Home International একাই কোটি ডলারের ব্যবসা! এআই বদলাচ্ছে উদ্যোক্তার সংজ্ঞা

একাই কোটি ডলারের ব্যবসা! এআই বদলাচ্ছে উদ্যোক্তার সংজ্ঞা

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
28 views 4 minutes read
A+A-
Reset

একসময় বড় ব্যবসা মানেই ছিল বড় দল, একাধিক কর্মী, বিশাল অফিস আর মোটা অঙ্কের পরিকাঠামোগত খরচ। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সেই পুরনো হিসাবটাই ওলটপালট করে দিচ্ছে। এখন এমন উদ্যোক্তারাও উঠে আসছেন, যাঁরা কার্যত একাই চালাচ্ছেন কোটি ডলারের সংস্থা—আর তাঁদের ‘কর্মী’ হিসেবে কাজ করছে এআই।

৪০ বছর বয়সি মার্কিন উদ্যোক্তা বেন ব্রোকা তারই অন্যতম উদাহরণ। গত ডিসেম্বরে উদ্যোক্তাদের জন্য এআই-নির্ভর বিভিন্ন সরঞ্জাম সরবরাহকারী একটি সংস্থা শুরু করেন তিনি। কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর গ্রাহকের সংখ্যা ১০ হাজার ছাড়িয়েছে। চলতি বছরে সংস্থার আয় ১ কোটি ডলার বা ১০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

অবিশ্বাস্য বিষয় হল, এত বড় ব্যবসার পিছনে কর্মী মাত্র একজন—বেন নিজেই।

কর্মী নেই, আছে এআই

ব্রোকার সংস্থায় এমন অনেক কাজই করছে এআই, যার জন্য আগে আলাদা কর্মী প্রয়োজন হতো। গ্রাহকের ই-মেলের উত্তর দেওয়া থেকে সফটওয়্যারের কোড লেখা, ত্রুটি খুঁজে ঠিক করা, অভিযোগ সামলানো, নতুন গ্রাহককে পরিষেবায় যুক্ত করা—এমনকি প্রয়োজনে অর্থ ফেরতের কাজও সামলাচ্ছে প্রযুক্তি।

ব্রোকার মতে, একা ব্যবসা চালানোর সবচেয়ে বড় সুবিধা হল সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা। কোনও সিদ্ধান্তে অন্যের সঙ্গে আপস করতে হয় না। তাঁর যুক্তি, অতিরিক্ত সমঝোতা অনেক সময় ব্যবসাকে ‘মাঝারি’ ফলাফলের দিকে ঠেলে দেয়।

একক উদ্যোক্তার সংখ্যা বাড়ছে

এটি অবশ্য কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। পেমেন্ট সংস্থা স্ট্রাইপের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, তাদের প্ল্যাটফর্মে এমন হাজার হাজার একক উদ্যোক্তা রয়েছেন, যাঁদের বার্ষিক আয় ১০ লক্ষ ডলারের বেশি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে।

আর বছরে ১ কোটি ডলারের বেশি আয় করা একক উদ্যোক্তার সংখ্যা একই সময়ে প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।

স্ট্রাইপের প্রধান অর্থনীতিবিদ আর্নি টেডেস্কির মতে, ব্যবসা শুরু করার জন্য একসময় পরিচিতি, অভিজ্ঞতা বা কোনও পরামর্শদাতার সাহায্য প্রয়োজন হতো। এখন সেই জায়গার কিছুটা দখল করে নিচ্ছে এআই। ফলে একেবারে শূন্য থেকে ব্যবসা শুরু করার বাধা অনেকটাই কমে যাচ্ছে।

প্রযুক্তি খাতেই সবচেয়ে বড় বদল

এআইয়ের প্রভাব প্রায় সব শিল্পেই পড়ছে। তবে প্রযুক্তি ক্ষেত্রে পরিবর্তনটা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। কারণ এখানে এআই শুধু প্রশাসনিক কাজ করছে না; সফটওয়্যার তৈরি, কোড লেখা এবং পরীক্ষা করার মতো ব্যবসার মূল কাজেও সরাসরি হাত লাগাতে পারছে।

ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ টেলর বাউলির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত এক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নতুন ব্যবসা শুরু করার আবেদন প্রায় ৪৫ শতাংশ বেড়েছে। অথচ একই সময়ে নতুন সংস্থাগুলির কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

