Table of Contents
বাংলাস্ফিয়ার: নয়ডা পুলিশ গত বুধবার (২৯ জুলাই) দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ চলাকালীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে উদ্দেশ করে করা মন্তব্যের জেরে ২৫ বছর বয়সী রুচিকা সিংহ নামে এক তরুণীর বিরুদ্ধে একটি ‘জিরো এফআইআর’ দায়ের করেছে। ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (বিএনএস) ৩৫২, ৩৫৩(১) এবং ৩৫৬(১) ধারায়—অপমান, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি এবং মানহানির অভিযোগ আনা হয়েছে।
এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রশ্ন উঠেছে, জনসমক্ষে অশালীন বা কুরুচিকর ভাষা ব্যবহার—বিশেষত কোনও রাজনৈতিক নেতা বা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে—তা কি আদৌ ফৌজদারি অপরাধ?
অশ্লীলতা: আইনে কী বলা আছে
এ ধরনের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি যে ধারাটি প্রয়োগ করা হয়, তা হল ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ২৯৬ ধারা (আগের ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯৪ ধারা)। এই ধারায় বলা হয়েছে, কেউ যদি জনসমক্ষে এমন কোনও অশ্লীল কাজ করেন বা অশ্লীল গান, কবিতা বা শব্দ উচ্চারণ করেন, যা অন্যদের বিরক্তির কারণ হয়, তবে তাঁর সর্বোচ্চ তিন মাসের কারাদণ্ড হতে পারে।
তবে আইনের দৃষ্টিতে ‘অশ্লীলতা’ শব্দটির একটি নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। আদালত বারবার স্পষ্ট করেছে, কেবল কুরুচিকর বা অমার্জিত ভাষা ব্যবহার করলেই তা অশ্লীলতা হিসেবে গণ্য হবে না।
অশ্লীলতার আইনি মানদণ্ড কী
ভারতে অশ্লীলতার সংজ্ঞা নিয়ে প্রথম বড় বিচারিক পরীক্ষা হয়েছিল ডি এইচ লরেন্সের উপন্যাস লেডি চ্যাটারলিজ লাভার নিষিদ্ধ হওয়ার ঘটনায়। ১৯৬৫ সালে রঞ্জিত ডি উদেশি বনাম মহারাষ্ট্র রাজ্য মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বইটির উপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখে এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন ভারতীয় দণ্ডবিধির ২৯২ ধারার সাংবিধানিক বৈধতাও স্বীকার করে।
সেই রায়ে আদালত ইংল্যান্ডের ১৮৬৮ সালের হিকলিন টেস্ট গ্রহণ করে। এই পরীক্ষার মূল প্রশ্ন ছিল—কোনও বই বা লেখার বিচ্ছিন্ন অংশ সবচেয়ে দুর্বল বা সংবেদনশীল পাঠকের নৈতিকতা নষ্ট করতে পারে কি না। সেই মানদণ্ডেই বইটিকে অশ্লীল বলে ধরা হয়েছিল।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে।
২০০৬ সালে দূরদর্শন বনাম আনন্দ পটবর্ধন মামলায় সুপ্রিম কোর্ট জানায়, কোনও সাহিত্যকর্ম, চলচ্চিত্র বা তথ্যচিত্রকে বিচ্ছিন্ন দৃশ্য বা শব্দ দিয়ে বিচার করা যাবে না। গোটা কাজটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপে, একজন সাধারণ ও সুস্থবুদ্ধিসম্পন্ন দর্শকের দৃষ্টিতে মূল্যায়ন করতে হবে।
২০১৪ সালে বদলে যায় আইনি মানদণ্ড
২০১৪ সালে অবীক সরকার বনাম পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আরও এক ধাপ এগিয়ে যায়। টেনিস তারকা বরিস বেকার ও তাঁর বাগদত্তার নগ্ন আলোকচিত্রকে অশ্লীল নয় বলে রায় দিয়ে আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে হিকলিন পরীক্ষাকে বাতিল করে।
তার পরিবর্তে আদালত ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডস’ বা সমকালীন সামাজিক মানদণ্ডের পরীক্ষা গ্রহণ করে। আদালতের বক্তব্য ছিল, কোনও বিষয় তখনই অশ্লীল হবে, যখন তা একজন সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে সমকালীন সামাজিক মানদণ্ড অনুযায়ী যৌন উত্তেজনা বা কামভাব জাগানোর প্রবণতা সৃষ্টি করে।
রায়ে বলা হয়, “যৌনতা-সংক্রান্ত এমন উপাদানই কেবল অশ্লীল হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যা কামপ্রবণ চিন্তা বা লালসা উসকে দেয়।”
তবে এই মানদণ্ড নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। আইনবিদ গৌতম ভাটিয়া ২০১৪ সালে এক বিশ্লেষণে বলেন, সুপ্রিম কোর্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রথ বনাম ইউনাইটেড স্টেটস (১৯৫৭) মামলার যে ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’ ধারণা গ্রহণ করেছে, সেখানে মূল পরীক্ষার বাকি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান—যেমন বিষয়টি স্পষ্টভাবে আপত্তিকর কি না এবং তার কোনও সামাজিক বা শিল্পমূল্য রয়েছে কি না—সেগুলি গ্রহণ করা হয়নি। তাঁর মতে, এতে আইন আরও অস্পষ্ট হয়ে উঠেছে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিকতার ভিত্তিতে অশ্লীলতার বিচার হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
গালিগালাজ কি অশ্লীলতা?
২০২৪ সালে টিভিএফ-এর ওয়েব সিরিজ কলেজ রোম্যান্স-এর একটি পর্বে প্রচুর অশ্রাব্য শব্দ ব্যবহারের অভিযোগে মামলা হয়েছিল। অভিযোগ ছিল, সিরিজটি অশ্লীল।
কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট এফআইআর খারিজ করে স্পষ্ট জানায়, অশ্লীলতা এবং গালিগালাজ বা অশালীন ভাষা এক জিনিস নয়।
আদালত বলেছিল, অনেক শব্দের আক্ষরিক অর্থ যৌনতা-সংক্রান্ত হলেও, দৈনন্দিন জীবনে সেগুলি সাধারণত রাগ, ক্ষোভ, হতাশা, দুঃখ বা উত্তেজনা প্রকাশের জন্য ব্যবহৃত হয়। তাই সেগুলি স্বাভাবিকভাবে কোনও দর্শকের মধ্যে যৌন কামনা জাগায় না।
২০২৬ সালের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রায়
চলতি বছর বিচারপতি পি এস নরসিংহের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ একই নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
শিবকুমার বনাম রাজ্য (এপ্রিল ২০২৬) মামলায় আদালত বলেন, উত্তপ্ত তর্কের সময় কাউকে ‘বাস্টার্ড’ বলা অশ্লীলতার পর্যায়ে পড়ে না।
এরপর মণি বনাম রাজ্য (জুলাই ২০২৬) মামলায় সুপ্রিম কোর্ট আরও স্পষ্ট ভাষায় জানায়, “আইনের দৃষ্টিতে অশ্লীলতা, কুরুচিকর ভাষা, গালিগালাজ বা অশ্রাব্য শব্দ—এক নয়। শুধুমাত্র গালিগালাজ বা অশালীন শব্দ ব্যবহার করলেই তা অশ্লীলতার অপরাধ হয়ে যায় না।”
আদালত বারবার বলেছে, কোনও বক্তব্যকে অশ্লীল বলতে হলে তা লাসিভিয়াস বা স্পষ্ট যৌন কামনাপ্রবণ হতে হবে। অর্থাৎ বক্তব্যে যৌন লালসা বা কামোত্তেজনা সৃষ্টির উপাদান থাকতে হবে। তার কম কিছু হলে তা সাধারণত ফৌজদারি আইনে অশ্লীলতা হিসেবে গণ্য হয় না।
নয়ডার মামলায় কোন ধারা প্রয়োগ হয়েছে?
রুচিকা সিংহের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া জিরো এফআইআরে কিন্তু অশ্লীলতার ধারা ব্যবহার করা হয়নি। তার পরিবর্তে অপমান, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি এবং মানহানির ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে।
৩৫২ ধারায় অভিযোগ প্রমাণ করতে হলে দেখাতে হবে, অভিযুক্ত এমন অপমান করেছেন যার উদ্দেশ্য ছিল বা যার ফলে জনশান্তি ভাঙার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। শুধু কেউ অপমানিত বোধ করেছেন, তা যথেষ্ট নয়।
জনদুর্ভোগ সৃষ্টি-সংক্রান্ত ধারার লক্ষ্য মূলত রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধে প্ররোচনা, সশস্ত্র বাহিনীতে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া, অথবা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানো। কোনও রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে তীব্র বা কটু সমালোচনা এই ধারার মানদণ্ডে সহজে পড়ে না।
মানহানি আইনেও দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম রয়েছে। কোনও জননেতার সরকারি দায়িত্ব বা জনজীবনের আচরণ নিয়ে সদ্ভাবপূর্ণ সমালোচনা বা মন্তব্য অনেক ক্ষেত্রেই আইনি সুরক্ষা পায়।
তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে বলেছিল, সামাজিক মাধ্যমে কোনও রাজনৈতিক দলকে ‘অভিশাপ’ বা ‘পোকার উপদ্রব’-এর সঙ্গে তুলনা করা ভাষাগতভাবে কড়া বা অমার্জিত হতে পারে, কিন্তু তাতে জনশৃঙ্খলা ভাঙার বাস্তব আশঙ্কা না থাকলে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩৫২ বা ৩৫৩ ধারা প্রযোজ্য হবে না।
আদালতের মতে, এমন বক্তব্য সর্বোচ্চ মানহানির প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্য ও সমালোচনা সংবিধানের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অধীনে বিশেষ সুরক্ষা ভোগ করে।