বাংলাস্ফিয়ার: দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ডিইউ) অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট স্টিফেন্স কলেজে পোশাকবিধি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। কলেজ কর্তৃপক্ষ প্রথম বর্ষের পড়ুয়াদের উদ্দেশে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানিয়েছে, ক্যাম্পাসে শর্টস পরে আসা যাবে না। এরপরই সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। মঙ্গলবার নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিনেই কয়েকজন পড়ুয়া প্রতিবাদ জানাতে শর্টস পরে কলেজে আসেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রথম বর্ষের এক ছাত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কলেজ থেকে জানানো হয়েছে যে শর্টস পরা পোশাকবিধির পরিপন্থী। গরমের সময় শর্টস পরা কীভাবে নিয়মবিরুদ্ধ হতে পারে, তা তাঁর বোধগম্য নয়। আর এক ছাত্রী বলেন, স্কুলজীবনে দীর্ঘদিন ইউনিফর্ম পরে কাটানোর পর কলেজে এসে স্বাধীনভাবে পোশাক বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকবে বলেই তাঁদের ধারণা ছিল। সেই প্রত্যাশা ভেঙে গিয়েছে।
তাঁর কথায়, ‘‘আমরা সবাই প্রাপ্তবয়স্ক। কলেজে এসে নিজের পোশাকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা থাকবে বলেই ভেবেছিলাম। এই ধরনের বিধিনিষেধ সেই স্বাধীনতাকে খর্ব করছে।’’
তবে এই বিতর্কের মাঝেই কলেজের অধ্যক্ষা সুসান ইলিয়াস স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, শর্টস নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নতুন নয়। এটি বহুদিন ধরেই কলেজের প্রচলিত নিয়মের অংশ। তাঁর দাবি, নতুন পড়ুয়াদের কলেজের আচরণবিধি সম্পর্কে সচেতন করতেই বিজ্ঞপ্তিটি জারি করা হয়েছে।
অধ্যক্ষের বক্তব্য, সেন্ট স্টিফেন্স একটি আবাসিক ও ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখানে পোশাক-পরিচ্ছদ, আচরণ এবং শৃঙ্খলা নিয়ে দীর্ঘদিনের কিছু নীতি রয়েছে। এগুলি কোনও নতুন সিদ্ধান্ত নয়, বরং বহু বছর ধরে অনুসৃত হয়ে আসছে।
কলেজের একাধিক শিক্ষকও জানান, প্রতি বছরই নতুন পড়ুয়াদের কলেজের নিয়মাবলি সম্পর্কে জানানো হয়। শর্টস না পরার নির্দেশও সেই নিয়মেরই অংশ। তাই একে নতুন নিষেধাজ্ঞা হিসেবে দেখার কোনও কারণ নেই।
অন্যদিকে, ছাত্রছাত্রীদের একাংশের দাবি, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মও পরিবর্তিত হওয়া উচিত। তাঁদের মতে, পোশাকের ভিত্তিতে শৃঙ্খলা নির্ধারণ করা ঠিক নয়। কলেজে কী পোশাক পরে আসা হবে, তা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হওয়া উচিত, যতক্ষণ না তা অশালীন বা আপত্তিকর।
এই বিতর্কে সামাজিক মাধ্যমেও মতভেদ স্পষ্ট। একদল মনে করছেন, কলেজের নিজস্ব ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি বজায় রাখতে নির্দিষ্ট পোশাকবিধি থাকা অস্বাভাবিক নয়। বিশ্বের বহু নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এখনও পোশাক সংক্রান্ত নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে। অন্যদিকে, বিরোধীদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি জায়গা যেখানে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তাই শর্টসের মতো সাধারণ পোশাক নিষিদ্ধ করা অযৌক্তিক।
বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিষয়টি শুধু শর্টস পরা বা না পরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যক্তিস্বাধীনতা, শৃঙ্খলা, ঐতিহ্য এবং আধুনিকতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার প্রশ্ন। কলেজের নিজস্ব নীতিমালা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই নীতির প্রয়োজনীয়তা ও যৌক্তিকতা নিয়েও আলোচনা হওয়া স্বাভাবিক।
সেন্ট স্টিফেন্স কলেজের এই সিদ্ধান্তে আপাতত কোনও পরিবর্তনের ইঙ্গিত মেলেনি। কলেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দিয়েছে, প্রচলিত পোশাকবিধিই বহাল থাকবে। তবে নতুন প্রজন্মের পড়ুয়াদের একাংশের আপত্তি এবং প্রতিবাদের ফলে বিষয়টি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় মহলে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে। আগামী দিনে এই বিতর্ক আরও বিস্তৃত হবে কি না, সেদিকেই নজর থাকছে।