অর্থনীতিবিদদের কাছে এই প্রবণতা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। অর্থাৎ, নতুন অনেক সংস্থাই শুরু থেকেই খুব কম কর্মী নিয়ে, কিংবা কার্যত কর্মী ছাড়াই ব্যবসা চালানোর কথা ভাবছে।

স্টার্টআপের দরজাও খুলছে চওড়া

সান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক একক উদ্যোক্তাদের নিয়ে কাজ করা একটি স্টার্টআপ অ্যাক্সিলারেটরের প্রধান জুলিয়ান ওয়েইসারের মতে, ব্যবসা শুরু করার বাধা এখন আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় কম।

তাঁর সংস্থা সম্প্রতি মাত্র ১০টি জায়গার জন্য পেয়েছে ৪,৫০০টি আবেদন। গত বছরের তুলনায় আবেদনকারীর সংখ্যা বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ।

অর্থাৎ, এআই শুধু ব্যবসা চালানোর খরচ কমাচ্ছে না—উদ্যোক্তা হওয়ার দরজাটাও আরও বেশি মানুষের জন্য খুলে দিচ্ছে।

এআই সস্তা, এমনটা কিন্তু নয়

তবে ছবিটা পুরোপুরি একপেশে নয়। এআই দিয়ে ব্যবসা চালালেই যে খরচ কমবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

ব্রোকা জানান, ব্যবসার শুরুর দিকে গ্রাহকদের অনুরোধ সামলাতে একটি বাণিজ্যিক এআই মডেল ব্যবহার করে তাঁকে বড় অঙ্কের টাকা খরচ করতে হয়েছিল। পরে তিনি বিনামূল্যের ওপেন-সোর্স মডেলে চলে যান।

ইতিমধ্যে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩ কোটি ডলার সংগ্রহ করেছেন ব্রোকা। একই সঙ্গে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের বড় দল না রাখায় বেতন বাবদ বিপুল খরচও এড়ানো সম্ভব হয়েছে।

সফল হলেই বিপদ—নকল করাও সহজ

এআই-নির্ভর একক ব্যবসার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত অন্য জায়গায়। একজন উদ্যোক্তা যদি এআইয়ের সাহায্যে দ্রুত একটি সফল ব্যবসা দাঁড় করাতে পারেন, তাহলে প্রতিদ্বন্দ্বীরাও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেই ধারণা নকল করতে পারবেন খুব সহজেই।

ফ্লোরিডার উদ্যোক্তা ট্রয় জনস্টনের অভিজ্ঞতাও তেমনই। তিনি একাই এআই-নির্ভর একটি অ্যাপ চালান, যা ব্যবহারকারীদের ক্রেডিট কার্ডের সুবিধা আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে সাহায্য করে। বর্তমানে অ্যাপটি মাসে প্রায় ৩,০০০ ডলার মুনাফা করছে এবং কোনও কর্মী ছাড়াই ধীরে ধীরে বাড়ছে।

জনস্টনের মতে, সমস্যাটা হল—এখন প্রায় সবার হাতেই একই শক্তিশালী প্রযুক্তি রয়েছে।

এক কর্মীর কোম্পানি, নাকি কর্মহীন ভবিষ্যৎ?

এখানেই উঠে আসছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। যদি একজন মানুষ এআইয়ের সাহায্যে ১ কোটি ডলারের ব্যবসা চালাতে পারেন, তাহলে ভবিষ্যতে একই আকারের সংস্থা চালাতে কতজন কর্মীর প্রয়োজন হবে?

এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াবে, নতুন ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে এবং উদ্যোক্তা হওয়ার পথ সহজ করবে—এ নিয়ে সন্দেহ কম। কিন্তু তার পাশাপাশি কিছু প্রচলিত চাকরি কমে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ভবিষ্যতে নতুন ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়বে। ফলে এআইয়ের যুগে কর্মসংস্থানের চেহারা হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যাবে না, কিন্তু বদলে যাবে তার কাঠামো।

একসময় ব্যবসার সবচেয়ে বড় সম্পদ ছিল মানুষের সংখ্যা। এআইয়ের যুগে প্রশ্নটা সম্ভবত অন্যরকম—একজন মানুষের সঙ্গে কতটা শক্তিশালী প্রযুক্তি আছে?

বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles