বাংলাস্ফিয়ার: প্রতি বছর শ্রাবণ মাস এলেই উত্তর ভারতের মহাসড়ক, শহর ও গ্রামজুড়ে দেখা যায় গেরুয়া পোশাক পরা লক্ষ লক্ষ, কখনও কোটি কোটি শিবভক্তকে। কাঁধে বাঁশের দণ্ডে ঝোলানো দুই প্রান্তের পাত্রে গঙ্গাজল নিয়ে তাঁরা পায়ে হেঁটে এগিয়ে চলেন শিবমন্দিরের দিকে। এই যাত্রাই কাঁওয়ার যাত্রা। ধর্মীয় আচার ছাড়াও এই যাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরাণ, ইতিহাস, সমাজ, অর্থনীতি, জাতিগত কাঠামো এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা।
সমুদ্র মন্থনের পুরাণ থেকেই কাঁওয়ার যাত্রার সূত্র
হিন্দু পুরাণ অনুসারে, দেবতা ও অসুরদের সমুদ্র মন্থনের সময় বহু মূল্যবান বস্তু ও অমৃতের পাশাপাশি উঠে আসে ভয়ঙ্কর বিষ হলাহল। এই বিষ সমগ্র সৃষ্টিকে ধ্বংস করে দিতে পারত। তখন মহাদেব শিব সেই বিষ পান করে বিশ্বকে রক্ষা করেন। বিষের প্রভাবে তাঁর কণ্ঠ নীল হয়ে যায়। সেই থেকেই তাঁর আরেক নাম নীলকণ্ঠ।
পুরাণে বলা হয়, বিষের জ্বালা কমাতে দেবী পার্বতী ও অন্যান্য দেবতারা শিবকে গঙ্গার জল পান করান। যেহেতু সমুদ্র মন্থনের ঘটনা শ্রাবণ মাসে ঘটেছিল বলে বিশ্বাস করা হয়, তাই এই মাসে গঙ্গাজল সংগ্রহ করে শিবলিঙ্গে অর্পণ করা বিশেষ পুণ্যের কাজ বলে মনে করা হয়।
কাঁওয়ার বহনের নিয়ম
কাঁওয়ার বলতে বোঝায় বাঁশের দণ্ডের দুই প্রান্তে ঝোলানো জলভর্তি পাত্র। যাত্রাপথে এই কাঁওয়ার কখনও মাটিতে রাখা যায় না। ফলে ভক্তরা সাধারণত দল বেঁধে হাঁটেন এবং প্রয়োজনে একে অপরের কাঁওয়ার বহন করেন।
ঐতিহ্যগতভাবে এই যাত্রা সম্পূর্ণ পায়ে হেঁটেই সম্পন্ন করা হয়। শিব যেহেতু ত্যাগী ও সন্ন্যাসী, তাই তাঁর ভক্তদেরও এই যাত্রায় সংযম, শৃঙ্খলা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ পালন করার নির্দেশ রয়েছে।
কোথা থেকে গঙ্গাজল সংগ্রহ করা হয়?
সবচেয়ে জনপ্রিয় গঙ্গাজল সংগ্রহস্থলগুলির মধ্যে রয়েছে—
- বিহারের সুলতানগঞ্জ
- উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজ, অযোধ্যা ও বারাণসী
- উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বার, গোমুখ ও গঙ্গোত্রী
এই জল নিয়ে ভক্তরা বিভিন্ন শিবমন্দিরে গিয়ে অভিষেক করেন। বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়—
- দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ
- ঝাড়খণ্ডের বৈদ্যনাথ ধাম
- বারাণসীর কাশী বিশ্বনাথ
- বাঘপতের পুরা মহাদেব মন্দির
- মীরাটের অঘর্ণাথ মন্দির
তবে ধর্মীয় পণ্ডিতদের মতে, দূরের কোনও বিখ্যাত মন্দিরে যাওয়াই বাধ্যতামূলক নয়। স্থানীয় শিবমন্দিরেও গঙ্গাজল নিবেদন করা সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।
শ্রাবণ মাস কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
জামশেদপুরের ভারতীয় জ্যোতিষ আধ্যাত্ম পরিষদের সভাপতি রমেশ কুমার উপাধ্যায়ের মতে, শ্রাবণ মাসের নাম এসেছে শ্রবণা নক্ষত্র থেকে। এই নক্ষত্রে শিবের পূজা অত্যন্ত শুভ বলে মনে করা হয়। তাই এই সময় গঙ্গাজল নিবেদন করলে বিশেষ ফল লাভ হয় বলে বিশ্বাস।
ইতিহাস কী বলছে?
আশ্চর্যের বিষয়, আজকের মতো বিশাল আকারের কাঁওয়ার যাত্রার উল্লেখ প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে খুবই কম। যদিও পরশুরাম, রামচন্দ্র কিংবা রাবণের গঙ্গাজল নিবেদনের কিংবদন্তি রয়েছে, কিন্তু বর্তমান কাঁওয়ার যাত্রার স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না।
এলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন ইতিহাসের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ডি.পি. দুবের মতে, ব্রিটিশ আমলেও এই যাত্রার বিস্তারিত বিবরণ খুব একটা পাওয়া যায় না। ১৮৫৭-র বিদ্রোহ-পরবর্তী সময়ে মহারাষ্ট্রের ব্রাহ্মণ বিষ্ণুভাট গোদসের ভ্রমণকাহিনিতে গঙ্গাজল কাঁধে বহনের যে বিবরণ রয়েছে, সেটিই আধুনিক কাঁওয়ার যাত্রার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মেলে।
তাঁর গবেষণায় দেখা যায়, বর্তমান কাঁওয়ার যাত্রার সূচনা সম্ভবত অষ্টাদশ শতকে বিহারের সুলতানগঞ্জ অঞ্চল থেকে। পরে ধীরে ধীরে তা উত্তর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
আশির দশকের পর কেন জনপ্রিয়তা বাড়ল?
গবেষকদের মতে, ১৯৮০-এর দশকের পর কাঁওয়ার যাত্রা অভূতপূর্বভাবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ কাজ করেছে—
- সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি
- উত্তর ভারতে গড় আয়ের বৃদ্ধি
- হিন্দু পরিচয়বোধের উত্থান
- ভক্তিমূলক গানের ক্যাসেট ও পরে ইলেকট্রনিক মাধ্যমের প্রসার
- ধর্মীয় সংগঠনগুলির সক্রিয় ভূমিকা
সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা
মন্টক্লেয়ার স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী বিকাশ সিং তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, কাঁওয়ার যাত্রায় অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশই তুলনামূলকভাবে কম আয়ের তরুণ। তাঁদের কাছে এই যাত্রা শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং আত্মমর্যাদা, মানসিক দৃঢ়তা ও সামাজিক স্বীকৃতি অর্জনের এক প্রকাশ্য ক্ষেত্র।
অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রান্তিক মানুষদের জন্য এই যাত্রা এক ধরনের বিকল্প সামাজিক পরিচয় গড়ে তোলার সুযোগও তৈরি করে।
জাতপাতের গণ্ডি ভাঙার ক্ষেত্র
অধ্যাপক ডি.পি. দুবের মতে, কুম্ভমেলার মতো কাঁওয়ার যাত্রাও বহু ক্ষেত্রে জাতপাতের কঠোর বিভাজনকে শিথিল করে। ভিন্ন জাতি, ভিন্ন পেশা ও ভিন্ন অঞ্চলের মানুষ একই পথে, একই উদ্দেশ্যে হাঁটেন। এই যাত্রা বৃহত্তর ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুভূতি তৈরি করে, যা অনেক সময় জাতিগত পরিচয়ের সীমা অতিক্রম করে।
রাষ্ট্রের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিভিন্ন রাজ্য সরকার, বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশ সরকার, কাঁওয়ার যাত্রার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা, চিকিৎসা শিবির, বিশ্রামকেন্দ্র, যান চলাচলের পৃথক ব্যবস্থা এমনকি কোথাও কোথাও হেলিকপ্টার থেকে ফুল বর্ষণেরও ব্যবস্থা করেছে। এই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা যাত্রার জনপ্রিয়তা আরও বাড়িয়েছে বলে অনেক গবেষকের মত।
ধর্মীয় আচার থেকে জনজীবনের বৃহৎ ঘটনা
আজ কাঁওয়ার যাত্রা শুধু একটি ধর্মীয় তীর্থযাত্রা নয়। এটি উত্তর ভারতের অন্যতম বৃহত্তম বার্ষিক গণসমাবেশে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণে এই যাত্রা ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি সামাজিক পরিবর্তন, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং রাষ্ট্র-সমাজের সম্পর্কেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে উঠেছে।