Home খবর ‘পিঁপড়ে’, ‘পোকার’ মতো অবমাননাকর সম্বোধন অসাংবিধানিক, মর্যাদাহানিকর ভাষা গণতন্ত্রে চলতে পারে না: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি

‘পিঁপড়ে’, ‘পোকার’ মতো অবমাননাকর সম্বোধন অসাংবিধানিক, মর্যাদাহানিকর ভাষা গণতন্ত্রে চলতে পারে না: সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
10 views 2 minutes read
A+A-
Reset

বাংলাস্ফিয়ার: মানুষকে ‘পিঁপড়ে’, ‘পোকা’, ‘পরজীবী’ বা অন্য কোনও অমানবিক ও অবমাননাকর অভিধায় চিহ্নিত করা ভারতের সংবিধানের মূল চেতনার পরিপন্থী। সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণে বলেছেন, কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে এমন ভাষায় হেয় করা সাংবিধানিক মূল্যবোধের সঙ্গে অসঙ্গত এবং প্রত্যেক মানুষের মর্যাদা রক্ষার নীতির বিরোধী। তিনি স্পষ্ট করে দেন, রাষ্ট্র হোক বা কোনও বেসরকারি ব্যক্তি—ধর্ম, ভাষা, জাতি, বর্ণ, অঞ্চল কিংবা অন্য কোনও পরিচয়ের ভিত্তিতে কোনও সম্প্রদায়কে অবমাননা করা সংবিধানসম্মত নয়।

বিচারপতি ভূঁইয়ার এই মন্তব্য এসেছে এমন এক মামলার শুনানিতে, যেখানে একটি চলচ্চিত্রের নাম নিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছিল। যদিও মামলার নিষ্পত্তি হয় চলচ্চিত্রের নাম পরিবর্তনের আশ্বাসের ভিত্তিতে, বিচারপতি তাঁর পৃথক মতামতে বৃহত্তর সাংবিধানিক প্রশ্ন তুলে ধরেন। তিনি বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ভারতের গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি হলেও সেই স্বাধীনতার আড়ালে কোনও ব্যক্তি বা সম্প্রদায়কে অমানবিক বা ঘৃণার পাত্রে পরিণত করার অধিকার কারও নেই।

বিচারপতি আরও বলেন, সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সমতার অধিকার এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে ব্যক্তির জীবন ও মর্যাদার যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, তা কেবল শারীরিক সুরক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন নাগরিকের সামাজিক মর্যাদা, সম্মান এবং মানবিক পরিচয়ও সেই সাংবিধানিক সুরক্ষার অংশ। তাই কাউকে এমন ভাষায় বর্ণনা করা, যা তাকে মানুষের মর্যাদা থেকে নিচে নামিয়ে আনে, তা গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য বিপজ্জনক।

নিজের পর্যবেক্ষণে বিচারপতি ভূঁইয়া বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, উচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্ব আরও বেশি। তাঁদের বক্তব্য জনজীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। ফলে রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, সরকারি পদাধিকারী কিংবা অন্য কোনও জনপরিচিত ব্যক্তির বক্তব্যে যদি কোনও সম্প্রদায়কে অপমান বা হেয় করার প্রবণতা থাকে, তবে তা সাংবিধানিক আদর্শের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে।

তিনি সুপ্রিম কোর্টের আগের এক রায়েরও উল্লেখ করেন, যেখানে বলা হয়েছিল—কেবল একটি কবিতা, শিল্পকর্ম, ব্যঙ্গচিত্র বা হাস্যরসের উপস্থাপনাকে সহজেই বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে দমন করা যায় না। একটি উদার গণতান্ত্রিক সমাজে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। তবে সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্বও জড়িত। ঘৃণা, অবমাননা বা মানবিক মর্যাদাহানির ভাষা কখনও সাংবিধানিক সুরক্ষা পেতে পারে না।

বিচারপতি ভূঁইয়া আরও বলেন, আদালতের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হল নাগরিকের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। কখনও কখনও বিচারকদের ব্যক্তিগতভাবে কোনও বক্তব্য পছন্দ নাও হতে পারে, কিন্তু শুধুমাত্র সেই কারণে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করা যায় না। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং অন্যের মর্যাদা—এই দুই সাংবিধানিক মূল্যবোধের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই আদালতের দায়িত্ব।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারপতির এই পর্যবেক্ষণ শুধু আদালতের একটি মামলার সীমার মধ্যে আটকে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক বক্তব্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং জনপরিসরে প্রতিপক্ষকে ‘পোকা’, ‘পরজীবী’, ‘পিঁপড়ে’ বা অন্য অমানবিক উপমায় আক্রমণ করার প্রবণতা বেড়েছে। ইতিহাসে দেখা গেছে, মানুষকে প্রথমে অমানবিক ভাষায় চিহ্নিত করা হলে পরবর্তীতে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও সহিংসতা উসকে দেওয়া সহজ হয়ে যায়। সেই কারণেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানবিক মর্যাদা রক্ষাকে এত গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এই পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্ট কার্যত মনে করিয়ে দিল, ভারতীয় সংবিধান শুধু নাগরিকের স্বাধীনতাই রক্ষা করে না, তার মর্যাদাকেও সমান গুরুত্ব দেয়। রাজনৈতিক মতভেদ বা সামাজিক বিরোধ যাই থাকুক না কেন, কোনও মানুষ বা সম্প্রদায়কে এমন ভাষায় চিহ্নিত করা যাবে না, যা তাদের মানবিক পরিচয়কে অস্বীকার করে। গণতন্ত্রে তর্ক-বিতর্ক থাকবে, সমালোচনাও হবে; কিন্তু সেই ভাষা হতে হবে সাংবিধানিক মূল্যবোধ, পারস্পরিক সম্মান এবং মানবিক মর্যাদার সীমার মধ্যে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles