ্জা কি আপনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে?

অদ্ভুত হলেও গবেষণায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে, যারা সহজে মুখ লাল করেন, তাঁদের অনেক সময় অন্যরা বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করেন।

কারণ মুখের এই প্রতিক্রিয়া সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ফলে কেউ অস্বস্তিতে পড়লে বা ভুল করলে তার মুখের লাল হয়ে ওঠাকে আন্তরিকতার একটি স্বতঃস্ফূর্ত সংকেত হিসেবে দেখা হতে পারে।

এই কারণেই মুখ লাল হওয়ার মতো ছোট্ট একটি শারীরিক প্রতিক্রিয়া মানুষের সামাজিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতায় বিবর্তনগত সুবিধা এনে দিয়ে থাকতে পারে।

আজও কি এর দরকার আছে?

সম্ভবত আছে।

কর্মক্ষেত্রে ভুল করা, কারও অনুভূতিতে আঘাত দেওয়া কিংবা সামাজিক পরিস্থিতিতে অস্বস্তিকর কিছু ঘটার পর মুখ লাল হয়ে যাওয়া অনেক সময় অন্যকে বোঝায় যে আপনি পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে পারছেন এবং অনুতপ্ত।

অর্থাৎ, শরীরের এই ‘বিব্রতকর’ প্রতিক্রিয়াই কখনও কখনও সম্পর্ক মেরামতের কাজে সাহায্য করতে পারে।

যাঁরা সব সময় ভাবেন, ‘আমি খুব লাল হয়ে যাচ্ছি’

ঘন ঘন মুখ লাল হওয়া নিয়ে অনেকেই ভীষণ অস্বস্তিতে থাকেন। তাঁদের মনে হয়, আশপাশের সবাই নিশ্চয়ই সেটা লক্ষ্য করছে।

কিন্তু গবেষণা বলছে, বাস্তবতা অনেকটাই আলাদা।

অধ্যাপক পিটার ড্রামন্ডের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা মুখ লাল হওয়া নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন এবং যারা উদ্বিগ্ন নন—দুই দলই প্রায় একই মাত্রায় মুখ লাল করতে পারেন। পার্থক্য হল, প্রথম দলটি নিজেদের মুখের প্রতিক্রিয়াটি অনেক বেশি অনুভব করেন এবং তা নিয়ে বেশি চিন্তা করেন।

এমনকি মানুষকে জানানো হলেও যে তারা অন্যদের তুলনায় বেশি লাল হচ্ছেন না, উদ্বেগ অনেক সময় কমে না।

ফলে তৈরি হয় এক ধরনের চক্র—

মুখ লাল হওয়ার ভয় → উদ্বেগ → আরও অস্বস্তি → মুখ লাল হওয়া।

তবে এখানে একটি আশার জায়গা আছে। সামাজিক পরিস্থিতিতে মানুষ সাধারণত নিজের কথাবার্তা, চেহারা ও আচরণ নিয়েই এত ব্যস্ত থাকে যে পাশের ব্যক্তির গাল কতটা লাল হল, সেটা তারা আদৌ খেয়াল নাও করতে পারে।

মুখ লাল হওয়া বন্ধ করবেন কীভাবে?

পুরোপুরি মুখ লাল হওয়া বন্ধ করার কোনও নির্ভরযোগ্য উপায় নেই। তবে এর সঙ্গে যুক্ত উদ্বেগ কমানো যায়।

একটি কার্যকর পদ্ধতি হল কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি বা CBT। এতে মুখ লাল হওয়া নিয়ে অতিরিক্ত নেতিবাচক চিন্তা ও ভয়কে চ্যালেঞ্জ করতে শেখানো হয়।

আরেকটি পদ্ধতি হল টাস্ক কনসেন্ট্রেশন ট্রেনিং বা TCT

এখানে নিজের মুখ কেমন দেখাচ্ছে বা কতটা গরম লাগছে, সেই দিকে মনোযোগ না দিয়ে বাইরের জগতে মন দেওয়ার অভ্যাস তৈরি করা হয়—সামনের মানুষটির কথা, তাঁর কণ্ঠস্বর, কথোপকথনের বিষয় কিংবা আশপাশের পরিবেশের দিকে।

লক্ষ্য মুখ লাল হওয়া বন্ধ করা নয়।

লক্ষ্য হল, মুখ লাল হলেও যেন সেটি নিয়ে আপনার মাথায় আরেকটি ‘বড় ঘটনা’ তৈরি না হয়।

লজ্জার এই লাল আভা হয়তো খারাপও নয়

অধ্যাপক ড্রামন্ডের মতে, মুখ লাল হওয়াকে শরীরের চাপ কমানোর একটি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

ব্যায়ামের সময় শরীর গরম হলে রক্তসঞ্চালন বাড়ে এবং শরীর নিজেকে ঠান্ডা করার চেষ্টা করে। তেমনই আবেগের তীব্র মুহূর্তেও শরীরের এই প্রতিক্রিয়া উত্তেজনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে।

অর্থাৎ, যে লালভাবকে আমরা এতটা ‘বিব্রতকর’ মনে করি, সেটিই হয়তো শরীরের নিজের ভারসাম্য ফেরানোর একটি উপায়।

শেষে লজ্জা নয়, একটু স্বস্তি

লজ্জায় মুখ লাল হওয়া সত্যিই অস্বস্তিকর। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে, এটি কোনও দুর্বলতার চিহ্ন নয়।

বরং এটি মানুষের সামাজিক বিবর্তনের এক অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য—যা আপনার অনুভূতি অন্যের কাছে প্রকাশ করে, আন্তরিকতার সংকেত দিতে পারে এবং সামাজিক সম্পর্ক মেরামতেও ভূমিকা রাখতে পারে।

তাই পরের বার কেউ হঠাৎ বলে উঠলে, “তোমার মুখটা এত লাল কেন?”, হয়তো আরও লজ্জা পাওয়ার বদলে একটু হাসাই ভালো।

কারণ আপনার শরীর তখন আসলে আপনাকে ‘ফাঁসিয়ে’ দিচ্ছে না—মানুষ হিসেবে আপনার সবচেয়ে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াগুলির একটিই প্রকাশ করছে।

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles