বাংলাস্ফিয়ার: মার্টিন স্করসেসির ১৯৯১ সালের কাল্ট থ্রিলার কেপ ফিয়ার-এর নতুন সিরিজ সংস্করণকে সফলভাবে সমকালীন করে তুলেছেন নির্মাতা নিক অ্যান্টোস্কা। অ্যাপল টিভি+–এর এই দশ পর্বের সিরিজে ম্যাক্স কেডির চরিত্রে হাভিয়ের বারদেম যেমন বিস্ফোরক উপস্থিতি দেখিয়েছেন, তেমনই আনা বাউডেন চরিত্রে অ্যামি অ্যাডামসের সংযত অভিনয় গল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
এই সংস্করণে ম্যাক্স কেডির ভূমিকায় বারদেম রবার্ট ডি নিরোর কিংবদন্তি অভিনয়ের অনুকরণ করেননি; বরং নিজের স্বতন্ত্র ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। তাঁর বিশাল চেহারা, ছোট করে কাটা চুল এবং অনিশ্চিত আচরণ চরিত্রটিকে একই সঙ্গে ভীতিকর ও রহস্যময় করে তোলে। তিনি যেন প্রতিটি হাসি, প্রতিটি দৃষ্টি এবং প্রতিটি অঙ্গভঙ্গির মধ্যেই অশুভ ইঙ্গিত লুকিয়ে রাখেন।
নিক অ্যান্টোস্কা মূল কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক বদলে দিয়েছেন। এখানে ম্যাক্স কেডির অপরাধ প্রমাণের বিচার বা সে নির্দোষ কি না, সেটাই আর মূল প্রশ্ন নয়। দর্শক শুরু থেকেই জানে, এই মানুষটি বিপজ্জনক। ফলে গল্পের জোর পড়ে তার উপস্থিতি কীভাবে বাউডেন পরিবারের জীবনকে ধীরে ধীরে আতঙ্কে ভরিয়ে তোলে, সেই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েনের ওপর।
এই সিরিজের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আনা বাউডেন চরিত্রে। আগের চলচ্চিত্রগুলিতে যেখানে কেডির আইনজীবী ছিলেন টম বাউডেন, এখানে সেই ভূমিকায় আনা, অর্থাৎ অ্যামি অ্যাডামস। এই পরিবর্তন কাহিনিকে আরও জটিল করেছে। একজন মা হিসেবে তিনি আদর্শ আমেরিকান পরিবারের প্রতীক, আবার একজন আইনজীবী হিসেবে তাঁর নৈতিক অবস্থানও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তিনি কি নিজের মক্কেলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন? নাকি ব্যক্তিগত সম্পর্ক সেই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল?
অ্যামি অ্যাডামস তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সংযমে অপরাধবোধ, আত্মরক্ষা এবং নৈতিক দৃঢ়তার সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখেছেন। অন্যদিকে বারদেমের বিস্ফোরক অভিনয়ের সঙ্গে তাঁর এই সংযম চমৎকার বৈপরীত্য তৈরি করেছে। দু’জনের মুখোমুখি দৃশ্যগুলো সিরিজের অন্যতম শক্তি।
এছাড়া এই সংস্করণে নারী-দৃষ্টিভঙ্গিকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্করসেসির ছবিতে যৌন সহিংসতা যেভাবে স্পষ্টভাবে দেখানো হয়েছিল, এখানে তা এড়িয়ে গিয়ে গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা হয়েছে বিশ্বাসভঙ্গ এবং নৈতিক সংকটকে। ফলে কাহিনি আরও সংবেদনশীল এবং আধুনিক হয়ে উঠেছে।
প্রায় এক ঘণ্টার দশটি পর্ব জুড়ে নিক অ্যান্টোস্কা ধীরে ধীরে উত্তেজনা তৈরি করেন। দক্ষিণ মার্কিন গথিক পরিবেশ, ধীর গতির কাহিনি এবং একের পর এক অপ্রত্যাশিত মোড় দর্শককে ধরে রাখে। যদিও দীর্ঘ সময়ের কারণে মাঝেমধ্যে গতি শ্লথ বলে মনে হতে পারে, শেষ পর্বের তীব্র নাটকীয়তা সেই অপেক্ষার মূল্য দেয়।
শেষ পর্বের নাম ‘দ্য এক্সিকিউশনার্স’, যা মূল উপন্যাসের প্রতি শ্রদ্ধা। তবে সিরিজটি ১৯৫৭ সালের জন ডি. ম্যাকডোনাল্ডের উপন্যাস বা ১৯৯১ সালের স্করসেসি ছবির সমাপ্তি অনুসরণ করেনি। এখানে বাউডেন দম্পতির সামনে প্রশ্ন উঠে আসে—তাঁরা কি নিজেরাই বিচারক, জুরি ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী হবেন, নাকি আইনের ওপরই আস্থা রাখবেন?
সমালোচকের মতে, স্করসেসির ছবিতে ম্যাক্স কেডির মৃত্যু নাটকীয় হলেও ন্যায়বিচার যেন সম্পূর্ণ হয়নি। নতুন সিরিজ সেই বিতর্কে না গিয়ে আরও গভীর প্রশ্ন তোলে—আসল পরিবর্তন কি অপরাধীর ভাগ্যে, নাকি সেই মানুষগুলোর মধ্যে, যারা তার কারণে চিরদিনের জন্য বদলে যায়? আনা বাউডেন হয়তো আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান, কিন্তু অতীতের আতঙ্ক কি কখনও সত্যিই তাঁকে ছেড়ে যায়?
‘কেপ ফিয়ার’ রিভিউ: অ্যামি অ্যাডামসের সংযম, হাভিয়ের বারদেমের তীব্র অভিনয়ে নতুন প্রাণ পেল স্করসেসির ক্লাসিক থ্রিলারের সিরিজ রূপ
7