Table of Contents
নয়াদিল্লি: ‘জন গণ মন’-এর মতোই এবার আইনি সুরক্ষার আওতায় আসতে পারে জাতীয় গান ‘বন্দে মাতরম্’। সংসদের বর্ষাকালীন অধিবেশনে রাজ্যসভায় জাতীয় সম্মান অবমাননা প্রতিরোধ আইন, ১৯৭১-এ সংশোধনের প্রস্তাব আনা হয়েছে। প্রস্তাবিত সংশোধনী অনুযায়ী, ‘বন্দে মাতরম্’-কে ইচ্ছাকৃতভাবে অবমাননা বা অসম্মান করাও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
কিন্তু নতুন আইন নিয়ে আলোচনা শুরু হতেই সামনে এসেছে পুরনো আইনের কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন। জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরো (এনসিআরবি)-র ২০২৪ সালের তথ্য বলছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪—এই ১১ বছরে সংশ্লিষ্ট আইনে ১,১০২ জনকে গ্রেফতার করা হলেও দোষী সাব্যস্ত হয়েছে মাত্র ৬০টি মামলায়। অর্থাৎ গ্রেফতার ও মামলার তুলনায় আদালতে সাজা পাওয়ার হার অত্যন্ত কম। বহু মামলা এখনও তদন্ত বা বিচারপ্রক্রিয়ার জটেই আটকে রয়েছে।
এনসিআরবির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এই আইনে মোট ৬৯৯টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। বছরে গড়ে মামলা হয়েছে প্রায় ৬৪টি। কোভিডের সময় ২০২০ ও ২০২১ সালে মামলার সংখ্যা ৫০-এর নিচে নেমে গেলেও ২০২২ সালে তা বেড়ে সর্বোচ্চ ৮৭টি হয়। ২০২৪ সালে নথিভুক্ত মামলা ছিল ৫৭টি।
মামলা বাড়ছে, বিচার এগোচ্ছে কতটা?
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি নিয়ে। ২০২৪ সালের শেষে ৫৩টি মামলা পুলিশের তদন্তাধীন ছিল। তার থেকেও বড় সংখ্যা আদালতে—৩৫৮টি মামলা বিচারাধীন। ২০১৪ সালে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৮৫। অর্থাৎ ১১ বছরে তা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।
তদন্ত শেষ করার ক্ষেত্রেও ছবিটা খুব আশাব্যঞ্জক নয়। ২০২৪ সালে পুলিশ ৪৫টি মামলায় চার্জশিট জমা দিয়েছে। তদন্তাধীন মামলার হিসাবে এই হার প্রায় ৩৬.৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে চার্জশিট দাখিলের হার ছিল ৫৩.৬ শতাংশ। মাঝের বছরগুলিতে তা আরও নেমে গিয়েছিল—২০২০ সালে মাত্র ৩১.৩ শতাংশ।
গ্রেফতার হাজার পেরোল, সাজা ৬০
গ্রেফতারের সংখ্যাতেও বছরভেদে বড় ওঠানামা দেখা গেছে। ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মোট ১,১০২ জন গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২০ সালে একাই গ্রেফতার হয়েছিলেন ৪০৫ জন—যা এই সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪ সালে সেই সংখ্যা নেমে দাঁড়ায় ৫৯-এ।
এই সময়ে মোট ৯৬২ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল হয়েছে। ২০২৩ সালে একাই চার্জশিটভুক্ত ব্যক্তির সংখ্যা ছিল ৩২৬। ২০২৪ সালে তা কমে হয় ৬৬।
তবে আদালতের রায়ের দিকে তাকালে ব্যবধানটা আরও স্পষ্ট। ২০১৪ থেকে ২০২৪—প্রতিটি বছরেই খালাসের সংখ্যা দোষী সাব্যস্তের চেয়ে বেশি। ২০২৪ সালে মাত্র ৬টি মামলায় দোষী সাব্যস্তের রায় হয়েছে, যেখানে ১০টি মামলায় অভিযুক্তরা খালাস পেয়েছেন। এই সময়ের মধ্যে সর্বাধিক সাজা হয়েছিল ২০১৭ সালে—৮টি মামলায়। আবার ২০২০ ও ২০২২ সালে একটিও দোষী সাব্যস্তের রায় হয়নি।
নতুন আইন, পুরনো প্রশ্ন
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে ছবিটা তাই বেশ স্পষ্ট—আইন থাকা আর সেই আইনের কার্যকর প্রয়োগ, দুটো এক বিষয় নয়। মামলা নথিভুক্ত হচ্ছে, গ্রেফতারও হচ্ছে; কিন্তু তদন্ত শেষ করা, চার্জশিট দাখিল এবং শেষ পর্যন্ত আদালতে দোষ প্রমাণ করার ক্ষেত্রে বড় ফাঁক রয়ে যাচ্ছে।
এই পরিস্থিতিতে ‘বন্দে মাতরম্’-কে অবমাননার অভিযোগকেও শাস্তিযোগ্য অপরাধের আওতায় আনার প্রস্তাব নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। সংশোধনী কার্যকর হলে অভিযোগ ও মামলা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও, তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার গতি না বাড়লে নতুন আইনের দাঁত-নখ কতটা কার্যকর হবে, সেটাই বড় প্রশ্ন।
সরকারের যুক্তি, জাতীয় প্রতীক ও জাতীয় গানের মর্যাদা রক্ষায় আইনি সুরক্ষা আরও শক্তিশালী করা জরুরি। অন্যদিকে বিরোধীদের একাংশ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের অপব্যবহারের আশঙ্কা তুলেছে।
এখন নজর সংসদে বিলটি নিয়ে পরবর্তী আলোচনা ও সিদ্ধান্তের দিকে। কারণ প্রশ্নটা শুধু নতুন করে শাস্তির বিধান আনার নয়—যে আইনে ১১ বছরে ১,১০২ জন গ্রেফতার হয়েছেন, সেখানে সাজা হয়েছে মাত্র ৬০টি মামলায়, সেই ব্যবধান কমবে কীভাবে—সেটাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।