ভারতে সাম্প্রতিক পরীক্ষা-সংক্রান্ত অনিয়ম, শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগকে কেন্দ্র করে যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, তা কেবল একটি নির্দিষ্ট ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। এই আন্দোলনের ভিতরে জমা রয়েছে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ—স্বচ্ছতা, কর্মসংস্থান, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার প্রশ্ন। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও শহুরে তরুণদের বড় অংশ এই আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠেছে।
এই প্রবণতা নতুন নয়। ২০২২ সালে শ্রীলঙ্কায় ‘অরাগালায়া’ আন্দোলনে হাজার হাজার তরুণ প্রেসিডেন্ট গোটাবায়া রাজাপক্ষের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। খাদ্য, জ্বালানি ও ওষুধের সংকট থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন শেষ পর্যন্ত সরকারের পতনের কারণ হয়। রাজনৈতিক দলগুলির বাইরে দাঁড়িয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংগঠিত হওয়া এই আন্দোলন দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবাদ রাজনীতিতে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
বাংলাদেশেও ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলন একই ধরনের এক মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হয়। শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে মুহূর্তের মধ্যে দেশজুড়ে জনমত গড়ে তুলেছিলেন। আন্দোলনের বিস্তার শেষ পর্যন্ত দেশের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়।
ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে এই অভিজ্ঞতার কিছু স্পষ্ট মিল রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এখানে প্রধান সংগঠক। প্রচলিত ছাত্র সংগঠন বা রাজনৈতিক দলের বাইরে অসংখ্য স্বতঃস্ফূর্ত নেটওয়ার্ক তৈরি হয়েছে। তথ্য, ভিডিও, লাইভ সম্প্রচার এবং ডিজিটাল প্রচারের মাধ্যমে আন্দোলনের বিস্তার ঘটেছে দ্রুতগতিতে। কোনও একক নেতৃত্বের পরিবর্তে বহু মুখ এবং বিকেন্দ্রীভূত সংগঠন আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।
তবে এখানেই শেষ নয়। গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যও রয়েছে। শ্রীলঙ্কার আন্দোলনের মূল কারণ ছিল অর্থনীতির সম্পূর্ণ ভেঙে পড়া। বাংলাদেশে বিষয়টি দ্রুত শাসনব্যবস্থার প্রশ্নে রূপ নেয়। ভারতে বর্তমান আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে শিক্ষা, পরীক্ষা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। ফলে একই ধরনের জনসমাগম দেখা গেলেও প্রতিটি দেশের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও পরিণতি আলাদা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রজন্ম আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযুক্ত। ইউটিউব, ইনস্টাগ্রাম, এক্স, টেলিগ্রাম এবং অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এক দেশের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা অন্য দেশের তরুণদের কাছে মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে প্রতিবাদের কৌশল, স্লোগান, পোস্টার, এমনকি সাংস্কৃতিক প্রতীকও সীমান্ত অতিক্রম করছে।
এছাড়া এই প্রজন্মের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হল রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে ইস্যুভিত্তিক ঐক্য। দুর্নীতি, বেকারত্ব, শিক্ষা, মূল্যবৃদ্ধি, স্বচ্ছতা কিংবা নাগরিক অধিকারের মতো বিষয় তরুণদের একত্রিত করছে। তারা প্রথাগত রাজনৈতিক আনুগত্যের বাইরে নিজেদের অবস্থান নির্ধারণ করতে চাইছে। এর ফলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে এই নতুন সামাজিক শক্তিকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ভারতের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। পরীক্ষা, নিয়োগ এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রশ্নে ক্ষোভ দ্রুত বৃহত্তর সামাজিক আলোচনায় পরিণত হয়েছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া বহু তরুণ কোনও রাজনৈতিক দলের সক্রিয় সদস্য নন। বরং তাঁরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ থেকেই রাস্তায় নেমেছেন। এই প্রবণতা রাজনৈতিক দলগুলির জন্য যেমন নতুন সুযোগ তৈরি করছে, তেমনি নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যার বড় অংশই তরুণ। আগামী কয়েক দশকে কর্মসংস্থান, উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের মতো প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই সমস্যাগুলির কার্যকর সমাধান না হলে যুবসমাজের অসন্তোষ ভবিষ্যতেও বিভিন্ন দেশে নতুন নতুন আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে।
তবে একই সঙ্গে একটি সতর্কবার্তাও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আন্দোলনকে দ্রুত সংগঠিত করতে পারলেও বিভ্রান্তিকর তথ্য, গুজব এবং মেরুকরণও সমান গতিতে ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং নাগরিক সমাজ—সবার জন্যই চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা করা, আবার সহিংসতা ও ভুয়ো তথ্যের বিস্তারও নিয়ন্ত্রণ করা।
দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়ে দিচ্ছে, এই অঞ্চলের তরুণদের দাবি আর শুধুমাত্র স্থানীয় নয়; তাদের উদ্বেগের বিষয়গুলির মধ্যে রয়েছে স্বচ্ছতা, সুযোগের সমতা, জবাবদিহি এবং মর্যাদাপূর্ণ ভবিষ্যৎ। দেশভেদে প্রেক্ষাপট আলাদা হলেও প্রতিবাদের মূল বার্তা প্রায় একই—রাষ্ট্রকে তরুণদের কণ্ঠস্বর শুনতে হবে। তাই শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিংবা ভারত—সব ক্ষেত্রেই যুব আন্দোলনের চরিত্রকে এক কথায় বর্ণনা করা যায়, “একই সুর, কিন্তু আলাদা বাস্তবতা।”