স্মার্টফোন ছাড়া এখনকার জীবন যেন ভাবাই যায় না। যোগাযোগ থেকে ব্যাঙ্কিং, কেনাকাটা থেকে অফিসের কাজ—সবই হাতের মুঠোয়। কিন্তু প্রয়োজনের গণ্ডি পেরিয়ে যখন ফোন আমাদের সময়, মনোযোগ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে, তখনই সমস্যা। বিশেষ করে খবর, পোস্ট বা ভিডিও একের পর এক স্ক্রল করে যাওয়ার অভ্যাস—অর্থাৎ ‘ডুমস্ক্রলিং’—ধীরে ধীরে বড়সড় আসক্তিতে পরিণত হতে পারে।
AIIMS-এর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মমতা সুদের মতে, সমস্যাটা স্মার্টফোন নিজে নয়, বরং আমরা সেটি কীভাবে ব্যবহার করছি। ফোন পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার দরকার নেই। বরং সচেতন, উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারই ডুমস্ক্রলিং থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
বুঝবেন কীভাবে ফোনের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে?
অধ্যাপক সুদের মতে, ফোনের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতার কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ রয়েছে—
- অকারণে বারবার ফোন পরীক্ষা করা।
- ফোন কাছে না থাকলে অস্থির বা উদ্বিগ্ন লাগা।
- দিনে দিনে ফোন ব্যবহারের সময় বেড়ে যাওয়া।
- ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা।
- ফোনের কারণে কাজ, সম্পর্ক বা দৈনন্দিন জীবন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অভ্যাস বদলাতে না পারা।
নিজেকে একটি প্রশ্ন করুন—ফোন কি আমার স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে? উত্তর ‘হ্যাঁ’ হলে অভ্যাস বদলের সময় এসেছে।
ফোন নামানো এত কঠিন কেন?
সামাজিক মাধ্যম ও অন্যান্য অ্যাপের নকশাই এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে ব্যবহারকারীর মনোযোগ যতটা সম্ভব বেশি সময় ধরে রাখা যায়। অন্তহীন স্ক্রল, অটোপ্লে ভিডিও, নোটিফিকেশন এবং মুহূর্তের আনন্দ বারবার আমাদের ফোনের দিকে ফিরিয়ে আনে।
তার সঙ্গে রয়েছে একঘেয়েমি, মানসিক চাপ, একাকীত্ব কিংবা উদ্বেগ। অনেকেই এই অনুভূতিগুলি এড়াতে ফোনের আশ্রয় নেন। আবার ‘কিছু মিস হয়ে যাচ্ছে’—এই FOMO-ও সারাক্ষণ অনলাইনে থাকার চাপ বাড়ায়। ধীরে ধীরে ফোন যোগাযোগের মাধ্যম থেকে মানসিক নির্ভরতার জায়গা হয়ে ওঠে।
ফোন ছাড়তে হবে—এই ধারণাই ভুল
ফোনের ব্যবহার কমাতে প্রযুক্তি পুরোপুরি ছেড়ে দিতে হবে—এমনটা মনে করেন না অধ্যাপক সুদ। বরং প্রথমে নিজের ফোন ব্যবহারের ধরনটা বোঝা জরুরি।
এক দিনে ফোনটি ঠিক কী কী কাজে ব্যবহার করছেন, তার একটি তালিকা তৈরি করুন। তাতে বোঝা যাবে কোন ব্যবহার সত্যিই প্রয়োজনীয় আর কোনটা নিছক অভ্যাস।
ফোন আনলক করার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন—“আমি এখন ফোনটা কেন ধরছি?”
প্রয়োজনীয় কাজ শেষ হলেই ফোন সরিয়ে রাখুন। কাজের ফাঁকে অভ্যাসবশত সামাজিক মাধ্যমে ঢুকে পড়া এড়িয়ে চলুন। একসঙ্গে সবকিছু বদলানোর চেষ্টা না করে প্রথমে এক-দুটি ছোট পরিবর্তন আনুন। কয়েক সপ্তাহ সেই অভ্যাস ধরে রাখতে পারলে তারপর নতুন পরিবর্তন যোগ করুন।
ডুমস্ক্রলিং থামাতে ১০ সহজ উপায়
১. অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ করুন
প্রতিটি নোটিফিকেশন আপনার মনোযোগ ভাঙার একটি সুযোগ। দরকার নেই এমন নোটিফিকেশন বন্ধ রাখুন।
২. সোশ্যাল মিডিয়া হোম স্ক্রিন থেকে সরান
চোখের সামনে অ্যাপ না থাকলে অভ্যাসবশত সেটি খোলার সম্ভাবনাও কমে।
৩. ফোনে গ্রে-স্কেল মোড ব্যবহার করুন
রঙিন আইকনের আকর্ষণ কমিয়ে ফোনকে কিছুটা কম প্রলোভনসঙ্কুল করে তুলতে পারেন।
৪. সোশ্যাল মিডিয়া ফোন থেকে মুছে ফেলুন
প্রয়োজনে শুধু কম্পিউটার বা ল্যাপটপে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করুন। এতে প্রতিবার স্ক্রল করার আগে বাড়তি একটি ধাপ তৈরি হবে।
৫. সকালে উঠে ফোন ধরবেন না
ঘুম থেকে ওঠার পর অন্তত ১৫–২০ মিনিট ফোন থেকে দূরে থাকুন।
৬. বাড়িতে ফোন রাখার নির্দিষ্ট জায়গা বানান
ফোন সবসময় হাতে বা পকেটে না রেখে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার অভ্যাস করুন।
৭. অফলাইন অভ্যাস ফিরিয়ে আনুন
কাগজের সংবাদপত্র পড়া, হাতে বাজারের তালিকা লেখা, শান্তভাবে চা খাওয়া বা কিছুক্ষণ শরীরচর্চার মতো ছোট অভ্যাস ফিরিয়ে আনুন।
৮. ফোনের বিকল্প তৈরি করুন
ফোন দূরে রাখার পর কী করবেন, সেটা আগে থেকেই ঠিক করে রাখুন। হাঁটা, বাগান করা, বই পড়া, রান্না, বোর্ড গেম বা কোনও শখের চর্চা হতে পারে ভালো বিকল্প।
৯. একঘেয়েমিকে ভয় পাবেন না
সব মুহূর্ত ফোন দিয়ে ভরিয়ে তুলতে হবে না। কিছুটা নীরবতা ও একঘেয়েমি মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দেয় এবং স্মৃতি, সৃজনশীলতা ও আত্মবিশ্লেষণের মতো প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে পারে।
১০. ঘুমের আগে ফোন দূরে রাখুন
অধ্যাপক সুদের মতে, সব পরামর্শের মধ্যে ঘুম ঠিক রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শোওয়ার অন্তত দুই ঘণ্টা আগে ফোন ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করুন। সম্ভব হলে শোবার ঘরকে ফোনমুক্ত রাখুন। রাতের স্ক্রলিংয়ের বদলে বই পড়ার মতো শান্ত অভ্যাস গড়ে তুলুন।
‘ডিজিটাল ডিটক্স’ কেন বারবার ব্যর্থ হয়?
শুধু ফোন দূরে সরিয়ে রাখলেই সমস্যার সমাধান হয় না। সেই সময় কী করবেন, তা আগে থেকে ঠিক না থাকলে একঘেয়েমি বা অস্বস্তি ফিরে এলেই হাত আবার ফোনের দিকে চলে যেতে পারে।
তাই ডিজিটাল বিরতির সঙ্গে বিকল্প কাজও রাখুন। দিনের মধ্যে কয়েক মিনিটের ছোট ছোট ফোন-বিরতিও ধীরে ধীরে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
ফোনের সঙ্গে যুদ্ধ নয়, দরকার ভারসাম্য
অধ্যাপক মমতা সুদের মূল বার্তা, স্মার্টফোনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার দরকার নেই। বরং এমনভাবে ব্যবহার করতে হবে, যাতে প্রযুক্তি জীবনকে সহজ করে—জীবনকে নিয়ন্ত্রণ না করে।
লক্ষ্য ফোন পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া নয়। লক্ষ্য হল ফোন কখন ব্যবহার করবেন, কতক্ষণ ব্যবহার করবেন এবং কেন ব্যবহার করবেন—সেই সিদ্ধান্তটা নিজের হাতে ফিরিয়ে আনা।
অর্থাৎ ফোনকে বিনোদনের খেলনা নয়, প্রয়োজনের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারলেই ধীরে ধীরে সময়, মনোযোগ এবং মানসিক সুস্থতার ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণও ফিরে পাওয়া সম্ভব।